সবার নজর ডাকসু নির্বাচনে

সবার নজর ডাকসু নির্বাচনে

২৮ বছর পর আবার সচল হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। ১৯৯১ সালের পর আবার নির্বাচনের মাধ্যমে নবীন শিক্ষার্থীদের আলোয়ে জ্বলবে ডাকসুর ভবন। আবারো হবে আলাপ-আলাপন, চলবে আড্ডা। এই নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন শিক্ষার্থীরা জানবে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা আন্দোলন এমনকি স্বাধীনতা-উত্তর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ডাকসুর ভূমিকা। আদালতে নির্দেশনায় দীর্ঘ ২৮ বছরের অচল ডাকসু সচল করতেই উৎসবমুখর পরিবেশের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত করতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আজ সোমবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলবে এ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। এই সময়ের মধ্যে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিবে ভোটাররা। ভোটার ও প্রার্থীদের জন্য এরই মধ্যে সকল প্রস্তুতি শেষ করেছে ডাকসু নির্বাচন কমিশন। স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর আলো নিভে যায়।

১৯৯০ সালে দেশ গণতন্ত্রে উত্তরণের পর বন্ধ হয়ে যায় নেতৃত্ব সৃষ্টির প্রতিষ্ঠানটি। সাবেক ২৫ শিক্ষার্থীর রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের রায়ে ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাধ্য হয় নির্বাচন দিতে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর আজ অনুষ্ঠিত হবে এ নির্বাচন। ক্যাম্পাসের ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে। আইন জটিলতা কাটতেও আন্তরিক ভূমিকা ছিল অনেকের। সর্বোপরি শেষ পর্যন্ত সদিচ্ছা দেখিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকার। এবারের ডাকসু নির্বাচনে ৪২ হাজার ৯২৩ ভোটারের জন্য ১৮টি হলের ৫০৮ বুথ প্রস্তুত করা হয়েছে। এদিকে নির্বাচন উপলক্ষে প্রচার-প্রচারণা শেষ করেছেন প্রার্থীরা। গত শনিবার রাত ১২টা পর্যন্ত চলে প্রচারণা।

এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ১৮ হলে প্রস্তুত করা হয়েছে ৫০৮টি বুথ। ৪২ হাজার ৯২৩ ভোটারের জন্য এসব বুথ তৈরি করা হয়েছে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে বুথ ৩৫টি, শহীদুল্লাহ হলে ২০, ফজলুল হক মুসলিম হলে ৩৫, অমর একুশে হলে ২০, জগন্নাথ হলে ২৫, কবি জসীমউদ্দীন হলে ২০, মাস্টারদা সূর্যসেন হলে ৩২, হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলে ৩০, রোকেয়া হলে ৫০, কবি সুফিয়া কামাল হলে ৪৫, শামসুন্নাহার হলে ৩৫, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলে ২০, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ১৯, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ২১, স্যার এএফ রহমান হলে ১৬, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে ২৪, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ২০টি এবং বিজয় একাত্তর হলে ৪০টি বুথ থাকবে। কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টি ও হল সংসদের ১৩টিসহ ৩৮টি পদের জন্য ভোট দেবেন শিক্ষার্থীরা।

কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টি পদের বিপরীতে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন ২২৯ জন। আর প্রতিটি হল সংসদে ১৩টি পদের জন্য ১৮টি হলে ৫০৯ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জানা গেছে, কেন্দ্রীয় সংসদে ভিপি পদে ২১ এবং জিএস পদে ১৪ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ ছাড়া এজিএস পদে ১৩, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক পদে ১১, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক পদে ৯, কমনরুম-ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে ৯, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক পদে ১১, সাহিত্য সম্পাদক পদে ৮, সংস্কৃতি সম্পাদক পদে ১২, ক্রীড়া সম্পাদক পদে ১১, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে ১০, সমাজসেবা সম্পাদক পদে ১৪ জন এবং ১৩টি সদস্য পদের বিপরীতে ৮৬ জন নির্বাচন করছেন।

অন্যদিকে হল সংসদে ১৮ হলে ১৩টি করে পদের বিপরীতে প্রার্থী রয়েছেন ৫০৯ জন। এর মধ্যে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ২৭, জগন্নাথ হলে ২৮, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বলে ১৭, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ২৬, অমর একুশে হলে ২৯, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে ২৭, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ৩৪, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ৩৩, রোকেয়া হলে ৩০, কবি সুফিয়া কামাল হলে ৩০, শামসুন্নাহার হলে ২৫, কবি জসীমউদ্দীন হলে ২৫, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে ২২, ফজলুল হক মুসলিম হলে ৩৬, বিজয় একাত্তর হলে ৩০, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ২৭, স্যার এএফ রহমান হলে ৩৭ জন এবং সূর্যসেন হলে ২৬ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা করছেন। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত সাদা দলের শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং হল সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিরোধী মতের কোনো শিক্ষককে যুক্ত করা হয়নি। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে কর্তৃপক্ষ বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর বিভিন্ন দাবি নিয়ে আলোচনা করলেও গঠনতন্ত্র সংশোধন ও আচরণবিধিতে সেসবের প্রতিফলন দেখা যায়নি। গতকাল রবিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন তারা। ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম ছাড়াও সাদা দলের প্রচার সম্পাদক প্রফেসর সিদ্দিকুর রহমান প্রফেসর কালাম সরকার, প্রফেসর নুরুল আমিনসহ ঢাবি সাদা দলের অন্য শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।

তবে গতকাল বিকেলে ছাত্রলীগ বাদে অন্য সব প্যানেলের প্রার্থীরা ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ভোটের আগের দিন রোববার ‘অস্বচ্ছ’ ব্যালট বাক্স, সব কেন্দ্রে প্রার্থীদের এজেন্ট না থাকা, ভোট গ্রহণের সময় ‘স্বল্পতা’ এবং অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে শঙ্কার কথা জানান তারা। ভোট গ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগের দিনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারেনি বলে অভিযোগ ছাত্র সংগঠনগুলোর। নির্বাচনের আগেই যাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরা না হয়, সে জন্য রাতে হলে হলে ব্যালট বাক্স না পাঠানোর দাবি জানিয়ে ছিলেন বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর জোট প্রগতিশীল ছাত্রঐক্যের সহ-সভাপতি (ভিপি) প্রার্থী লিটন নন্দী। লিটন বলেন, রাতের আঁধারে হলগুলোতে ব্যালট বাক্স পাঠানো যাবে না। সকালে গণমাধ্যম ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে ব্যালট বাক্স উন্মুক্ত করে দেখিয়ে তা স্থাপন করতে হবে। ছাত্রদলের বহিরাগতদের উপস্থিতি নির্বাচনে বিশৃঙ্খলার একটা কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে ঢাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন করে ছাত্রদল মহানগর থেকে সশস্ত্র ক্যাডাররা ক্যাম্পাসে এনে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তারা ডাকসু নিয়ে কথা বলার পরিবর্তে দণ্ডিত খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং পলাতক আসামি তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি উপজীব্য করেছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.