সঞ্চয়পত্রের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ

সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন অর্থবছর ২০১৮-১৯। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৮ হাজার ২২৯ কোটি ৬১ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর আগের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাইয়ে বিক্রি হয়েছিল ৭ হাজার ৩৫২ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ বেড়েছে ৮৭৭ কোটি টাকা। জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, আমানতের সুদহার তুলনামূলক কম হওয়ায় এবং বেশ কয়েকটি ব্যাংকে নানা ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতির খবর প্রকাশিত হওয়ায় ব্যাংক খাতে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। তাই অধিকাংশ বিনিয়োগকারী ব্যাংকবিমুখ হয়ে সঞ্চয়পত্রকেই বেছে নিচ্ছেন। এ ছাড়া সম্প্রতি ব্যাংক মালিকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঋণের সুদহার কমাতে গিয়ে আরো এক দফা আমানতের সুদহার কমানো হয়েছে। যা বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয়পত্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

তবে সঞ্চয়পত্রের এই ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ একসময় সরকারের বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মন্তব্য করছেন অর্থনীতিবিদরা। কেননা এ খাত থেকে বেশি পরিমাণে ঋণ নিলে সরকারকে উচ্চ সুদ পরিশোধ করতে হবে। তাদের মতে, মূলত স্বল্প এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষরাই নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে অনেক সামর্থবান মানুষও এ খাতে বিনিয়োগ করছেন। সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগে মিস ইউজ হচ্ছে কিনা অর্থাৎ সামর্থ্যবান মানুষরাও এ খাতে বিনিয়োগ করছেন কিনা সেটা সরকারকে কঠোর অবস্থানে নজরদারি করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকের তুলনায় সুদহার বেশি হওয়ায় এবং কোনো ধরনের ঝুঁকি না থাকায় বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করছেন গ্রাহকরা। আর এক্ষেত্রে সাধারণত স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষরাই এ খাতে বেশি বিনিয়োগ করে থাকেন। এ খাত থেকে সরকারের ঋণ বেশি হলে সুদ পরিশোধের দায়ও বেশি হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকার তো জনগণের করের টাকা থেকেই এই সুদ পরিশোধ করবে, যেটা কিনা জনগণের কল্যাণেই ব্যয় হবে। তবে এ খাতে অপব্যবহার হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে। সেইসঙ্গে সঞ্চয়পত্র থেকে নেয়া ঋণ সরকারকে সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করতে হবে।

একই বিষয়ে বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখত বলেন, ব্যাংকে আমানতের সুদের হার ক্রমাগত কমতে থাকায় সাধারণ মানুষ তাদের সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগের জন?্য সঞ্চয়পত্র ছাড়া আর কোনো লাভজনক বিকল্প পাচ্ছে না। ফলে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে, বাড়ছে সরকারের ঋণের বোঝা। এতে সরকারের রাজস্ব বাজেটের ওপর চাপ পড়ছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে বাজেট ব্যবস্থাপনা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। আর সঞ্চয়পত্র থেকে বিপুল ঋণের চাপে সরকার বাজেট ব্যবস্থাপনায় যে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে, তা এড়ানোর পথ ‘একটাই’। সেটা হচ্ছে সুদের হার কমানো। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ‘পেনশন’ এবং মহিলাদের জন্য ‘পরিবার’ সঞ্চয়পত্র ছাড়া অন্য সব সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর পক্ষে মত দেন তিনি।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর ঘোষণা দিলেও নির্বাচনী বছরে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমাবে না সরকার। উল্টো সঞ্চয়কারীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনার প্রক্রিয়া সহজ ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। সারাদেশের সঞ্চয়পত্রের অফিসগুলোকে অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। যাতে গ্রাহকরা সঞ্চয়পত্র ক্রয়, নগদায়ন এবং মুনাফা তোলার জন্য অফিসে যেয়ে, ঘরে বসেই অনলাইনে করা যায়।

সঞ্চয় অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৮ হাজার ২২৯ কোটি ৬১ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় ৫ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। এই হিসাবে জুনের চেয়ে জুলাই মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়েছে ২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র বিক্রির পাশাপাশি এই খাত থেকে সরকারের নিট ঋণও বাড়ছে। জুলাই মাসে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে নিট ঋণ নিয়েছে ৫ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। গত জুন মাসে সরকার নিট ঋণ নিয়েছিল ৩ হাজার ১৬৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। অবশ্য, গত বছরের জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্রে নিট ঋণ ছিল ৫ হাজার ৫৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

প্রসঙ্গত, আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা পরিশোধের পর যে পরিমাণ অর্থ অবশিষ্ট থাকে তাকে বলা হয় নিট বিনিয়োগ। তাই বিনিয়োগের ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেটে নির্ধারিত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যয় করে থাকে। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতিমাসে মুনাফা দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গত অর্থবছরে (জুলাই-জুন) বিক্রি হয়েছে ৭৮ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র। এর আগের অর্থবছরে ২০১৬-১৭ বিক্রি হয়েছিল ৭৫ হাজার ১৩৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এদিকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ার কারণে গত অর্থবছরে সরকারের সুদ পরিশোধও বেড়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত জুলাই মাসে মূল ও মুনাফা পরিশোধে সরকারের ব্যয় হয়েছে তিন হাজার ১৯৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা (এর মধ্যে মুনাফা বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে এক হাজার ৮৯০ কোটি ৩২ লাখ টাকা)। আর বিদায়ী অর্থবছরের শেষ মাস অর্থাৎ জুনে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার নিট ঋণ নিয়েছে তিন হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের মে মাসে সরকার এই খাত থেকে নিট ঋণ নিয়েছিল তিন হাজার ৩০০ কোটি টাকা, এপ্রিলে নিয়েছিল তিন হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। মার্চে তিন হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা নিট ঋণ নেয় সরকার। ফেব্রুয়ারিতে নিট ঋণ নেয় চার হাজার ১৫৬ কোটি টাকা। জানুয়ারিতে ছিল পাঁচ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা।

তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা, যা ঘাটতি বাজেট অর্থায়নে সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা (সংশোধিত) থেকেও দুই হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বেশি। বিদায়ী অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৪ হাজার কোটি টাকা। যদিও চলতি অর্থবছরে এই খাত থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার লক্ষ্য রয়েছে ২৬ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