সমর সেন

একজন কবি ও সাহিত্যিক। ১৯১৬ সালের ১০ অক্টোবর কলকাতার বাগবাজারে জš§গ্রহণ করেন। পিতা অরুণ সেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন। প্রথিতযশা গবেষক দীনেশচন্দ্র সেন তার পিতামহ।
সমর সেন কাশিমবাজার স্কুল থেকে ম্যাট্রিক (১৯৩২), স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে আইএ (১৯৩৪) এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (১৯৩৭) ও স্নাতকোত্তর (১৯৩৮)। মার্কসবাদী নেতা রাধারমণ মিত্র ও বঙ্কিম মুখোপাধ্যায়ের সান্নিধ্য লাভ করার ফলে সমর সেনের রাজনৈতিক মনন গঠিত হয়। তবে তিনি মার্কসের সাম্যবাদী মতবাদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করলেও সরাসরি মার্কসীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেননি।
সমর সেন কাঁথির প্রভাতকুমার কলেজ এবং দিল্লির কমার্শিয়াল কলেজে কিছুকাল অধ্যাপনা করেন। কর্মজীবনের বৃহৎ অংশ কেটেছে তার সাংবাদিকতায়। স্টেটসম্যান, হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড, নাও প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি সাংবাদিকতা করেন। ঋৎড়হঃরবৎ ও নাও পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। কলকাতার সংবাদ বিভাগে, বিজ্ঞাপনী সংস্থায় এবং মস্কোর প্রগতি প্রকাশনালয়ে অনুবাদক হিসেবেও তিনি কর্মরত ছিলেন।
‘আমি রোমান্টিক কবি নই, আমি মার্ক্সিস্ট’Ñএভাবেই তিনি মার্কসবাদের প্রতি তার প্রবল আকর্ষণ ঘোষণা করেন। নাগরিক জীবনের স্বভাব, অভাব ও অসঙ্গতির বিদ্রƒপাত্মক চিত্রায়ণ ঘটেছে তার কবিতায়। আলোর জন্য অনাবিল অস্থিরতা থেকেই তিনি অন্ধকারময় জীবনের বিবিধ বিপর্যয়ে বিক্ষুব্ধ হয়েছেন, যদিও তার এ ক্ষোভের প্রকাশ কখনো খুব তীব্র হয়নি। তার বিদ্রƒপের ভাষা তীক্ষœ, ভঙ্গি মর্মান্তিক, লক্ষ্যভেদী। মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি হিসেবেই তিনি স্বশ্রেণীর স্বরূপ উšে§াচনে স্বাতন্ত্র্যের স্বাক্ষর রেখেছেন।
সামন্ততন্ত্রের প্রতি আসক্তি, উপনিবেশের শৃঙ্খল, আর্থিক-সামাজিক-রাষ্ট্রিক-আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতার অভিঘাত মধ্যবিত্তকে বিচলিত করে। স্নেহ-প্রেম প্রভৃতি মানবিক অনুভূতির আড়ালে মধ্যবিত্তের দোদুল্যমানতা, স্বার্থপরতা ও পাশবিকতার মর্মঘাতী রূপ তুলে ধরেছেন তিনি কবিতায়। মধ্যবিত্তের মানসিক বৈকল্যের বিরুদ্ধে তার উচ্চারণ সবল, স্বতঃস্ফূর্ত এবং ব্যক্তিচিহ্নিত। সমকালের নানা টানাপড়েনের চিহ্ন তার
কবিতায় লক্ষণীয়। কিন্তু তার কবিতা দুঃসময়ের কাছে আত্মসমর্পণের পরিবর্তে সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করে। কবির এ অনুভব ও উপলব্ধির অনুঘটক হিসেবে সক্রিয় থেকেছে মার্কসবাদপ্রসূত ইতিবাচক জীবনপ্রত্যয়। তার কবিতার মর্মবস্তুতে লক্ষ্য করা যায় এ রকম আশাবাদ: ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় স্তব্ধ প্রগতির চাকা বিপ্লবোত্তর শ্রেণীহীন সমাজেই সচল হবে। এ লক্ষ্যে তিনি কবিতায় ক্রমাগত পুঁজিবাদপ্রসূত ক্ষয়িষ্ণু সমাজকাঠামোর অন্তঃসারশূন্যতা তুলে ধরেন, যা তার জীবনদৃষ্টি ও শিল্পভাবনার স্মারক। ছন্দহীন জীবনের জলছবি আঁকতে গিয়ে কবিতায় তিনি গদ্যের রূঢ় বাস্তবতায় নিমজ্জিত হয়েছেন, যাতে কাব্যের স্নিগ্ধতাও অনুপস্থিত নয়। তার প্রকাশ-কৌশল অনাড়ম্বর, কোনো রকমের ভূমিকা ছাড়াই তিনি অবলীলায় আপন অভিজ্ঞতার কাব্যিক বুননে পাঠককে সম্পৃক্ত করেন। ফলে পরিচিত পৃথিবীই তার কবিতার আধার হয়ে ওঠে।
তার কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে কয়েকটি কবিতা (১৯৩৭), গ্রহণ (১৯৪০), নানা কথা (১৯৪২), খোলা চিঠি (১৯৪৩), তিন পুরুষ (১৯৪৪) প্রভৃতি প্রধান। তার আত্মজীবনী বাবু বৃত্তান্ত প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে। ১৯৮৭ সালের ২৩ আগস্ট তার মৃত্যু হয়। গভীর শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করছি।
সায়েফী সাবের ওহী