সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন

মানুষের ছয়টি মৌলিক অধিকারের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল হলো খাদ্য। তাই সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে খাদ্যকে মৌলিক উপকরণ এবং ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে খাদ্যকে জীবনের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তবে আমরা কি সেই মৌলিক অধিকারের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারছি? কিংবা রাষ্ট্রও কি পারছে তার অক্সিজেনের জোগানদাতা জনগণকে ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাবার পরিবেশন করতে? এক কথায় উত্তর, পারছে না।

আধুনিক সভ্যতার একটা জটিল সময় আমরা পার করছি। দুষ্টচক্রের আবর্তে প্রতিনিয়তই আমাদের ঘুরপাক খেতে হচ্ছে। যে খাদ্য আমাদের জীবন বাঁচানোর উৎস, সে খাদ্যই মরণের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের দেশে বিচিত্রভাবে খাদ্যে ভেজাল মেশানো হয়। ফলে বিশ্বাস করে কোনো খাদ্য কেনাই সম্ভব হয়ে ওঠে না। আম, আনারস, কলা, পেঁপেসহ বিভিন্ন ফল ক্যালসিয়াম, কার্বাইড, ইথেন ও ইথলিন দিয়ে কৃত্রিমভাবে পাকানো হয়। আমদানিকৃত ফল তাজা রাখার জন্য ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন খোলা বা অনেক সময়ে নামি-দামি কোম্পানির মসলার প্যাকেটেও ভেজাল মেশানো হয়। মিনারেল ওয়াটার নামে যে পানি আমরা খাই তাতে বিশুদ্ধতা নিশ্চয়তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন রয়েছে। প্রাণরক্ষাকারী ওষুধেও এখন ভেজাল পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় দেশীয় পণ্য বিদেশি পণ্য বলে বিক্রি করা হয়। ক্রেতা যেসব সামগ্রী ক্রয় করছে ভোগের জন্য প্রায়শই দেখা যায় সে প্রতারিত হচ্ছে। আবার অনেক সময় ক্রেতা যে প্রতারণার শিকার হচ্ছে সে তা নিজেও বুঝতে পারছে না কিংবা এ সম্পর্কে সে সচেতন নয়। ক্রেতার অসচেতনতার অভাবেও বিক্রেতারা প্রতারণার সুযোগ নিয়ে থাকে।

এ ছাড়া পণ্যের উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ না থাকা, মূল্য তালিকা না থাকা, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্য নেয়ার অভিযোগ, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারিত করা, পরিমাপক যন্ত্রে কারচুপির, অবহেলা দ্বারা সেবাগ্রহীতার জীবন বিপন্ন করা, স্বাস্থ্যহানি ঘটানোর পণ্য বিক্রয়, খাদ্য অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদন বা পরিবেশন তো রয়েছেই। আপনার সারা বছরের অতি কষ্টে জমানো টাকা দিয়ে আপনি প্রাণপ্রিয় সন্তানসহ কোরবানির গরু কিনতে গেলেন। ছেলের পছন্দে মোটাতাজা, নাদুস-নুদুস একটা গরুও কিনলেন। কিন্তু পথিমধ্যে অথবা বাড়িতে আনার একদিন পর সাধের গরুটি স্ট্রোক করে মারা গেল। এর কারণ কী? কারণ একটাই। ওষুধ দিয়ে গরু মোটাতাজাকরণের ফলে দুই মাসের মধ্যেই সেটি ফুলেফেপে উঠেছিল। তাই পরিশ্রমবিমুখ নাদুস-নুদুস গরুটি একটু পরিশ্রমেই স্ট্রোক করে মারা গেল।

এখন কথা হচ্ছে ভেজালসংক্রান্ত এ ধরনের একটি ভয়ানক অপরাধের প্রতিকার আদৌ আছে কী না? উত্তর: অবশ্যই আছে। তা হলো অধিকার সচেতনতা। ব্যাপক জনসচেতনতা ও ব্যক্তি সচেতনতা। অন্তত এই একটি বিষয়ে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক। ইতিমধ্যে ভেজাল প্রতিরোধে বেশকিছু আইন প্রণয়ন এবং বাস্তবিক প্রয়োগের মাধ্যমে সরকারের সচেতনতা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। এ উদ্দেশে ২০০৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইন, ২০১৩ সালে নিরাপদ খাদ্য আইন এবং ২০১৫ সালে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন করা হয়। এই প্রত্যেকটি আইনই ভোক্তা বান্ধব। আইনের বাস্তব প্রয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু নমুনা পাঠকদের

