শোবিজ সেলিব্রেটিদের আগ্রহ ক্ষমতাসীন দলের সংরক্ষিত নারী আসনে

শোবিজ সেলিব্রেটিদের আগ্রহ ক্ষমতাসীন  দলের সংরক্ষিত নারী আসনে

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বারের মত বিজয়ী হয়ে সরকারের গঠন করেছে। জাতীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। সরকারি দল এবং দলের বাইরের সংরক্ষিত আসনের টিকিট পেটে তৎপর দেড় শতাধিক নারী নেত্রী ও অভিনেত্রীরা।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আগামী ১৭ ফেব্র“য়ারি সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। তবে এর আগে থেকেই সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হতে আগ্রহীদের তৎপরতা শুরু হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একঝাঁক তারকাও।

এবারের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণাতে অংশ নিতে দেখা গেছে তারকাদের। প্রতিষ্ঠিত নারী রাজনীতিবিদদের সঙ্গে প্রচারণার মাঠে পুরুষ অভিনেতা-শিল্পীদের পাশাপাশি সরব ছিলেন নারী অভিনেত্রী ও শিল্পীরাও। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- সুবর্ণা মুস্তাফা, শমী কায়সার, রোকেয়া প্রাচী, অঞ্জনা, তারিন জাহান, শামীমা তুষ্টি, তানভীন সুইটি, বাঁধন, পূর্ণিমা, অপু বিশ্বাসসহ অনেকে। তাদের উপস্থিতি এবারের প্রচারণায় যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। সেই অভিনেত্রীদের মধ্যে নারী সংরক্ষিত আসনে এমপি হতে চান অনেকেই।

গত মঙ্গলবার সংরক্ষিত নারী আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম বিক্রির প্রথম দিনই ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে গিয়ে তা সংগ্রহ করেন সারাহ বেগম কবরী, সুবর্ণা মোস্তফা, অপু বিশ্বাস, জ্যোতিকা জ্যোতি, আনোয়ারা, ফাল্গুনী হামিদ, দিলারা ইয়াসমিন, তারিন জাহান, শাহনুর, সুজাতা, শিউলি, রওনক বিশাখা শ্যামলী, মাহবুবা শাহরিন সহ বেশ কজন শোবিজ তারকা। আর বুধবার দ্বিতীয় দিনে মনোনয়ন সংগ্রহদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন চিত্রনায়িকা মৌসুমী, তারিন জাহান, অরুণা বিশ্বাস প্রমুখ। গতকালও অনেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ভোটের লড়াইয়ে অংশ নিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন তারানা হালিম (টাঙ্গাইল-৬), শমী কায়সার (ফেনী-৩), রোকেয়া প্রাচী (ফেনী-৩) ও তারিন জাহান (ঢাকা-১০)। দলীয় সবুজ সংকেত না পেয়ে জাতীয় নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম তারা প্রত্যাহার করলেও সংরক্ষিত নারী আসনে তারা দলীয় মনোনয়ন পাবার ব্যাপারে আশাবাদী।

এছাড়া আলোচনায় আছেন নবম জাতীয় সংসদে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে বিজয়ী হয়ে আসা চিত্রনায়িকা সারাহ বেগম কবরী। রয়েছেন নবম ও দশম জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য তারানা হালিমও, যিনি সদ্য শেষ মন্ত্রিসভায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী এবং পরে তথ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় অভিনেত্রী, নির্মাতা ও বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক রোকেয়া প্রাচী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ সম্পর্কে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এবারের সংসদ নির্বাচনে সরাসারি অংশ নিতে মনোনয়নপত্র নিয়েছিলাম। তবে দল থেকে মহাজোটের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ায় নেত্রীর নির্দেশে মহাজোটের প্রার্থীর জন্যই কাজ করেছি। এখন এলাকাবাসীর চাওয়া বিবেচনায় সংরক্ষিত আসনের জন্য মনোনয়নপত্র কিনেছি।’

তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে দেশের এগিয়ে যাওয়ার ধারাতে দীর্ঘদিন ধরে কর্মী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। ফেনী-৩ আসনে (দাগনভূঞা- সোনাগাজী) এলাকাবাসীর পাশে রয়েছি। যদি আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী আমার ওপর আস্থা রেখে আমাকে মনোনয়ন দেন, তবে অবশ্যই আমি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাব।

অভিনেত্রী সুজাতা জড়িত রয়েছেন আওয়ামী সাংস্কৃতিক জোটের সাথে। এছাড়াও বঙ্গবন্ধু শিল্পী ঐক্য জোট, শিল্পী সংঘ, শিল্পী সমিতিসহ পরিচালক সমিতি, প্রযোজক সমিতির মতো নানা পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। তিনি বলেন, ‘আমি একজন মুজিব আদর্শের সৈনিক। সারাজীবন তারই চোখে আমি রাজনীতিকে দেখেছি। মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা যে দৃঢ় মনোবল নিয়ে দেশ পরিচালনা করছেন তাতে করে আমাদের ভেতরে আরও একবার মানুষের মুখোমুখি হয়ে রাজনীতি করার ইচ্ছে জেগেছে।’

