শেষ বিকেলের মন

শেষ বিকেলের মনসেবারও এমনই হয়েছিল। প্রতিবারই এমন হয়ে শেষ পর্যন্ত শেষই হয়ে যায় সবকিছু। খুব কষ্ট পায় রেণুকা। আঘাতে আঘাতে মনের পাঁজরের হাড়গুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে অন্তরটা কেবল ফাঁকা ফাঁকা লাগে। প্রথমবার মনে হচ্ছিল এমন ঘটনা জীবনে কেবল একবারই হতে পারে, একবারই আসে ভালোবাসা-জীবনে, এবং হারিয়ে গেলে তা আর কখনোই ফিরে আসে না। এমন কষ্টের দহন, দহনের কষ্ট জীবনে বারবার আসা কিছুতেই সম্ভব নয়। কিন্তু সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত করে রেণুকার মনঘরে দ্বিতীয়বার কেউ আসে অতিথি হয়ে।

দ্বিতীয় এর সঙ্গে সঙ্গে, বলতে গেলে একই সমান তালে, হয়তো বা একটু আগ-পিছ করে তৃতীয়, চতুর্থবারও হল। প্রায় কাছাকাছি গল্প, চরিত্র, কাছাকাছি অনুভূতি‚তি আর কষ্টের দাগগুলোও ছিল প্রায় একই রকম গভীর, খাঁজকাটা বেদনাদায়ক। সেসব উতরেও এসেছিল রেণুকা।

সহজেই কী আসতে পেরেছিল সে? কী যন্ত্রণাই না পোহাতে হয়েছিল তাকে। মনঘরে ক্রন্দন, বাইরে সংসারের ঠমক। তখন মনে হত এর চেয়ে মরণও আরামের এবং সহজতর। কিন্তু জীবনের প্রতি মায়া- সে ওতো কম নয়। তাইতো উতরে ওঠে সে। বেঁচে থাকাটাই যেন বেশি ভালো লাগে।

 আরো পাওয়া হল, কষ্টেরও কমতি ছিল না। শুধু কি কষ্টই?  অস্বীকার সে করবে না। সত্যি সুখও ছিল ঢের। প্রতিবারই মুঠো মুঠো সুখ এসেছিল জীবনে আলো হয়ে। এক একবার মনে হত এত সুখ জীবনে যদি লেখাই ছিল তবে কেন এতটা দেরি হলো! কেন সুখের গাড়িগুলো এখানে এসে ফিরে যাওয়ার রাস্তা ভুলে গেল না?

সবগুলোর একই রূপ। রেণুকা কী সেধে গিয়েছিল? না, কারো কাছেই সে সেধে যায়নি। কেমন করে ঘটে গেল প্রথমবার! কত পালিয়ে ছিল রেণুকা। তবু ধরা দিতে হল। হার মেনেছিল সে। হার মেনে ধরা দিয়ে পরে মনে হল জয়লাভ করেছে। প্রেমই জিত, প্রেমই সুখ; বাকি সবকিছু অসুখ। প্রেমহীন জীবন কিছুই নয়। এমনটাই তো হওয়ার কথা জীবনে। নইলে আর কীসের জীবন।

রেণুকার কাঁচা রোদ্দুরের মতো রং আর বুদ্ধিদীপ্ত চকচকে চাহনি ছিল সকলের নজরকাড়া। লেখাপড়া বেশিদূর এগোয়নি। এত রূপ নিয়ে লেখাপড়া সম্ভব হয়নি? অল্প বয়সেই ঠিকাদারের বউ হতে হলো তাকে। কিন্তু সুখী হয়নি প্রথম থেকেই। তবু সুখী সুখী চেহারা আর সংসারের ঠমক দেখে মানুষ উদাহরণ দিয়ে বলত, গিয়ে দেখ রেণুকার সংসার। তোরা পারিস ওর মত? কত্ত সুখ মেয়েটার!

