শ্রম আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী শ্রমিক স্বার্থের পরিপন্থী!

শ্রম আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী শ্রমিক স্বার্থের পরিপন্থী!

মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত শ্রম আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীকে শ্রমিক স্বার্থের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন শ্রমিক নেতারা। তারা বলেছেন, আইএলও’র চাপের মুখে কয়েকটি ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু কোন কোন ধারায় সংশোধনী আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা হয়নি। শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে যেসব বিষয় সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছিল তা বিবেচনায় নেয়া হয়েছে কিনা তা তারা জানেন না। যেটুকু প্রকাশ হয়েছে এর ভিত্তিতে শ্রমিক নেতারা মনে করছেন, এই সংশোধনীর মাধ্যমে শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষিত হবে না। এ কারণেই এর পক্ষে সরকার এবং মালিকপক্ষ একই সুরে কথা বলছে। শ্রম আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী বিষয়ে শ্রমিক নেতারা পৃথক প্রতিক্রিয়ায় মানবকণ্ঠকে এ মন্তব্য করেন।

শ্রমিক নেতারা বলেন, এ সংশোধনী আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। স্বাধীনভাবে সংগঠন করা এবং পছন্দমতো নেতা নির্বাচন করার আইএলও স্বীকৃত অধিকারের জন্য বাংলাদেশের শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে। ২০০০ এর বেশি শ্রমিক যেসব কারখানায় আছে সেখানে ২০ শতাংশ শ্রমিক সদস্য নিয়ে ইউনিয়ন করার বিধান করা হচ্ছে বলে প্রচার করা হলেও ২০০০ এর কম শ্রমিকের কারখানায় আগের বিধানই কার্যকর থাকবে। শ্রম আইনের ২৩, ২৬, ১৮০ ধারা বহাল থাকলে ইউনিয়ন করা যে কার্যত অসম্ভব তা শ্রমিক সংগঠনসমূহ দীর্ঘদিন ধরেই উপলব্ধি করছে ।

কর্মক্ষেত্রে নিহত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ২ লাখ টাকা নির্ধারণ করাকে মেহনতী মানুষের জীবনের সঙ্গে উপহাস করার সামিল বলে মন্তব্য করে শ্রমিক নেতারা বলেন, রানা প্লাজা ধসের পর হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত কমিটি ১৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করেছিল। স্কপের পক্ষ থেকে কর্মক্ষেত্রে নিহত শ্রমিকের জন্য আজীবন আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের দাবি জানানো হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইনে তা উপেক্ষা করা হয়েছে। আবার নারী শ্রমিকদের প্রসূতিকালীন ছুটি সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ৬ মাস করার দাবি দীর্ঘদিনের। এবারের প্রস্তাবিত সংশোধনীতেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে। এদিকে কিশোর শ্রমিকদের কাজে নিয়োগের সুযোগ রাখায় মালিকরা ১৮ বছরের নিচের শ্রমিক নিয়োগ করতে পারবে আইনের মারপ্যাচে। এ ছাড়াও শ্রমিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সংশোধনের জন্য যে সমস্ত প্রস্তাব করা হয়েছিল তা বিবেচনায় নেয়া হয়নি বলে নেতারা অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্কপ এবং শ্রমিক সংগঠনসমুহ শ্রম আইনের গণতান্ত্রিক সংশোধনের জন্য দাবি জানিয়ে আসছেন। বাংলাদেশের সংবিধান, আইএলও কনভেনশন এবং অতীতের অর্জিত অধিকারসমূহ বিবেচনা করে সংসদে পাস করার আগেই এ আইনের শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী ধারাসমূহ বাতিল করতে হবে।

শ্রম আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খান বলেন, আইন ছাড়াও শ্রমিকদের যেসব অধিকার আছে সেটা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। সেটা করার জন্য আন্দোলন করা হলে শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হচ্ছে, বরখাস্ত করা হচ্ছে, গুণ্ডা দিয়ে হামলা করানো হচ্ছে এবং শ্রমিক নেতাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এই সংশোধনগুলোতে শ্রমিকবিরোধী মনোভাব প্রকাশ পায়। যে প্রস্তাবগুলো সংশোধনের জন্য মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে তা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা হয়নি। এটা সরকারের একটি কৌশল। শ্রমিক সংগঠনের দাবিসমূহ বিবেচনার মধ্যে রাখা হয়েছে বলে মনে হয় না। আইএলও’র চাপে কিছু সংশোধনী আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের দেশের সরকারগুলো শ্রমিক বান্ধব নয়, মালিক বান্ধব। কিন্তু যদি ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা না দেয়া হয় তবে মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ওয়াজেদুল ইসলাম খান বলেন, আমাদের প্রধান যেসব দাবি ছিল তা একেবারেই বিবেচনায় নেয়া হয়নি। যেমন, আইএলও কনভেনশনে শ্রমিকদের অবাধ ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ট্রেড ইউনিয়ন করার ব্যাপারে শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। যা আইএলও কনভেনশনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশফেরা মিশু বলেন, একটি আইনের দু’একটি ধারা দিয়ে সব কিছু বিবেচনা করা যায় না। কেননা এই আইনের যেসব ধারা সংশোধনের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে তা পুরোটা প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রস্তাবিত সংশোধনের ক্ষেত্রে সরকার এবং মালিক পক্ষ একই সুরে কথা বলছে। ফলে এটা যে শ্রমিক বান্ধব নয় তা সহজেই অনুমেয়।

তবে আইএলও’র কান্ট্রি ডিরেক্টর টুয়োমো পোটিয়ানিনেন বলেন, আমরা চাই এমন একটি শ্রম আইন হোক, যা সবার জন্য কল্যাণকর। কেবিনেট সংশোধনীর খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে। এটি সংসদে পাস হবে। তারপর আইন হবে। সংসদে পাস হওয়ার আগে এই আইন নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে পারি না। তবে আশা করি, নতুন আইনে শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষিত হবে।

উল্লেখ্য, সোমবার প্রচলিত শ্রম আইনের ৪১টি ধারা সংশোধন করে নতুন শ্রম আইনের খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এই আইনে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু আইনে শ্রমিক স্বার্থবিরোধী অনেক ধারা আছে বলে দাবি শ্রমিক নেতাদের। তারা বলছেন, ক্ষতিপূরণ বাড়ানো হয়েছে বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে যে ক্ষতিপুরণ শ্রমিকদের দেয়া উচিত, আইএলও’র বিধান মেনে তা করা হয়নি। আর এখন মামলা করতে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন দরকার হবে, যা আরেকটি বড় ক্ষতির দিক। মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম দাবি করেছেন, আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী বর্তমান বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-কে আরো যুগোপযোগী ও শ্রমিকবান্ধব করা হয়েছে। নতুন আইনের নাম দেয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন ২০১৮’। শ্রম আইন ২০০৬-কে ২০১৩ সালে একবার সংশোধন করা হয়েছিল। তখন এই আইনের ৯০টি ধারা সংশোধন করা হয়েছিল। শ্রম আইনে ধারা ৩৫৪টি। এই সংশোধনী প্রস্তাবে দুটি ধারা, চারটি উপধারা, আটটি দফা সংযোজন করা হয়েছে। ৬টি উপধারা বিলুপ্ত করা হয়েছে। ৪১টি ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস