সচেতনতাই জরুরি

যক্ষ্মার নাই রক্ষা-এক সময় এমনটিই মনে করা হতো। কিন্তু সময় পাল্টেছে। যক্ষ্মা এখন আর ভয়াবহ কোনো রোগ নয় বরং প্রাথমিক পর্যায়ে যক্ষ্মা ধরা পড়লে বিনা খরচেই চিকিৎসা নিয়ে পরিপূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব। প্রতিবছর ২৪ মার্চ যক্ষ্মা দিবস পালিত হয়। ১৮৮২ সালে রবার্ট কচ টিবি জীবাণু আবিষ্কারের ঘোষণা করেন। ঠিক এর ১৮০ বছর পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই দিনকে বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস হিসেবে ঠিক করে, যার মূল বিষয় হচ্ছে জনগণকে সচেতন করা। যক্ষ্মা অধ্যুষিত ২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ নম্বরে। একটা সময় ছিল যখন বলা হতো যক্ষ্মা হলে রক্ষা নেই। কিন্তু সে কথার এখন আর কোনো ভিত্তি নেই। কারণ ছয় মাস নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে যক্ষ্মা সম্পূর্ণ ভালো হয়।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ লোক যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয় এবং তার মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার মৃত্যুবরণ করে। বিশ্বব্যাপী যক্ষ্মা রোগ বিস্তারের অন্যতম কারণ এইচআইভি এবং এইডস রোগের ব্যাপকতা। যেহেতু যক্ষ্মা একটি জীবাণুঘটিত রোগ, তাই যেসব রোগে বা কারণে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ওইসব রোগীর যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। কারো যদি তিন সপ্তাহ ধরে কাশি হয়, না কমে, এমনকি কাশি সারানোর ওষুধ খাওয়ার পরও। সঙ্গে জ্বর, শরীরের ওজন কমে যায়, রাতে জ্বর আসে, ক্ষুধামন্দা-এসব লক্ষণ থাকলে বুকের এক্স-রে আর কাশি পরীক্ষা করলে নিশ্চিত হওয়া যায় রোগটি যক্ষ্মা কি-না। যক্ষ্মা রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য দেশজুড়ে সরকারিভাবে রয়েছে বিনামূল্যে সম্পূর্ণ চিকিৎসার ব্যবস্থা। সারাদেশে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৪৪টি বক্ষব্যাধি ক্লিনিক, আটটি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, চারটি বিভাগীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, বিভিন্ন আরবান ক্লিনিক, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সামরিক হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল এবং ওয়ার্ক প্লেস যেমন ইপিজেড, বিজিএমইএ এবং অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান, জেলখানা এসব স্থানে বিনামূল্যে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা ও কফ পরীক্ষা করা হয়। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ প্রথম ডটস পদ্ধতি গ্রহণ করে।
১৯৮৪ সালে ব্র্যাক প্রথম একটি উপজেলায় এই যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শুরু করে এবং পরে ১০টি উপজেলায় সম্প্রসারণ করা হয় ১৯৯২ সালে। বর্তমানে ব্র্যাক ৪২টি জেলায় ২৯৫টি উপজেলায় কাজ করছে। সব মিলে সারাদেশে এক হাজারেরও বেশি স্থানীয় ল্যাবরেটরি রয়েছে রোগ নির্ণয়ের জন্য, বিনাপয়সার। আর চিকিৎসার জন্য রয়েছে ডটস কর্নার। যক্ষ্মার জন্য বেশ কয়েকটি ওষুধ আছে। নিয়মিত খেতে হয় কমপক্ষে ছয় মাস। কখনো কখনো চিকিৎসকের পরামর্শমতো আরো বেশি সময় খাওয়া লাগে। ডটস কর্নারে বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়া যায়। এরপর শুরু করে টানা ছয় মাস খেতে হয়। বাদ দেয়া যাবে না। সুস্থ মনে হলেও খেতে হবে। বাংলাদেশে যক্ষ্মা শনাক্তকরণের হার শতকরা ৭০ ভাগ। তবে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের আওতায় যে চিকিৎসা হয় তা ধরা হলে এই হার আরো বেশি হবে। আর শনাক্তকৃত যক্ষ্মা রোগীদের শতকরা ৯৫ ভাগ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যান।
আমাদের দেশে ২০১৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা এবং যক্ষ্মায় মৃত্যু অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একজন রোগী যদি নিয়মিত যক্ষ্মার চিকিৎসা নেয় এবং ওষুধ সেবন করে, তাহলে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারবে এবং স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারবে। পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে, তবে দামি খাবার খেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এ ক্ষেত্রে প্রথম দরকার সচেতনতা। আর সচেতনতাই পারে যক্ষ্মাকে নির্মূল করতে। সুতরাং নিজে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি অন্যকেও সচেতন করার বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
সাবেরীন সেতু