সততায় তৃতীয় স্থান অধিকারী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন

মানবকণ্ঠ কলামপানামা পেপার্স এবং প্যারাডাইস পেপার্স সম্প্রতি অফশোর ব্যাংকিংয়ের নামে বিদেশে টাকা পাচারের তথ্য প্রচার করে মিডিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। অফশোর ব্যাংকিংয়ের নামে টাকা পাচারের তালিকায় বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীদের নাম উঠে এসেছে। রাজনীতিবিদদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন দেশের সরকারে আছেন আবার কেউ কেউ সরকার প্রধানও আছেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখিত কেলেঙ্কারিতে কেউ কেউ সরকারি পদ হারিয়েছেন কেউ কেউ অভিযোগের ভিত্তিতে পদত্যাগ করেছেন। এক কথায় বিশ্ব রাজনীতিতে যাদের সৎ বলে মনে করা হতো তাদের অনেকেই হয়েছেন কলঙ্কিত এবং তালিকায় প্রকাশিত ব্যবসায়ীদের মাঝে বিরাজ করছে আতঙ্ক, কখন, কে মানিলন্ডারিং কেসে ফেঁসে যায় এ ভয়ে।

এবার পিপল্স অ্যান্ড পলিটিক্স বিপরীতধর্মী এক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বিশ্বের ৫ জন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিহ্নিত করা হয়েছে যাদের কোনো দুর্নীতি স্পর্শ করেনি, যাদের বিদেশে কোনো ব্যাংক হিসাব নেই, উল্লেখ করার মতো কোনো সম্পদও নেই। ওই প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে ৫টি প্রশ্নের উত্তরে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে।

প্রশ্ন ৫টি হলো (১) সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে তিনি কি তার রাষ্ট্রের বাইরে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করেছেন? (২) ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর তার সম্পদ কতটুকু বেড়েছে? (৩) গোপন সম্পদ গড়েছেন কিনা? (৪) সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ আছে কিনা? (৫) দেশের জনগণ তার সম্পর্কে কী ভাবেন?

এই ৫টি প্রশ্নের উত্তর নিয়ে পিপল্স অ্যান্ড পলিটিক্স ১৭৩টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করেছে। এই গবেষণা সংস্থাটি মাত্র ১৭ জন সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান পেয়েছেন যারা ৫০ ভাগ দুর্নীতিমুক্ত হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন অর্থাৎ পাসের হার মাত্র ৯.৮২ ভাগ। ১৭৩ জন সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে সবচেয়ে সৎ ও পরিচ্ছন্ন সরকারপ্রধান হিসেবে ৯০% মার্ক পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল। ৮৮% মার্ক পেয়ে ২য় স্থান অধিকার করেছেন সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং। ৮৭% মার্ক পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। ৮৫% মার্ক পেয়ে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছেন নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইরনা সোলবাগ। ৮১% মার্ক পেয়ে ৫ম স্থান অধিকার করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রূহানী।

উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, সন্দেহ নেই। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এমন কোনো অভিযোগও উত্থাপিত হয়নি। তবে একটি বিষয় বিবেচনার যথেষ্ট দাবি রাখে। রাজধানী শহরের একটি নামিদামি স্কুলের শিক্ষার মান এবং মফস্বল এলাকার একটি স্কুলের শিক্ষার মান কখনো এক নয়। রাজধানীর নামিদামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ৯০% মার্ক পেয়ে প্রথম হওয়ার চেয়ে মফস্বল এলাকার একটি স্কুলের একজন ছাত্র ৮৭% মার্ক পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করা মেধা, অধ্যবসায়, প্রজ্ঞা, নিষ্ঠার দিক থেকে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে। জার্মান, সিঙ্গাপুরের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক পরিবেশের ক্ষেত্রে প্রতি সূচকেই আমরা পিছিয়ে আছি এ কথা অস্বীকার করতে পারি না। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ।

জনসংখ্যার চাপ, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত। এসব প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ৮৭% মার্ক পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করা সম্ভব হয়েছে শুধু তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা, নিষ্ঠা ও সততার কারণে। মানুষের সদিচ্ছা থাকলে প্রতিকূল পরিবেশেও বিজয় অর্জন সম্ভব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বিজয় তারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এ জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন। জার্মান সিঙ্গাপুরের মতো উপযুক্ত পরিবেশ পেলে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রথম স্থানের অধিকারী হতেন এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

