শুঁটকি কিনতে কক্সবাজারে

যারা শুঁটকি ভর্তা পছন্দ করেন, তাদের পাতে অন্য আর কোনো তরকারি না দিলেও নাকি চলে। এই এক ভর্তা দিয়েই নাকি তারা দুপুর বা রাতের খাবার সেরে নিতে পারেন। আর সেই শুঁটকি যদি হয় সাগর পাড়ের কোনো জেলা থেকে সংগ্রহ করা তবে তো আর কথাই নেই। কারণ শুঁটকিপ্রেমীদের মতে, সাগর পাড়ের শুঁটকির মজাই আলাদা। সে জন্য অধিকাংশেরই পছন্দের শীর্ষে বলা যায় কক্সবাজারের শুঁটকিকে।

পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন নগরী। এখানে দেশীয় পর্যটকরা ছাড়াও প্রচুর পরিমাণে বিদেশি পর্যটক আসেন। তাদের মধ্যে শুঁটকিপ্রেমীর সংখ্যাও একেবারে নেহাত কম নয়। ফলে ভ্রমণ শেষে কক্সবাজার থেকেই তারা শুঁটকি কিনে নিয়ে যান। আগে কক্সবাজারে ছোট পরিসরে শুঁটকি উৎপাদন হলেও এখন বড় পরিসরে ও বাণিজ্যিকভাবে শুঁটকি উৎপাদন করা হয়। জানা যায়, কেবল শুঁটকি রফতানি করেই প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা আয় করা হচ্ছে। আর স্থানীয়ভাবে শুঁটকি বিক্রির হিসাব তো এর বাইরেই থাকল।

কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকা মহেশখালীর সোনাদিয়া, গোরকঘাটা, তাজিয়াকাটা, কুতুবজোম, কুতুবদিয়া উপজেলার বড়ঘোপ, খুদিয়ারটেক, আলী আকবর ডেইল, অংজাখালী, পশ্চিম ধুরুং, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, সেন্টমার্টিন, জালিয়াপাড়া, সদর উপজেলার নাজিবারটেক, খুরুশকুল, সমিতিপাড়া, চৌফলদণ্ডিসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় বিপুল পরিমাণ শুঁটকি তৈরি হয়। এসব শুঁটকির মধ্যে সামুদ্রিক রূপচাঁদা, ছুরি লাক্কা, কোরাল, সুরমা, লইট্যা, চিংড়ি এবং মিঠাপানির মাছের মধ্যে শোল, কাচকি, কুচো চিংড়ি, মলা, গইন্যা, বাইলা, ফাইস্যাসহ প্রায় ২০ প্রজাতির মাছের শুঁটকি হয়।

কোথায় পাওয়া যায়: শুঁটকি বিক্রির জন্য একসময় কক্সবাজারের টেকপাড়া, রুমালিরছড়া, কানাইয়ার বাজার ও বিমানবন্দর সড়কের মুখে ফুটপাতে বেশকিছু দোকান ছিল। এখন এর পাশাপাশি বিক্রিতে এসেছে আভিজাত্য। পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ বার্মিজ মার্কেটের অভিজাত দোকান, হোটেল-মোটেল জোন, লাবণী বিচ মার্কেট, কলাতলী, কক্সবাজার শহরের মধ্যে বড় বাজারসহ বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা যায় সুদৃশ্য শুঁটকির দোকান। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এসব দোকান থেকে শুঁটকি সংগ্রহ করেন।

