শুধু চাকরি নয়, শিক্ষকতা হোক ব্রত

শুধু চাকরি নয়, শিক্ষকতা হোক ব্রত

সমাজে কিছু কিছু পেশা রয়েছে, সেই পেশার মানুষ সবার কাছেই আদৃত। তাদের কদর সবার কাছেই। সেসব পেশাকে সম্মানীত পেশা হিসেবেই অভিহীত করা হয়। আর এরকম নির্ধারিত পেশাজীবী মানুষদের সম্মান জানাতে, তাদের পেশাকে সম্মান জানাতে নির্ধারিত থাকে এক একটি দিন। যে দিন নির্দিষ্ট সেই পেশার মানুষ, নির্দিষ্ট সেই পেশার গুরুত্ব এবং সম্মান আলাদা করে স্পষ্ট হয়। এই কাজটি নির্দিষ্ট দেশের সীমানায় তাদের মতো করে হতে পারে, আবার জাতিসংঘের শিক্ষা সংস্কৃতি বিভাগের উদ্যোগে

আন্তর্জাতিকভাবেও হতে পারে। শিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষকতা। শিক্ষার প্রায় পুরোটাই গুরুনির্ভর। স্বশিক্ষার কথা বলা হলেও বর্তমান বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন বিশ্ব সেই ধারণা থেকে অনেকটাই সরে এসেছে। ফলে শিক্ষার প্রায় পুরোটাই গুরুনির্ভর, শিক্ষকনির্ভর। আজকে প্রতিযোগিতার যে আশা-নৈরাশ্যের পৃথিবীর দেখা আমরা পাচ্ছি, সেই ধ্বংসস্তূপের পিঠে উঠে দাঁড়াতে হলে আমাদের স্থায়ী উন্নতির দিকে নজর দিতে হয়। আর সেই নজর দেয়ার একমাত্র এবং প্রধানতম পথ শিক্ষা। শিক্ষা ক্ষেত্রের নানা সমস্যা। আমরা যত আধুনিকরণের দিকে নজর দিচ্ছি শিক্ষার সমস্যাও বাড়ছে। প্রাচীনকালে শিক্ষাকে খণ্ড খণ্ড করে দেখা না হলেও এখন হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই স্বতন্ত্র শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিলেন। তবে আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রের বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে শিক্ষাগুরু বিষয়ে। কথাটি আবারো স্মরণে এলো ভারতে পালিত শিক্ষক দিবস উপলক্ষে। দেশটিতে ৫ সেপ্টেম্বর পালিত হয় শিক্ষক দিবস। ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ ছিলেন একাধারে রাজনীতিবিদ, দার্শনিক ও জনপ্রিয় শিক্ষক। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তার গুণমুগ্ধ ছাত্ররা তার জš§দিন পালন করতে চাইলে তিনি দিনটিকে শিক্ষক দিবস হিসেবে উদযাপনের আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরপর থেকে দিনটি শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এবার দিনটিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে দেখেছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনেক বন্ধুই তাদের শিক্ষককে সম্মান জানিয়ে নানামুখী লেখা তাদের দেয়ালে ঝুলিয়ে দিয়েছেন। এর মাঝে নেতিবাচক কথা চোখে না পড়লেও আমার মনে নেতিবাচক দিকটিই খোঁচা দেয়। আমি ইতিবাচক দিক দেখতে পাই কম বলেই হয়তো।

ছেলেবেলায় কাজী কাদের নেওয়াজের একটি কবিতা আমাদের পাঠ্যসূচিতে ছিল। সেখানে শিক্ষাগুরুর সম্মানের দিকটি উঠে এসেছে। বাদশার ছেলে শিক্ষকের পায়ে হাত না দিয়ে কেন শুধু পানি ঢেলে দিচ্ছে তা নিয়ে বাদশাহ শিক্ষককে ভর্ৎসনা করেছেন, যে তার ছেলেকে কেন আদব শেখানো হচ্ছে না? আবার বিপরীত দিকে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পণ্ডিত মশাই’ গল্পও আমাদের পড়তে হয়েছে। যেখানে স্কুল পরিদর্শক লাট সাহেবের তিন পায়ের কুকুরের পেছনে মাসে খরচ হয় ৭৫ টাকা। আর আটজনের সংসারের ঘানি টানা পণ্ডিত মশাইয়ের মাসিক বেতন ২৫ টাকা। যা কিনা লাট সাহেবের কুকুরের একটি পায়ের খরচের সমান। এই যে দুইটি বিপরীত চিত্র, তা এখনো বর্তমান। আমাদের শিক্ষকদের এখনো পাওনার দাবিতে, সম্মানের দাবিতে রাজপথে নামতে হয়। পাওনার দাবিতে রাজপথে নেমে এলে তাদের ওপর জলকামানও দাগা হয়। আবার শিক্ষকদের দাবি আদায়ের জন্য দিনের পর দিন অনশনও করতে হয়।