জ্ঞাতার্তে তুলে ধরলাম: কেস স্টাডি ১: মাসুদুল মান্নান নামের এক ক্রেতা হাউয়াই এক্সপেরিয়েন্স শপ নামের একটি দোকান থেকে টি-১-৭ মডেলের একটি ট্যাব কেনেন। সাত দিনের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে সেটি মেরামত বা পরিবর্তন করে দেয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতি দেন বিক্রেতা। কিন্তু দুই দিনের মাথায় ট্যাবটিতে সমস্যা দেখা দিলে গ্রাহক বিক্রেতার কাছে যান। বিক্রেতা ট্যাবটি সারাতে গিয়ে আরো একটি পার্টস নষ্ট করে ফেলেন। তখন বিক্রেতা সেটিও ঠিক করে দিতে চান। কিন্তু ক্রেতা চান নষ্ট ট্যাবের বদলে নতুন ট্যাব। সমাধান না পেয়ে মাসুদুল মান্নান মামলা করেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে। সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা দুই পক্ষের শুনানি শেষে ট্যাবটি পরিবর্তন করে দেয়ার নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী বিক্রেতা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই ট্যাবটি পরিবর্তন করে দেন।

কেস স্টাডি ২ : রাজধানীর আইটি সিরামিক নামের একটি দোকান থেকে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ‘বাথ ও বেসিন’-এর এক সেট পানির কল পাঁচ হাজার ৫০০ টাকায় কিনেছিলেন আনোয়ারুল ইসলাম। কল দুটির ওপর পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি ছিল। বছর তিনেক ব্যবহার করার পর একটি কল থেকে ঠিকমতো সার্ভিস পাচ্ছিলেন না তিনি। কলের জয়েন্ট থেকে পানি লিক করছিল। সে অবস্থায় ওয়ারেন্টির কাগজ নিয়ে ক্রেতা দোকানির কাছে যান সার্ভিসিং সুবিধার জন্য। সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি প্রাপ্য সেবা দাবি করেন। কিন্তু দোকানি তাকে সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানান। তখন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের সুযোগ নিয়ে আনোয়ারুল ইসলাম ডকুমেন্টসহ লিখিত অভিযোগ করেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে। এতে আইন অনুযায়ী শাস্তি এড়াতে বিক্রেতা মিস্ত্রি পাঠিয়ে আনোয়ারুল ইসলামের কল সারিয়ে দেন।

অভিযোগ দায়ের ও পদ্ধতি : মহাপরিচালক, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, জাতীয় ভোক্তা অভিযোগ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও রংপুর বিভাগীয় কার্যালয় এবং প্রত্যেক জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর অভিযোগ দায়ের করা যাবে। তবে দায়েরকৃত অভিযোগ অবশ্যই লিখিত হতে হবে। ফ্যাক্স, ই-মেইল, ওয়েব সাইট, ইত্যাদি ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে বা অন্য কোনো উপায়ে অভিযোগ করা যাবে। অভিযোগের সঙ্গে পণ্য বা সেবা ক্রয়ের রশিদ সংযুক্ত করতে হবে। অভিযোগকারী তার পূর্ণাঙ্গ নাম, পিতা ও মাতার নাম, ঠিকানা, ফোন, ফ্যাক্স ও ই-মেইল নম্বর (যদি থাকে) এবং পেশা উল্লেখ করবেন।

প্রযুক্তির সুবাদে অভিযোগ দায়েরের ব্যাপারটি আরো অনেক সহজ হয়ে গেছে। এখন ভোক্তার অভিযোগটি স্মার্টফোনের একটি অ্যাপসে তুলে দিয়ে তা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে দাখিলের সহজ পদ্ধতি চালু হয়েছে। কিভাবে-কোথায় অভিযোগ করতে হবে এমন বিড়ম্বনায় না গিয়ে মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই এখন থেকে অভিযোগ করা যাচ্ছে। ‘ভোক্তা অধিকার ও অভিযোগ’- নামের এ অ্যাপটি পাওয়া যাচ্ছে গুগল প্লে-স্টোরে। – লেখক : প্রভাষক, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

মানবকণ্ঠ/এএএম