ট্যাক্স অফিসের বড় অফিসার ডালিম, রেণুকাদের প্রতিবেশী। দুই হাতে টাকা কামায় আর ইচ্ছামতো উড়ায়। চলন-বলনেও পরিপাটি। যার কাছে রেণুকার স্বামী কাওসারের কোনমতেই পাত্তা পাওয়ার কথা না। সেই ডালিম এক সময় রেণুকার জন্যই কাওসারের সঙ্গে বন্ধুত্ব করল।

ডালিমের কাছে রেণুকা ঠিক জোনাকির মতো। আপন আলোয় অন্ধকার দূর করে দেয়। ঘরের কাছে এমন আলো থাকতে অন্ধকার কেই বা চায়!  একে পাওয়ার জন্য ঠিকাদার কেন, সদরঘাটের কুলির সঙ্গেও এক থালায় ভাত খেতে মানা নেই।

ধন্য হয়েছিল ঠিকাদার কাওসার। কোলে রাখি না মাথায় রাখি; এমনি আদর আপ্যায়নের সঙ্গে ডালিমকে ঘরে নিয়ে আসত রোজ।
রেণুকার হাতের একটু যত্নআত্তির সহিত এক কাপ চা খাওয়ার অভ্যাসটা এই ঘরেই হয়ে উঠল ডালিমের।  চায়ের তেষ্টার সঙ্গে আরো কিছুর তেষ্টার প্রকাশ করতে দ্বিধা করেনি ডালিম।

সেসব দিনগুলোর কথা কেমন করে ভুলবে রেণুকা। সেই দুপুর, আকাশ ফেটে ঝড় নামল, প্রতিবেশী ডালিম দেখল উভ্রান্ত রেণুকা গায়ে মাথায় কাপড় নেই, ছুটছে দিগ্বিদিক¦দিক। কাওসারকে কে বা কারা আটকে রেখেছিল। ডালিমই নানা জায়গায় ছুটোছুটি করে তাকে ছাড়িয়ে এনে রেণুকার চিন্তা দূর করে। রেণুকার কপাল থেকে দুশ্চিন্তার গভীর রেখাটা মুছে দেয়ার দায়িত্বখানি তার হাতেই বর্তায়।

পুরো ঘটনাটি সাজানোও মনে হয়েছিল একবার, রেণুকার কাছে। এভাবে আরো কত কি সাহায্য। সবই করেছিল রেণুকার জন্য। সেই আকাশ ফাটা ঝড়ের সন্ধ্যায় রেণুকার চোখের দিকে তাকিয়ে একটুখানি কৌশলে ডালিম বলেছিল শুধু একটি মাত্র কথা-
‘একটু হাসলে কী এমন ক্ষতি, শুনি?’

জীবনে প্রথম মনে হল মনের ঘরে কেউ উঁকি মেরে অলিগলি সব দেখে নিল পলকেই। কেঁপে উঠেছিল রেণুকা। পালিয়ে গিয়েছিল ডালিমের সামনে থেকে। এরপর সপ্তাহ খানেক সামনে আসেনি। ডালিমের চোখের ভেতর দেখতে পেয়েছিল নিজের সর্বনাশের ছায়া।

তার দুঃখ তারই ছিল। কাউকে তো বলতে যায়নি কখনো। সবাই তো তাকে সুখীই জানে। কেমন করে এতকাল পরে এই একটি মানুষ তার মনের অতি গভীরের বন্ধগলিতে প্রবেশ করে জেনে নিল সেখানে কোন হাসির চিহ্ন নেই।  ডালিমের সব প্রতিশ্রুতি আছড়ে পড়তে থাকল রেণুকার পদতলে।

দ্বিতীয়বার, কিছুটা সময় নিয়ে একটু একটু করে এগিয়েছিল রেণুকা। সেবারও কিছুতেই চায়নি সে। তবু মন দিতেই হল। আবির তখন রেণুকার দু’বছরের ছোট। কোন কিছু দিয়ে যখন আবিরকে এড়ানো যায়নি, তখন এই বয়সের দেয়ালটা বারবার দাঁড় করেছিল রেণুকা, আর বারবারই আবির তা লাথি দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। যেখানে মনের সাথে মন মিশে একাকার হয়ে গেছে, সেখানে এই সামান্য বয়সের ছোট-বড় নিয়ে যারা ভাবে তারা সংকীর্ণমনা বৈ কিছুই নয়।

তীব্র আকর্ষণ হত আবিরের প্রতি। আবিরের ছোট ছোট কথা, হাসি, কী মায়া! শেষে ভালো না বেসে পারেনি? কত কষ্টই না দিয়েছিল ডালিম। মনে পড়তো বারবার। ঠকতে সে চায়নি আর কারো কাছে। তবু মন জানি কেমন কেমন, কী যে সে চায়!