আমাদের কর্মজীবী মানুষের তালিকার প্রথম দিকে রয়েছে সরকারি, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে এই পেশার মানুষের সংখ্যা অনেক। কিন্তু যারা এই পেশায় নিয়োজিত তাদের কতজন স্বেচ্ছায় এসেছেন এ পেশায়, তা কিন্তু ভেবে দেখার বিষয়। শিক্ষকের সম্মান, তাদের আন্তরিকতা নিয়ে যে প্রশ্ন ওঠে, তার কারণও এই। সরকার প্রাথমিক শিক্ষায় বড় অংকের বিনিয়োগ করছে। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে কোনো শিশু যেন বঞ্চিত না হয়, সেদিকে আন্তরিক নজর দিয়েছে। তারপরও কেন যেন শহরাঞ্চলের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাতে নারাজ। এই নারাজ অভিভাবকদের ভেতর থেকে আমি বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। তাই রাজধানীর একটি নামি এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে ভর্তি করেছিলাম আমার সন্তানকে। ভেবেছিলাম, এতো এতো নজরদারি, এতো এতো বিনিয়োগ-নিশ্চয় ভালো কিছুই হবে। কিন্তু আমার সে আশায় গুড়েবালি দিয়ে মাসাধিকাল পরেই আমার সন্তান স্কুলবিমুখ হয়ে ওঠে। কিছুতেই তাকে স্কুলে পাঠানো সম্ভব হয় না। কান্নাকাটি, চিৎকার শুরু হয় স্কুলে যাওয়ার সময় হলেই। ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে ছেলের মুখে স্কুল বিমুখতার কারণ জানা গেল। স্কুলে তার ক্লাস নেয় উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা।

শিক্ষকরা ক্লাসে প্রায় আসেনই না বলা চলে। আর শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ঢুকেই শিশুদের ওপর চালায় চড়-থাপ্পড়। এমনকি শিক্ষকরাও শিশুদের নানাভাবে নির্যাতন করে। যে কোনো একটি শিশুর দুষ্টুমির শাস্তি সবাইকে পেতে হয়। তাই আমার ছেলে আর ওই স্কুলে যাবে না বলে বেঁকে বসে। পরবর্তীতে তাকে অন্য একটি বেসরকারি স্কুলে ভর্তি করালে, সে ঠিকই নিজ আগ্রহে স্কুলে উপস্থিত থাকতে চায়। আমাদের সব শিক্ষকেরই যদি সত্যিকার অর্থেই শিক্ষকতা পেশায় স্ব-ইচ্ছেতে আসা হতো, তাহলে হয়তো আমার শিশুকে সরকারি বিদ্যালয় ছাড়তে হতো না। আমরা পড়ালেখা শেষ করে যেনতেন প্রকারে একটি চাকরি চাই। নিশ্চিত জীবন চাই, তাই যে যেখানে যেভাবে-সুযোগ পাই ঢুকে পড়ি। এভাবেই শিক্ষকতার মতো মহান পেশাতেও অনেকেই আসেন। যাদের স্বপ্নে কখনোই শিক্ষকতা ছিল না। ফলে আমরা কাক্সিক্ষত ফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। সরকারের প্রয়াস এবং বিনিয়োগ বিফলে যাচ্ছে।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছিলেন, আগে শিক্ষক ছিল পাকা আর ভবন ছিল কাঁচা, কিন্তু এখন ভবন হয়েছে পাকা আর শিক্ষক কাঁচা। ফলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দিন দিন অধঃপতন ঘটছে। আজ শ্রদ্ধা করার মতো শিক্ষকের সংখ্যা আমাদের সামনে থেকে কমে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে জনপ্রিয় শিক্ষকের তকমা। অন্য বিভাগের শিক্ষার্থী হয়েও নির্দিষ্ট কোনো শিক্ষকের ক্লাস করার জন্য চুপিচুপি পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে বসে পড়ার দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যার সমাধান যেমন আমাদের হাতে অর্থাৎ আমরা যারা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চাই তাদেরই নিতে হবে। তেমনিভাবে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় নিয়ে আসতে সরকারকেও উদ্যোগী হতে হবে। শিক্ষকদের পে-স্কেল সংক্রান্ত জটিলতা, টাইমস্কেল, গ্রেডসহ নানা সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই হয়তো শিক্ষকতা শুধু পেশা হিসেবে থাকবে না, তা হয়ে উঠবে ব্রত, প্রকৃত সাধনা।
– লেখক: সাংবাদিক, কবি