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাস। এখন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি হতে চান। অপু বিশ্বাস বলেন, ‘আমি সংরক্ষিত আসনের জন্য মনোনয়ন চাই। এ দায়িত্ব পালন করার মতো যোগ্যতা আমার আছে। আমি প্রচন্ড পরিশ্রম করতে পারি। আছে অভিজ্ঞতাও। নারী ও শিশুদের জন্য অনেক দিন ধরে কাজ করে আসছি। প্রধানমন্ত্রী যদি আমার ওপর আস্থা রাখেন, তা হলে অবশ্যই আমি তার মূল্যায়ন করব।’

আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি হওয়ার বিষয়ে আশাবাদী জানিয়ে অপু জানান, প্রধানমন্ত্রী তাকে এ সুযোগ করে দিলে তিনি সংসদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।

অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তবে সে মনোনয়ন না পেলেও সংরক্ষিত আসনে তিনি মনোনয়ন পাবেন বলে আশা করছেন।

জ্যোতিকা জ্যোতি বলেন, ‘নিজ এলাকার সঙ্গে অনেকের কোন যোগাযোগই থাকে না। কিন্তু আমি সব সময়ই নিজ এলাকার আওয়ামীলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি আমাকে মনোনয়ন দেন তবে নিজ এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চেষ্টা করবো। এছাড়া নারী ও শিক্ষার ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করা আমার আগ্রহের বিষয়। আর সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ডেভেলপ করার ব্যাপারেও যদি আমার সুযোগ থাকে সেটিও আমি মনে প্রাণে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবো।’

জ্যোতিকা জ্যোতি আরো বলেন, ‘আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গেই তার ওঠাবসা ছিলেন। সেই হিসেবে পারিবারিক ভাবেই আমার ছোট থেকেই আমি রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত। আমি গতবার নির্বাচনেও মনোনয়ন ফরম কিনেছিলাম। এবারও নিয়েছিলাম। সেই হিসেবে বলা যায়, আমি রাজনীতিতে নতুন না। আমি অনেক আগে থেকেই রাজনীতির মাঠে আছি।’

অভিনেত্রী রওনক বিশাখা শ্যামলী বলেন, ‘আমার পুরো পরিবারই আওয়ামীলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আমার নানা এনামুল হক শামীম এবার পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হয়েছেন। আমি নিজেও সরাসরি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামীলীগের রাজনীতি করছি। আমি এবার কেন্দ্রীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ উপ-কমিটিতে ছিলাম। এছাড়া আমি শরীয়তপুর জেলা তাঁতীলীগের সিনিয়র সহ সভাপতি হিসেবেও আছি। আমাকে নেত্রী যদি মনোনয়ন দেন তবে নিজের সর্বোচ্চ শ্রম আমি দলের জন্য দিতে চাই। আমি দেশের অব কাঠামোগত উন্নয়ন করতে চাই। এছাড়া তরুণ সমাজকে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের প্রতি উৎসাহিত করার প্রতিও আমার বিশেষ নজর থাকবে।’

৭৫ পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এদেশে প্রথম গান গাওয়া শুরু করেন শিউলী আহমেদ। কিশোরী শিল্পী হিসেবে পেয়েছেন ‘বঙ্গবন্ধু পুরস্কার।’ ৯০ এর নির্বাচনে নৌকার পক্ষে গান নিয়ে ছোট শিউলি পথে নামেন। বর্তমানে যুক্ত রয়েছেন বঙ্গবন্ধু শিল্পী গোষ্ঠীর সাথে। এবার শিউলি দেশের কল্যাণে কাজ করতে সংসদে যেতে চান।

শিউলি বলেন, বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী আহমেদ আলি। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকায় বিভিন্ন সময় নির্যাতিত হয়েছি আমরা। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান করার জন্য সবসময় আমি একটা শ্রেণির চক্ষুশূল ছিলাম। এখন দেশে মুক্তিযুদ্ধের সরকার রয়েছে। আমিও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নিতে চাই।

বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রডিউসার এসোসিয়েশন এর সর্বাধিক ভোটে বিজয়ী সিনিয়র সহ-সভাপতি মাহবুবা শাহরীন সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করেছেন গত মঙ্গলবার। তিনি বাংলাদেশ জননেত্রী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি, টাঙ্গাইল জেলা এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি। মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ করেই গণবভনে গিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে দোয়া নেন তিনি।

গত ৩০ ডিসেম্বরের ভোটে ২৫৭টি আসন পাওয়া আওয়ামী লীগ সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের ৫০টির মধ্যে ৪৩টি পাচ্ছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ভোটে তারা নির্বাচিত হবেন। আর দলের জন্য নির্ধারিত আসনে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়, তারাই জিতে আসেন।

ইতিমধ্যে এক হাজারের উপরে মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে বলে আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন। আজ শুক্রবার আওয়ামীরীগের মনোনয়ন ফরম বিক্রি শেষ হবে।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের ফল গেজেট আকারে প্রকাশের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা আছে। সে হিসাবে আগামী ১ এপ্রিলের মধ্যে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে।

মানবকণ্ঠ/এআর/এসএস