সব কাজ ফেলে চলে গেলেন আমাদের বকর ভাই

সব কাজ ফেলে চলে গেলেন আমাদের বকর ভাই

ফজরের আজান হচ্ছে দূরের এবং কাছের মসজিদগুলোতে। হঠাৎ করে যখন ঘুম ভাঙল তখন শুনছি, আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম… অর্থাৎ ঘুম থেকে নামাজ উত্তম- একই সঙ্গে দুটি মসজিদ থেকে পর পর এই লাইনগুলো ভেসে আসছিল। রক্ত মাংসে মিশে থাকা শয়তান বলছে উঠো না, ঘুমাও। এত আরামের ঘুম নষ্ট করতে নেই আর ভেতরের আমি বলছে, উঠে পড়ো। এত ভালোবাসার আহ্বান অবহেলা করতে নেই। নিজের মনে যখন এসব ভাবছি তখন হঠাৎ আবার কানে এলো ফোন বাজছে। এই সময়ে তো কারো ফোন করার কথা নয়। ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখি, মোবাইল স্ক্রিনে ভাসছে, এন এইচ নাঈম। ঠিক মনে করতে পারলাম না, এটা কার নম্বর! তার এমন কী-ই বা কথা থাকতে পারে যে, এই অসময়ে কল দিল? ভাবতে ভাবতে হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে গেল বিছানার ওপর। ভাবলাম, জরুরি হলে পরে আবার নিশ্চয়ই কল দেবে! কিন্তু মনের ভেতর অস্বস্তি হচ্ছিল। এই সময়ে তো জরুরি না হলে ফোন দেয়ার কথা নয়! যে-ই দিক এবং তখনই মনে পড়ল, এটি মানবকণ্ঠের নাজমুল হাসান নাঈম ভাইয়ের ফোন নম্বর। উনিই বলেছিলেন সহজে চিনে নেয়ার সুবিধার জন্য এভাবে সংক্ষেপে যেন তার নম্বর সেভ করে রাখি। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল! মনটা কু গেয়ে উঠল। কেন যেন বুঝে ফেললাম, মানবকণ্ঠের কেউ একজন নেই। চলে গেছে সারা জীবনের জন্য! নইলে এ সময়ে আমাকে নাঈম ভাইয়ের কল দেয়ার কথা নয়! আমার শঙ্কাই সত্যি হলো।

আমাদের বকর ভাই আর নেই, মানবকণ্ঠের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। পত্রিকাটির সূচনা লগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় সাত বছরে অফিসে ঢুকেই দেখেছি বকর ভাই তার কক্ষে বসে কম্পিউটারের দিকে ঝুঁকে কাজ করছেন একমনে। আবার আমি যখন কাজ শেষ করে বাসায় ফিরে যাচ্ছি তখনও দেখতাম, কাজের মধ্যেই ডুবে আছেন বকর ভাই। মাঝখানে কিছু সময় হয়তো বেরিয়েছেন এক-দু’বার। ধূমপান আর চা পানের জন্য। কাজপাগল লোক হয় শুনেছি। চোখে দেখেছি বকর ভাইকে। বাসা থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে এসেছেন ঠিকই। টাইমলি ক’দিন খেয়েছেন তা হাতে গুনে বলা যাবে। এত কাজপাগল মানুষ হয়? কাজের জন্য ঘর-সংসার, স্বজন সব তো প্রায় ছেড়ে ছিলেনই, পারলে হয়তো নাওয়া-খাওয়া-ঘুমও ছেড়ে দিতেন।