শুঁটকির দরদাম: কক্সবাজার শহরের বড়বাজারের শুঁটকি মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে বিভিন্ন দামে বিভিন্ন রকমের শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে। এই শুঁটকি মার্কেটের মেসার্স সুন্দরবন শুঁটকি বিতানের বিক্রেতা সেলিম শুঁটকির দরদাম সম্পর্কে মানবকণ্ঠকে জানান, প্রতি কেজি বড় ছুরি শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে ৫০০-৭৫০ টাকা, ছোট ছুরি শুঁটকি ২৫০-৩০০ টাকা, লইট্ট্যা শুঁটকি ৩৮০-৪৫০ টাকা, বড় সাইজের লইট্ট্যা শুঁটকি ৫৫০ টাকা, সুরমা শুঁটকি ৫৫০-৬০০ টাকা, কোরাল শুঁটকি ৯০০-১০৫০ টাকা, লাককা শুঁটকি ২০০০-২৮০০ টাকা, লাল চিংড়ি শুঁটকি ১১০০-১৫০০ টাকা, চেপা পুঁটি শুঁটকি ৩৫০-৪০০ টাকা, মলা শুঁটকি ৪৫০-৬০০ টাকা, কাচকি শুঁটকি ৫৫০-৬৫০ টাকা, রূপচাঁদা শুঁটকি ১৭৫০-১৮৫০ টাকা, কালো চাঁদা শুঁটকি ৮০০-১০০০ টাকা, টুনা/মাইট্ট্যা শুঁটকি ১৪০০-১৬০০ টাকা, পাইশ্যা শুঁটকি ২৫০-৪০০ টাকা, ফেওয়া শুঁটকি ৫০০ টাকা, লবণ ইলিশ শুঁটকি ২৫০-৫০০ টাকা, ইলিশ শুঁটকি ৬০০ টাকা, গইন্যা মাছ শুঁটকি ৫০০ টাকা, পোয়া শুঁটকি ৪০০-১১০০ টাকা, বাইম/কামিলা শুঁটকি ৫২০-৬০০ টাকা, বাতাসি/ অলুয়া শুঁটকি ৩০০-৪০০ টাকা ও রিঠা মাছ শুঁটকি ৫৫০-৬০০ টাকা।

শুঁটকির পুষ্টিগুণ: শুঁটকি মাছের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ডা. ফারহানা মোবিন জানান, ‘প্রচুর পরিমাণে রৌদ্রে শুকানো হয় শুঁটকি মাছ। তাই এতে ভিটামিন ‘ডি’-এর পরিমাণ রয়েছে পর্যাপ্ত অনুপাতে। ভিটামিন ‘ডি’ হাড়, দাঁত, নখের গঠন মজবুত করার জন্য যথেষ্ট জরুরি। শরীরের জন্য উপকারী অনেকরকম খনিজ লবণ রয়েছে এই মাছে। যারা কঠোর দৈহিক পরিশ্রম করেন তাদের জন্য এটি যোগ্য খাবার। আর যারা বয়স অনুযায়ী অতিরিক্ত মোটা, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি, তারা শুঁটকি মাছ খাবেন না। বাড়ন্ত শিশুদের জন্য ভীষণ উপকারী। নিয়মিত শুঁটকি মাছ খায় এমন ব্যক্তিদের ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বর, যক্ষ্মা এই অসুখগুলো সহজে হয় না।’

সাবধানতা: মাছি ও পোকামাকড় থেকে রক্ষা করার জন্য নানা শুঁটকিতে নানা ধরনের বিষাক্ত কীটনাশক, অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার করা হয়। ফলে শুঁটকির গুণগত মান নষ্ট হয়। তবে উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীরা জানান, আগে কীটনাশক ব্যবহার করা হলেও এখন তারা মাছ ভালোভাবে শুকিয়ে পলিথিনের প্যাকেটে সংরক্ষণ করেন। ফলে শুঁটকির মান ভালো থাকে এবং নষ্ট হয় না। শুঁটকিতে বর্ষা মৌসুমে ব্যবহৃত কীটনাশকের মধ্যে রয়েছে নগস, মেলাথিয়ন, ডায়াজিনন, সুবিক্রন এবং পাউডার জাতীয় কীটনাশক ডেসিফ। এসব শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। শীত মৌসুমে বাতাস যখন উত্তর থেকে প্রবাহিত হয়, তখন মাছি বসলেও ডিম হয় না। এ সময় ব্যবসায়ীরাও কীটনাশক ব্যবহার করেন না। এ জন্য শুঁটকি ব্যবসায়ীরা পরামর্শ দেন রান্নার আগে গরম পানিতে শুঁটকি ভিজিয়ে নিতে।

মানবকণ্ঠ/এসএস