শেষ মুহূর্তে জমজমাট ঈদবাজার

ঈদে আয়োজনটা যেমন বিশাল তেমনি প্রয়োজনটাও বেশি। তাই তো ঈদকে সামনে রেখে হিসেবি মানুষটাও হয়ে ওঠেন কিছুটা বিলাসী। ঈদকে উপলক্ষ করে এখন বেশ সরগরম রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ। ২১ রমজান পর্যন্ত বিক্রেতারা অলস সময় পার করলেও, ২৩ রমজান থেকে দম ফেলার সুযোগ পাননি দোকানীরা। সে ধারাবাহিতা আছে আজো। থাকবে চাঁদ রাত অবধি বলে ধারণা। এখন চলছে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা।

রাজধানী ঢাকার বেশ কিছু বিপণি বিতান ও শপিং মল ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের রমরমা বেচাকেনা। কেউ কিনছেন নিজের জন্য, কেউবা প্রিয় মানুষটার জন্য। কেউবা সপরিবারে এসেছেন ঈদের পোশাক কিনতে। বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গী করে পোশাক পছন্দ করছেন অনেকেই। সব মিলিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই সামলাতে হচ্ছে বাড়তি চাপ।

ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেটে গিয়ে দেখা গেছে সেখানের প্রায় প্রতিটি দোকানে ক্রেতাদের ভিড়। এখানে ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছেন খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা সজীব কর্পোরেশনের কর্মী সাইদুর রহমান। পরিবারের সবার জন্য ঈদের কেনাকাটা করছিলেন তিনি। তার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীতে। তিনি বলেন, ঈদের পরদিন গ্রামের বাড়িতে যাব, তাই সবার জন্য পোশাক কিনছি।

রাজধানী বাসাবো এলাকা থেকে এসেছেন তিন ভাই আশিক, আতিক ও আরমান। বড় ভাই আশিক জানালেন, তিনি একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় চাকরি করেন। রোববার বেতন ও বোনাস হয়েছে। এ কারণে গতকাল ছোট দুই ভাইকে নিয়ে এসেছিলেন কাপড় কিনতে। গত কয়েক বছর ধরেই ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের বিপণি বিতানগুলোতে ভারতীয় সিরিয়াল ও চলচ্চিত্রের বিভিন্ন চরিত্রের এমন নামে পোশাক দেখা যাচ্ছে। মূলত ক্রেতাদের আকর্ষণ করতেই এমন নামকরণ করা হয়। এই নামকরণ দোকান মালিকরা নিজেরাই করে থাকেন। এ ধরনের কৌশল অবলম্বন করে এর আগে সফল হওয়ায় এবার ঈদেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

রাজধানীর নিউমার্কেট, চাঁদনী চক মার্কেট ও গাউছিয়া মার্কেট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেল। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এবারো ঈদ বাজারে নারী ক্রেতাদের চাহিদার শীর্ষে রয়েছে গাউন। শাড়ি কিংবা সালোয়ার-কামিজের চেয়ে এ ধরনের পোশাকই বেশি বিক্রি হচ্ছে বলে জানালেন বিক্রেতারা। দেশের আবহাওয়া উপযোগী না হলেও, হিন্দি সিরিয়াল, বলিউডের প্রভাব আর অন্যকে অনুকরণের হুজুগই তরুণীদের পছন্দের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন বিক্রেতারা। বিক্রেতাদের মতে, বেশ কয়েক বছর ধরে তরুণীদের মধ্যে বেশ ঝোঁক দেখা যাচ্ছে ‘গাউন’ নামের এই পোশাকের প্রতি। পাশ্চাত্যের বিয়ের পোশাকের আদলে তৈরি লম্বা এবং ঘেরওয়ালা এ জামাগুলোতে প্রাচ্যের ডিজাইনের মিশেলে বিভিন্ন কাটের জমকালো পোশাকে ভরা রাজধানীর প্রায় সব শপিং মল। তরুণীদের মধ্যে এ পোশাক কেনার আগ্রহই বেশি।

মা-বোনের সঙ্গে যমুনায় কেনাকাটা করতে এসেছেন শারমিন সুলতানা তৃষা। মা ও তিন বোনের জন্য মোট পাঁচটি শাড়ি কিনেছেন তিনি। কিনেছেন পরিবারের ছোটদের জন্য জামা-কাপড় ও জুতা। তিনি বলেন, এখানে সব ধরনের পণ্য পাওয়া যায়। ঘুরে ঘুরে পছন্দের সব জিনিস কিনেছি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তামান্না জানান, আগে ঈদের কেনাকাটা করতে সপরিবারে দেশের বাইরে যেতেন। কিন্তু এখানে ভারতীয় নানান ধরনের শাড়ি পাওয়া যায়। এসবের দাম তিন হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে।

বেইলি রোডের সব দোকানেই টাঙ্গাইল শাড়ির সম্ভার ভালো। এখানে উইংস অব বাটার ফ্লাইয়ে রয়েছে তসর, টাঙ্গাইল সিল্ক, হাফ সিল্ক ও জামদানি। ইকরাম নেওয়াজ ফরাজী ও সারা ইকরাম দম্পতি নগরজুড়েই বিভিন্ন মার্কেটে ঘুরে কেনাকাটা করছেন। সারা জানান, দুই পরিবারের সবার জন্যই উপহার কিনতে হচ্ছে তাই প্রতিদিনই বিভিন্ন মার্কেটে ঢুঁ মারছি। রোববার তিনি মিরপুর বেনারশি পল্লী থেকে একটি কাতান ও একটি জামদানি কিনেছেন। দুটি শাড়ির দাম যথাক্রমে ৬ হাজার ও ৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া বসুন্ধরার দেশাল থেকে সালোয়ার-কামিজের তিনটি সেট কিনেছেন, দাম পড়েছে গড়ে ৩ হাজার টাকা করে।