যখন কাজের চাপ খুব বেশি হয়ে যেত তখন যত সময় গড়াত বকর ভাই তত বেশি অস্থির হয়ে উঠতেন। তাকে যে সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে, মেইল ধরাতে হবে, সারাদেশের পাঠকের কাছে তাজা খবর পৌঁছাতে হবে। আমরা যারা এক একটি নির্দিষ্ট পাতায় কাজ করি তাদের তো পাতার কাজ শেষ হলেই সেদিনে মতো দায়িত্ব শেষ। কিন্তু বকর বাইয়ের তো সব পাতার দায়িত্ব! তাকে সব কাজ শেষ করেই তবে ফিরতে হতো ঘরে। যে ঘরে তার প্রিয়জনরাও অপেক্ষা করতে করতে রাগে, অভিমানে, ক্ষোভে হয়তো ক্লান্ত হয়ে পড়ত। বকর ভাই কী সে সব দেখারও অবসর পেতেন? উপলব্ধি করতেন, কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে? তাকে সুস্থ জীবনে, সুস্থ দেহে দেখে স্বস্তি পেতে চায়? হয়তো বুঝতেন না অথবা বুঝেও অন্যকে বুঝতে দিতেন না। বুঝতে দিলেই যে উনি আটকে পড়বেন মায়ায়! তার ধ্যান, জ্ঞান, প্রেম, তপস্যা সবই যে ছিল খবরের সঙ্গে! নিত্য নতুন খবর নিয়েই দিনমান খেলা করতেন, একের পর এক খবর সাজিয়ে স্বপ্নের ইমারত গড়তেন তিনি। এতেই তার তৃপ্তি! এতেই তার স্বস্তি! এতেই তার সন্তুষ্টি!

আমরা বলতাম, আমাদের আইনস্টাইন বকর ভাই! একঝাঁক কোঁকড়ানো চুলের অধিকারী ছিলেন আমাদের বকর ভাই। রাত যত বাড়ত কাজের চাপে বকর ভাই ততই অস্থির হয়ে উঠতেন। তার সেই অস্থিরতা প্রকাশ পেত মাথার সব চুল খাড়া হয়ে ওঠায়। প্রচণ্ড কাজের চাপে তিনি তার চুলের মধ্যে হাত চালাতেন বার বার। আর তার সেই চুলগুলো আদরে আহ্লাদে ফুলে-ফেঁপে উঠত। তখন তাকে সত্যি দেখতে আইনস্টাইন মনে হতো। আমাদের আইনস্টাইন বকর ভাই সব কাজ ফেলে, সব ব্যস্ততা ফেলে আমাদের সবাকে অভিভাবকহীন করে চলে গেলেন! আমরা যারা তার অভিভাবকত্বের ছায়ায় এখানে কাজ করতাম তারা বিস্মিত হতেও ভুলে গেছি! কারণ তিনি কাজ ছাড়া এক মুহূর্ত স্থির থাকতে পারেন তা আমাদের কল্পনারও বাইরে। বকর ভাই, এখন তো পিক আওয়ার। বানের স্রোতের মতো নিউজ আসছে। এসব থেকে মোক্ষম নিউজগুলো যে বাছাই করতে হবে। প্রুফ করাতে হবে, মেকআপে বসতে হবে। বকর ভাই, এখন এই ব্যস্ত সময়ে আপনার কক্ষে পাথরসম নীরবতা! কি-বোর্ডের শব্দ নেই। টেলিফোন বেজে উঠছে না! কারো সঙ্গে কথা বলছেন না। আপনার কাছে পাতা নিয়েও কেউ হাজির হচ্ছে না। এসব ফেলে এমন নির্বিকার কী করে থাকছেন বকর ভাই? আপনি না কাজপাগল মানুষ?

বকর ভাই, থাক। আজ আপনি বিশ্রাম নিন। অনেক তো অন্যের খবর নিয়ে জীবন পার করে দিয়েছেন! আজ আমরা সবাই আপনার খবর পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে কাজ করি! ভালো থাকুন বকর ভাই। আমাদের কাজপাগল আইনস্টাইন বকর ভাই।
– লেখক: সাংবাদিক, গল্পকার

মানবকণ্ঠ/এসএস