তাইতো মনের আশ্রয় খুঁজে পেতে ঝুঁকে পড়ল আবিরের উপর। রেণুকা জেনেছিল, মনকে শূন্য রাখতে নেই, কিছু না কিছু মনের দখল নিবেই। তারচেয়ে প্রেমই পূর্ণ করে থাকুক মনের ঘর। কে বলেছে মানুষের জীবনে একবারই প্রেম আসে? এইতো, রেণুকার জীবনে চার চারবার এসেছিল। একই মনোঃআঙ্গিক সুখ, আকর্ষণ, চিনচিনে ব্যথা, একই রকম কষ্ট আর কাছে পাওয়ার ব্যকুলতা।
আবার একই রকমভাবে কষ্ট দিয়ে তারা একে একে ছেড়েও গিয়েছিল রেণুকাকে। ফের একই ভাবে ফিরেও এসেছিল।

সবই দিয়েছিল রেণুকা। কাওসারের ঘরে রাতের পর রাত সহস্রবার মৃত্যুবরণ করে ভোরবেলা সুখী হওয়ার ভান, আর কত! এবার না হয় সত্যিকারের একটু সুখী হই। তাই মনের সমস্ত প্রেম জেগে উঠেছিল আপনা আপনি। সুখী হয়েছিল তারাও, যারা এসে নোঙর ফেলেছিল রেণুকার ঘাটে।

এ কেমন আশ্চর্য মেয়ে! এর কাছে না আসতে পারলে জীবন ও কর্ম সকলই বৃথা। ডালিমের বেলায় সেই চেষ্টা হয়েছিল চরমরূপে। শেষে অনেক জেদাজেদি অনেক সাধাসাধির পর রেণুকা যখন কাওসারের ঘর ছেড়ে ডালিমের বউ হতে চাইলো, তক্ষুনি টনক নড়ল ডালিমের।

সমাজে মান যাবে। আবার প্রথম স্ত্রীর হাত থেকে রক্ষাও পাওয়া যাবে না। মামলা মকদ্দমায় গেলে চাকরিটাও হারাতে হবে। রেণুকাকে এড়িয়ে চলে, তবু রোজ কাছে আসতে ভুলে না। কথার চেয়ে কাজটাই বেশি প্রাধান্য পায়। রেণুকা বুঝতে পারে, মনের আবেগ মরে গিয়ে এখন শুধু শরীরের প্রবল প্রবাহটাই টিকে আছে ডালিমের।

রেণুকাকে কেন্দ্র করেই সংসারে অশান্তি। বলল, যেমন আছি তেমনই থাকি, বিয়ের দরকার কি? আলাদা সংসারে থেকেই সব হবে। দরকার হলে তোমার পুত্রের আশাও পূরণ করব। ভরন পোষণ আমিই দেব। তবু বিন্তীর মাকে খেপিয়ে লাভ নেই। ও বড় জেদি মেয়ে।

রেণুকার তখন কঠিন অবস্থা। ডালিমকে ছাড়া জীবন অন্ধকার। কাওসারও যখন জেনে ফেলেছে তখন আর ওই সংসারে আত্মসম্মান নিয়ে বসবাস সম্ভব নয়। আর যেখানে মনের ক্ষুধা মনেই রয়ে যায়, তবু জীবন পার হয়ে যায় ভাঙ্গা আয়নার মত, সেই জীবনের আর কি পিছুটান?

শেষে অবস্থা বেগতিক দেখে ডালিম দিল যোগাযোগ বন্ধ করে। এই মেয়ের সঙ্গে চুরি করে প্রেম করাই সম্ভব, বিয়ে করে সমাজের চোখে ছোট হওয়ার কোন  মানে নেই।

রেণুকা নিজেকে সামলে নিল আবিরকে পেয়ে। আবিরের দায়িত্বজ্ঞান খুবই টনটনে। আবীরও বিবাহিত।  তবু রেণুকাকে যে পুরুষ একবার দেখেছে সে ভুলে যায় নিজের অতীত বর্তমানের কথা। শুধু রেণুকাকে নিয়ে ভবিষ্যৎ এর স্বপ্ন দেখে তারা।

রেণুকা তুখর প্রেমময়ী। বড্ড বেশি ভালোবাসায় ঠাসা তার মন। প্রথম প্রথম ভালো লাগলেও পরে এতটা সহ্য হয় না আবিরের। ডালিমেরও হয়নি সহ্য। এত প্রেম সামাল দেয়ার ক্ষমতা নেই ওদের। ওদের প্রেম যেন শরীরের উপরেই এক মাখনের প্রলেপ। ভেতরটাকে ভিজতে দেয় না তারা। সাধটা উপরেই থাকে, উপর থেকেই মিটে যায়। কিন্তু রেনুকা চায় বাঁচতে, ভালোবেসে বাঁচতে।