তবে ওই প্রতিবেদনে সরকারের বিরুদ্ধে কিছু দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এ কথা সত্যি, কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এরপরও সান্ত¡নার বিষয় হলো মাথায় পচন ধরেনি। শরীরে এক আধটু ক্ষত হলে চিকিৎসায় সারানো যায় কিন্তু মাথায় পচন ধরলে কোনো চিকিৎসায় কাজ হয় না। এ প্রসঙ্গে খলীফা হারুনুর রশীদের একটি ঘটনা উপস্থাপন করতে চাই। একদিন খলীফা হারুনুর রশীদ শাকীক নামক একজন দরবেশের কাছে কিছু উপদেশ প্রার্থনা করলেন। দরবেশ শাকীক বললেন, হে খলীফা! মনে রাখিও, তুমি একটি ঝরনা সাদৃশ্য আর রাজ্যের বিভিন্ন অংশে তোমা কর্তৃক নিযুক্ত কর্মকর্তা/কর্মচারীবৃন্দ সে উৎস হতে উদ্ভূত ক্ষুদ্র ও বৃহৎ নদী-নালা সমূহের ন্যায়। ঝরনা স্বয়ং পরিচ্ছন্ন ও নির্মল থাকলে তা হতে নদী-নালায় নিঃসৃত মলিনতা তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না। কিন্তু উৎসটি স্বয়ং অপরিষ্কার ও মলিন হলে উহা হতে নির্গত মলিন ও অপরিষ্কার পানি সমস্ত নদী-নালায় ছড়িয়ে পড়ে উহাদিগকে অপরিষ্কার করে ফেলে। অর্থাৎ তুমি নিজে ভালো হলে তোমার কর্মচারীরা ও অন্য মন্ত্রীরা মন্দ হলেও ক্রমশ: ভালো হতে বাধ্য। পক্ষান্তরে তুমি মন্দ হলে তোমার কর্মচারী ও মন্ত্রীরা ভালো থাকলেও ক্রমশ: মন্দ হয়ে যাবে। দরবেশ শাকীকের উপদেশ অনুযায়ী আমাদের সৌভাগ্য যে আমাদের ঝরনা ধারা অর্থাৎ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখনো পরিচ্ছন্ন ও নির্মল। তাকে অপরিচ্ছন্নতা ও মলিনতা এখনো স্পর্শ করেনি। তাই সরকারের বিরুদ্ধে যে কিছু দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

বাংলাদেশের ৭৮ ভাগ মানুষ মনে করে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৎ ও ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে। তার কোনো গোপন সম্পদ নেই। এ কথা যেমন সত্য তেমনি দেশের মানুষ আরো জানে তিনি সৎ, নির্ভীক ও ধার্মিক। তার যেমন সততা আছে, তেমনি সাহস আছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জীবনের একটাই স্বপ্ন, একটাই ব্রত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সোনার বাংলা গড়ে তোলা, বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো এবং বাংলার মানুষের মাঝেই বেঁচে থাকা। যার জীবনের ব্রত এমন মহৎ এমন সুন্দর তাকে দুর্নীতি স্পর্শ করতে পারে না-পিপল্স অ্যান্ড পলিটিক্সের প্রতিবেদন তাই প্রমাণ করে।

প্রধানমন্ত্রীর এই গৌরবময় অর্জন বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতিকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর স্থান করে দিয়েছে তবে নিজ দলের মধ্যে এর একটা নেতিবাচক প্রভাবের সম্ভাবনা রয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীরা যদি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর এই অর্জন আগামী নির্বাচনে জয়লাভের জন্য যথেষ্ট, আমাদের আর তেমন কাজ করার দরকার নেই তবে সেটা হবে মারাত্মক ভুল। এ প্রসঙ্গে আমি একটা উদাহরণ উপস্থাপন করছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন চার্চিল। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ছিলেন জেনারেল এবং ময়দানে যুদ্ধ করা সেনাপতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ছিলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এবং একজন শক্তিশালী নেতা। চার্চিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির বিজয় নিশ্চিত করেছিলেন।

যুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ব্রিটেনবাসী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার অবদান অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা বিবেচনায় আনেনি। তারা ভোট দিয়ে জিতিয়ে দিয়েছিল শ্রমিক দলকে। এই দৃষ্টান্তকে স্মরণ রেখে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাজ করতে হবে, শুধু নেত্রীর সাফল্যের ওপর ভর করে রাজনীতিতে এগোনো যাবে না। আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, প্রধানমন্ত্রীর সততার অর্জন নিয়ে প্রচার-প্রচারনা তেমন নেই। শুধু যারা পত্র-পত্রিকা নিয়মিত পড়েন তারাই খবরটা জানেন। ৭ মার্চের ভাষণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করার পর যেমন ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়েছে এক্ষেত্রেও তেমন প্রচারণা চালানো উচিত।

পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্সের প্রতিবেদনে যেহেতু সরকারের বিরুদ্ধে কিছু দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে সেহেতু সরকার প্রধান হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এদিকটিতে প্রয়োজনীয় দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী এর দায়-দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। সরকারের কোনো ব্যক্তি কিংবা দলীয় নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডের ফলে প্রধানমন্ত্রীর এত বড় সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হোক তা আমাদের কারো কাম্য নয়।

লেখক: গীতিকার, প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এফএইচ