সঞ্জয় ঘোষ-এর তিনটি কবিতা

স্বীকার কর

স্বীকার কর তোমার পূর্বপুরুষ ছিলো শৈব— তারপর প্রয়োজনে তওবা করে নাও।
তবু স্বীকার কর। না হলে বল— তুমি কে, তা তুমি জানো না।
যদি তুমি সৎ— সত্যি তোমাকে আকড়ে ধরবেই।
গঙ্গা পদ্মা পুনর্ভবা— এ নদীর বয়স কত? কার সাথে মিশে গেছে কার শরীরের জল? কার ভাঁজে ভাঁজে ডুবেছে নগর-গ্রাম-তামার বন্দর? তা তুমি জানো।
সেই গ্রামদেবতাদের কথা তুমি ভুলে যেতে পারো— যারা একদিন এ জনপদে ধরে রাখতো সাপ ও সাহস।
আমাদের টোটেম ছিলো পাখি— তবু সে আনন্দ বৈভব ভেঙ্গে আমাদেরই ডাকা হলো অসুর-রাক্ষস নামে!
ঘৃণার ঘোড়াগুলো ছুটে আসে, দেখ কত যুগ নিষাদ সময় থেকে। তবু রক্তের নামে তুমি দোষ রটিয়ে দিলে জেনে শুনে— নিজেরই নামের পাশে লিখলে, জারজ!
নাক টিপে দেখ, চোখ টিপে দেখ।
বাঙালির চুল-চামড়া কেটে দেখতে খোলো গবেষণাগার। বল ভাগাড় থেকে এরা এসেছে।
তবু এ জারজ সংবাদ তুমি অস্বীকার কর— হে বাঙালি, অমৃতের সন্তান মোর মার।

***

বসন্তের তেজগাঁ শাখা

ঘুরে ঘুরে বসন্ত এসে আবার আমাদের স্টেশনে থেমেছে। বসন্ত ঘুরছে। কোকিল দায়িত্বে আছে প্রচারণার।
গত বছর তেজগাঁয় এ কাজে যে নিয়োগ পেয়েছিলো— এবার শোনা যাচ্ছে তার সাথে কাজে এসেছে আরও একজন। তার গলায় কিছুটা খাদ আছে। অফিস একই আছে, কৃষ্ণচুড়া। গাছটা একটা বসন্তের রুগ্ন কর্মচারি। পাতাছাড়া— ফুলের স্মৃতি-অযোগ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে চৈত্র চেহারায়!
বসন্তে কি মানুষ তাদের নিজেদের মাংস খাবার বাসনা ভুলে যায়? বসন্ত কি রোগ সারায়, নাকি সে নিজেই একটা রোগ?
মাটি ফেটে যা কিছু বেরিয়ে আসছে বাতাসের লোভে— তাতে এই ফাল্গুনের ইন্ধনগুলো যেভাবে কাজ করে, তোমাদের ভেতরে সে ইন্ধন কী রাঁধে? কোকিল না ডাকলে, নিজের চামড়া থেকে নিচে— বসন্তোদ্ধারে নেমে দেখতে? দেখেলে কী পেতে?
পাঠ্যসুচীর মত থোকা থোকা ফাল্গুন। যেখানে লেখা নাই, বসন্তে কাকেরও অবদান আছে।

ধানেন্দ্রিয় মরে গেছে। মানুষ তার চাকাগুলো নিয়ে চলে যাচ্ছে নতুন ঋতুতে।
তবু ঘামদৌড় আর চৈত্রকানা রোদে— বুঝি না কেমনে ডাকে ঢাকার কোকিল!

***

রাগের কঙ্কাল

রাগের শরীরে একটা ফড়িং বসলে তাকে উড়িয়ে দিও না। বসতে দাও— যতক্ষণ না পৃথিবীর ওলান থেকে ঝরে পরে বিষন্ন দুধ।
বিষের বুনিয়াদ থেকে দূরে, শেষ ঘাসভূমির সমাধিতে পৌঁছে আমরা মাটির হিসেব নিয়ে বসবো একদিন।
মাটি কি পরাজিত? মাটি কি রেগে আছে তোমার মতো?
শল্যচিকিৎসার বান্ডেল খুলে বিচিত্র ছুড়িতে আমরা সভ্যতার ব্যরিক্যাডগুলো কেটে কেটে দেখে নেবো। আদিম অভাব থেকে পাখিহত্যার দায় মুছে যতটুকু পবিত্র পাপ উঠে আসবে আমাদের হাতে— তাতে পাওয়া যাবে কতগুলো রাগের কঙ্কাল?

ধুলার সাগর থেকে ফিরে এসে আমরা নিশ্চই চোখ দেখাতে যাবো। চোখযন্ত্রে জানি না ধরা পরবে কতখানি নৃতত্ত্ব, কতটুকু ব্যথার বৈরাগ?

***

মানবকণ্ঠ/স্বরলিপি

Leave a Reply

Your email address will not be published.