তাদের কাছ থেকেই তো শেখা। এমনি একজনকে পেলে পুরো জীবনটা সুখে বুঁদ হয়ে থাকা যেত। ইচ্ছে করে যোগাযোগ বন্ধ করে রাখে আবীর। মিথ্যে করে বলে দেশের বাইরে ছিলাম। এরপর খুব অল্প সময়ের জন্য এসেছিল লিপন। কেমন করে যেন কথায় কথায় ভাসা ভাসা প্রেম। এরমধ্যেই একদিন দেখা। আর ওই একদিনেই রেণুকা গলে যায়। এরপর আর লিপনের খবর থাকে না। উল্কার মতো এসে উল্কার মতো হারিয়ে গেলে রেণুকার আহত মন আশ্রয় নেয় স্বপনের মনে।

কেমন করে অতীতের সমস্ত ইতিহাস মুছে গিয়ে রেণুকার জীবনে ঝলমল করে রোদ ওঠে। এত সুখ কল্পনাকেও হার মানায়। স্বপন বলত, তোমাকে পাব বলেই হয়তো এতদিন বিয়েটা করিনি। বয়সে সমান; কিন্তু প্রেমে সবার থেকে ছাড়িয়ে। রেণুকার বিস্ময়ের শেষ নেই। কেমন করে একটা পুরুষ একটা নারীকে এত ভালোবাসতে পারে!

সব ভুলে মজে যায় এই শেষের স্বপনের দিকে। জীবনের সমস্ত ভাল কিছু উৎসর্গ করে তাকে। আহা! প্রেম বুঝি এমনও হয়! সময় আসে স্বপনেরও। রেণুকা বড্ড বেশি প্রেমিকা। কাছে থাকলেও যেন মন ভরে না, ওর অতি ভালোবাসা অত্যাচারের মত মনে হয় স্বপনের কাছে।

ওরা মানে- রেণুকা হল সেই নারী, যাকে পেলে জীবন ধন্য হয়। রেণুকার প্রচ্ছন্ন আকর্ষণে তারা জীবন বাজি রেখে ডুবতে আসে। আবার এই প্রচ্ছন্নতাই একটা সময়ে অসহিষ্ণু মনে হতে লাগে ধীরে ধীরে ।  স্বপন বলে, তোমাকে কোনদিনই আমি ছাড়তে পারব না, কিন্তু বিয়ে তোমাকে করা সম্ভব না। সমাজ বলে একটা ব্যাপার তো রয়েই যায়। তাকে অগ্রাহ্য করে কী জীবন বাঁচে?

রেণুকা বলে, কিন্তু এসব জেনেই তো এসেছিলে আমার কাছে। এতকিছুর পরে আজ কেন এই কথা? রেণুকা যেন গোপন পৃথিবী। যে পৃথিবীতে সূর্যের আলো আসতে মানা আছে।  ততদিনে রেণুকা কাওসারের সংসার ত্যাগ করেছে।

তার কথা আর মনে করতে চায় না সে। প্রথম জীবনে কাওসারের মতো অপ্রাণীর নাওয়ে রেণুকাকে তুলে দিয়েছিল বলেই জীবনে এত ছন্দপতন হলো তার। ততদিনে ঢেউয়ে ঢেউয়ে কুল ভেঙেছে অনেকখানি।

স্বার্থের জন্য মিথ্যার ফুলঝুড়ি। এড়িয়ে চলে স্বপন। কিন্তু মিলনটাকে এড়াতে পারে না। ফিরে আসে বারবার। আবার বেজে ওঠে বিচ্ছেদের বাঁশি।

আশ্বাস দিয়ে বলে, বিয়ে আমি যাকেই করি তুমিই আমার সবকিছু। তোমার কাছে আসতেই হবে আমার।  অনেক বছর পরে ফিরে আসতে চায় ডালিম, আবির ক্ষমা চায়, আর স্বপন? যার কথা ভেবে রেণুকার কেবলই দীর্ঘশ্বাস! কিন্তু কারো জন্যই আর হৃদয়ের পরতে ভালোবাসার ডালি সাজায় না রেনুকা।

জীবনে যখন বিকেল নামে, তখন সকালের স্নিগ্ধতা, দুপুরের নির্জনতার চেয়ে সন্ধ্যার আলো-আঁধারির প্রেমই তাকে বেশি প্রলুব্ধ করে। রেণুকার শেষ বিকেলের মন এক মায়াবী সন্ধ্যার অপেক্ষায়।

মানবকণ্ঠ/এএম