শেষ মুহূর্তে ঈদের কেনাকাটায় রাজধানীসহ পুরো দেশ যেন পরিণত হয়েছে কেনাকাটার মহোৎসবে। নগরীর অভিজাত শপিংমল থেকে শুরু করে ফুটপাতেও এখন ক্রেতার উপচেপড়া ভিড়। পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের চাহিদা মেটাতে পছন্দের পোশাকের খোঁজে তারা ছুটে বেড়াচ্ছেন এক মার্কেট থেকে অন্য মার্কেটে। সকাল থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত চলছে এ কেনাবেচা। তার পরও বিক্রেতারা বলছেন, ভিড় অনুযায়ী ব্যবসা যথেষ্ট নয়। অনেকেই আসছেন, দেখছেন কিন্তু কিনছেন না। অপরদিকে ক্রেতারা বলছেন, বেশিরভাগ দোকানী একদরে বেশি লাভে পোশাক বিক্রি করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ঈদের বাজার ছেয়ে গেছে ভারতীয় আর চাইনিজ পোশাকে। মেয়েদের জন্য আকর্ষণ লং ফ্রক, ডাবল পার্টের লং জামা আর লেহেঙ্গা। দেশের বুটিক হাউজগুলোতেও যাচ্ছেন ক্রেতারা। একটু আরামদায়ক কাপড় আর রঙের বৈচিত্র থাকায় চাহিদাও ভালো। মার্কেটে, দোকানে ক্রেতার ভিড়। কিন্তু বিক্রেতাদের হতাশা কাটছে না। তারা বলছে, বিক্রি বাড়াতে নানারকম অফার দিয়েছে শপিংমলগুলো। যেখানে ছাড়ের পাশাপাশি থাকছে নগদ টাকা পাওয়ার সুযোগ।

গতকাল সোমবার দুপুরে বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের সামনেও দেখা গেল গাড়ির দীর্ঘ সারি। বেশিরভাগই ক্রেতা। কেউ কিনে বের হচ্ছেন আর কেউ কিনতে ঢুকছেন। ঈদের কেনাকাটা করতে আসা মানুষদের কারণে এসব এলাকাতে যানজট চোখে পড়েছে। পোশাক, প্রসাধনী, জুতা, টুপি, ভোগ্যপণ্য সব কিছুই কেনাকাটা চলছে ঈদ মার্কেটে।

রাজধানীর মার্কেটগুলোতে পোশাকের পাশাপাশি মেয়েদের জুয়েলারি, সিঁদুর, চুড়িসহ অন্য অনুষঙ্গ বেশ ভালোই বিক্রি হচ্ছে বলে জানালেন দোকানীরা। এ ছাড়া দেশি কাপড় ও ডিজাইনারদের তৈরি পোশাকের বুটিক হাউসগুলোতে ভিড় বেশি লক্ষ্য করা গেছে। পাঞ্জাবি, টি-শার্ট, শার্ট ও জিন্স প্যান্টের দোকানেও বেশ ভিড়। পা ফেলার জায়গা নেই শিশুদের পোশাক ও খেলনা সামগ্রী, কসমেটিক্স ও গহনার দোকানেও। ভিড় বাড়ছে জুতার দোকানে। বাদ নেই ইলেকট্রনিক্স দোকানও। টেইলারিং শপগুলোর রাত-দিন এখন আলাদা করে দেখার ওপায় নেই।

সোমবার সন্ধ্যায় যমুনা ফিউচার পার্ক শপিং মলে কথা হয় উত্তরা এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে কেনাকাটা করতে আসা শামীম আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এ বছর পোশাকের দাম গতবারের চেয়ে কিছুটা বাড়তি। তবুও উৎসব উপলক্ষে কেনাকাটা তো করতেই হবে। তবে এ বছর পোশাকের ডিজাইনে খুব একটা বৈচিত্র্য নেই।’

ধানমণ্ডির বাসিন্দা একটি প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরি কারখানায় কর্মরত মো. কামাল হোসেন বলেন, ঈদের বেশি দিন বাকি নেই। শেষ সময়ে ভিড় বেশি থাকে জানা থাকলেও বেতন বোনাস না পাওয়ায় আগে কেনাকাটা করতে পারিনি, তাই এখন পরিবারের লোকজন নিয়ে এসেছি। পরিবারের সবার জন্যই কিছু না কিছু কিনছি।

ফার্মগেট এলাকার বাসিন্দা সনিয়া খন্দকার। তিনি বলেন, গতবারের তুলনায় এবার মেয়েদের ড্রেসের দাম অনেক বেশি। এদিকে রাজধানীর শপিং মলগুলোর সামনের রাস্তায় গতকাল প্রায় সারা দিনই যানবাহন আর মানুষের ভিড় ছিল। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের রীতিমত হিমশিম খেতে দেখা গেছে।

ঈদ সামনে রেখে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসে চলছে মূল্যছাড়। ছাড় দেয়া হচ্ছে নানা ধরনের পোশাক ও ফ্যাশন অনুষঙ্গে। আবার কেনাকাটায় ক্রাচকার্ডে দেয়া হচ্ছে হাজার টাকার পণ্যে নানান উপহার। সময়-সুযোগ, সামর্থ্য আর পছন্দের নানা সমীকরণ মেলাতে বেচাকেনার এ মহাযজ্ঞ চলবে চাঁদরাত পর্যন্ত।

মানবকণ্ঠ/এএএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.