শেষ সময়ের প্রচারণায় আশাবাদী প্রার্থীরা

শেষ সময়ের প্রচারণায় আশাবাদী প্রার্থীরা

খুলনা মহানগরে নতুন ‘নগর পিতা’ নির্বাচনের আর মাত্র একদিন বাকি। আজ রাত পোহালেই অনুষ্ঠিত হবে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। গতকাল রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার-প্রচারণা শেষ হলেও প্রার্থী ও তাদের কর্মী সমর্থকদের চোখে ঘুম নেই। গতকাল শেষ দিনের প্রচারণা ছিল জমজমাট। বৃষ্টি উপেক্ষা করে শেষ প্রচারণা চালিয়েছেন প্রার্থীরা। এ সময় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা, নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চেয়েছেন। শেষ সময়ের প্রচারণা নিয়ে আশাবাদী প্রার্থীরা।

গত ২৪ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া নির্বাচনী প্রচারণা চলেছে টানা ২০ দিন। টানা ২০ দিনের প্রচারণায় ক্লান্ত হলেও চোখে ঘুম নেই প্রার্থীদের। এখন তারা ভোটের হিসাব নিকাশ কষছেন। প্রার্থীদের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টরাও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নিদ্রাহীন রাত কাটাচ্ছেন। আগামীকাল মঙ্গলবার নতুন ‘নগর পিতা’ নির্বাচনে ভোট দেবেন খুলনা মহানগরবাসী।

এদিকে গাজীপুর সিটির নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার পর দেশের মানুষ এখন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের দিকে তাকিয়ে আছে। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠায় রয়েছে গোটা জাতি। তবে খুলনায় চলছে উৎসবমুখর পরিবেশ। নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে জানিয়েছে রিটার্নিং কর্মকর্তা ইউনুচ আলী।

রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্র জানায়, খুলনায় এবার প্রথমবারের মতো মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবার মেয়র পদে ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক (নৌকা), বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টি মনোনীত মেয়র প্রার্থী এস এম সফিকুর রহমান মুশফিক (লাঙল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত মেয়র প্রার্থী মাওলানা মুজ্জাম্মিল হক (হাত পাখা) ও সিপিবি মনোনীত মেয়র প্রার্থী মো. মিজানুর রহমান বাবু (কাস্তে)। এ ছাড়া নগরীর ৩১টি সাধারণ ওয়ার্ডে ১৪৮ জন এবং ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৩৯ জন কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবারের নির্বাচনে খুলনা সিটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৮৬ ও নারী ২ লাখ ৪৪ হাজার ১০৭ জন। ভোটকক্ষ ১ হাজার ১৭৮টি। এ নির্বাচনে ২৮৯টি কেন্দ্রের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) কেন্দ্র রয়েছে ২৫৪টি এবং ৩৫টি সাধারণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। এবার ভোট কক্ষ রয়েছে ১ হাজার ৫৬১টি। আর অস্থায়ী ভোট কক্ষ ৫৫টি। প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার রয়েছেন ৪ হাজার ৯৭২ জন।

আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক গতকাল সকাল ৯টায় দৌলতপুর পাবলা দফাদার পাড়া চানাচুর পট্টিতে শেষ দিনের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। এরপর শিপইয়ার্ড, মতিয়াখালী মৌজা, মোল্লা বাড়ি, লবণচরা, জিন্নাহপাড়া, হঠাৎ বাজার, বান্ধা বাজার, বোখারী পাড়া, মোক্তার হোসেন রোড সংলগ্ন এলাকায় সাধারণ ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট চান তিনি। এছাড়া মোবাইল ফোনে তিনি প্রতিটি নাগরিকের কাছে ভোট প্রার্থণা করেন।

অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু প্রচারণার শেষ দিনে সকালে ৩১নং ওয়ার্ডের নগরীর প্রবেশদ্বার খানজাহান আলী সেতু থেকে গণসংযোগ শুরু করে চানমারী, মিয়াপাড়া, মৌলভীপাড়া, দোলখোলা, টি বি বাউন্ডারি রোড, টুটপাড়া, বান্ধা বাজার, রূপসা স্ট্যান্ড রোডে প্রচারণা চালান। গতকালও বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা বাকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

এ সময় সাধারণ ভোটারদের হাতে হাতে লিফলেট তুলে দিয়ে ভোট চান খুলনা-২ আসনের সাবেক এই এমপি। এরআগে সকালে নিজ বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশের বিরুদ্ধে গ্রেফতার ও হয়রানির অভিযোগ তুলে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানান বিএনপির প্রার্থী মঞ্জু। তিনি বলেন, ‘একটি অর্থবহ, অংশগ্রহণমূলক ও ভীতিহীন নির্বাচনের জন্যই আমি বারবার সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা বলেছি।’ এ সময় তিনি ভোট ডাকাতির আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে মঞ্জু বিভিন্ন বস্তিতে কালো টাকা ছড়িয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছেন বলে আওয়ামী লীগের নির্বাচন সমন্বয়কারী এসএম কামাল হোসেন অভিযোগ করেছেন। এসব অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে প্রচার-প্রচারণা।

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে প্রস্তুত নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে গতকাল রাত ১২টার পর থেকে মাঠে নেমেছে বিজিবি। নির্বাচনে সাড়ে ৯ হাজার পুলিশ, বিজিবি, এপি ব্যাটেলিয়ান, আনসার-ভিডিপি সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি থাকবে র‌্যাবের ৩২টি টহল টিম এবং ৪টি স্টাইকিং ফোর্স। একই সঙ্গে নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সিটি নির্বাচনের আচরণ বিধিমালা প্রতিপালনের লক্ষ্যে গতকাল সকাল থেকে দায়িত্ব পালন শুরু করেছে ৩১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তারা কেন্দ্র ভিত্তিক নিজ নিজ অধীক্ষেত্রে দায়িত্বে রয়েছেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী জানান, সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করতে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এরইমধ্যে নির্বাচনের ভোটগ্রহণের জন্য ব্যালট পেপার, সিল, কালিসহ নির্বাচনী মালপত্র খুলনায় এসেছে। এসব মালপত্র বিভাগীয় মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে। এই নির্বাচনে ১ হাজার ৮১০টি ব্যালট বাক্স প্রয়োজন হবে। আজ সোমবার সকাল ১০টা থেকে স্ব স্ব কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারদের এসব মালপত্র বুঝিয়ে দেয়া হবে।

তিনি জানান, গতকাল বিকেল থেকে ২২ সদস্যের নির্বাচন পর্যবেক্ষক টিম দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন। তারা নির্বাচনের সকল বিষয় পর্যবেক্ষণ করবেন। একই সঙ্গে ১৬ মে পর্যন্ত ৩১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন।

খুলনা জেলা প্রশাসক মো. আমিন উল আহসান বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রয়েছে। ১৬ প্লাটুন বিজিবি মাঠে নামানো হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র ও নির্বাচনী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা প্রতিপালন নিশ্চিতকরণে ৩১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’ এ ছাড়া আজ সোমবার ১০ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন বলেও তিনি জানিয়েছেন।

র‌্যাব-৬’র অধিনায়ক খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মোতাবেক নির্বাচনে র‌্যাবের ৩২টি টিম দায়িত্ব পালন করবে। যার প্রতিটি টিমে ৮ জন সদস্য থাকবে। এ ছাড়া ৪টি স্টাইকিং ফোর্স থাকবে। এ টিমে ১০ জন করে থাকবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস