শিশু প্রহরে জমজমাট গ্রন্থমেলা

অমর একুশে গ্রন্থমেলার দশম দিন গতকাল শনিবার সকালটা ছিল শুধুমাত্র শিশুদের জন্য। এ সময় পুরো মেলা প্রাঙ্গণ শিশুদের কলকাকলীতে মুখর হয়ে ওঠে। প্রকাশকরা জানালেন, তৃতীয় শিশু প্রহরে বিক্রি বেশ ভালোই হয়েছে। মেলায় প্রতি শুক্র ও শনিবার শিশু প্রহর ঘোষণা করেছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ।

মেলার সময়সূচিতে সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত শিশু প্রহরের জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু বেলা গড়ালেও শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। তাদের কলকাকীলতে মুখরিত ছিল মেলা প্রাঙ্গণ। সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছিল ক্ষুদে বইপ্রেমীদের উপচেপড়া ভিড়। তারা স্টলে স্টলে ঘুরে বেড়িয়েছে পছন্দের বইটি কেনার জন্য। কেউ কেউ বইয়ের পাতা উল্টেপাল্টে দেখেছে। যে বইটির প্রচ্ছদ, ভেতরের অলঙ্করণ ভালো লেগেছে সেটি কিনেছে।

অন্যদিকে শিশু প্রহর উপলক্ষে সিসিমপুরের মঞ্চে ছিল হালুম, ইকড়ি, টুকটুকির উপস্থিতি। তাদের উপস্থিতি শিশুদের বাড়তি আনন্দ দিয়েছে। এ সময় শিশুরা তাদের সঙ্গে নেচে-গেয়ে মেলা উপভোগ করেছে।

শিশু চত্বর ঘিরে সবার কণ্ঠে ইকরি এসো, টুকটুকি এসো, হালুম এসো-ধ্বনি। শিশুদের ডাকের সঙ্গে সঙ্গে পর্দা উঠিয়ে প্রথমে বই হাতে মঞ্চে প্রবেশ করে সিসিমপুরের প্রিয় চরিত্র টুকটুকি। ঘাড় দুলিয়ে শিশু বন্ধুদের কাছে নিজের পরিচয় দেয়, আমি টুকটুকি, বই পড়তে ভালোবাসি! আমার লম্বা লম্বা চুল, বেণী করে রাখি! এ সময় শিশুদের মধ্যে আনন্দের হুল্লোড় খেলে যায়। টুকটুকির পর একে একে প্রবেশ করে হালুম, ইকরিও। সবাই টিভিতে দেখা টুকটুকিকে বাস্তবে একটু ছুঁয়ে দেয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়।

বাহারি বইয়ে আগ্রহের পাশাপাশি শিশু চত্বরে সিসিমপুরের আয়োজন নিয়ে শিশুদের ছিল বাড়তি উন্মাদনা। হালুম, টুকটুকি ও ইকরিদের বিনোদনে শিশুরা যেন হারিয়ে যায় ভিন্ন এক জগতে। সিসিমপুরের বিনোদনে বাবা-মায়ের কাছ থেকে বই কেনার কথা একবারো ভোলেনি তারা। মেলায় আসা সব ক্ষুদে পাঠকদের কাছেই ছিল রঙিন মলাটে আবদ্ধ ডাইনোসর, রূপকথার পরী, ভূতের গল্পের বই।

বিক্রেতারা জানান, মেলায় শিশুরা এলেই বই না কিনে ফেরে না। প্রথম থেকে গ্রন্থমেলায় শিশুদের বইয়ের বিক্রি ভালো। নলেজ প্রকাশনীর কর্ণধার মোস্তফা জালাল বাদল বলেন, বইয়ের বিক্রিও ছিল তুলনামূলক ভালো। বিশেষ করে, কমিক্সের বইগুলোর বিক্রি বেশি।

ছুটির দিন বলে সন্ধ্যার পর বই বিক্রিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রকাশকরা। শিশুতোষ বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন বিখ্যাত লেখকের অনুবাদ বইয়ের কাটতি ভালো বলে তারা জানান। অবসর প্রকাশনীর ম্যানেজার মাসুদ রানা বলেন, শিশুপ্রহর হওয়ায় সকাল থেকেই ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। শিশুরা তো এসেছিলই, বয়স্কদের পদচারণাও কম ছিল না। বিকেলের দিকে লোকসমাগম হওয়ায় বিক্রি খুব খারাপ হয়নি। ঐতিহ্য প্রকাশনীর ইনচার্জ আমজাদ হোসেন কাজল বলেন, মেলায় শিশুপ্রহর উপলক্ষে শিশুদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সের মানুষের ভিড় ছিল। বিকেলেও অনেক শিশু মা-বাবার সঙ্গে মেলায় এসেছিল।

মিরপুর মনিপুর স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী জান্নাত মা রত্নাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে মেলায়। গতবারও মায়ের সঙ্গে মেলায় এসেছিল সে। জান্নাত তার প্রতিক্রিয়ায় বলে, বই কিনব। গল্পের বই, কবিতার বই, ভূতের বই। গতবারও অনেক বই কিনেছিলাম। অনেক মজা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে গ্রন্থমেলার সদস্য সচিব জালাল আহমেদ জানান, শিশুদের সাহিত্যে-সংস্কৃতিতে অনুপ্রাণিত করার জন্যই এবারে প্রতি ছুটির দিন শিশু প্রহর ঘোষণা করা হয়েছে। শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য থাকছে বিভিন্ন আয়োজনও। শিশুরা অভিভাবকদের সঙ্গে এসে যাতে করে প্রাণ খুলে মেলায় ঘুরতে পারে, এ জন্য এ দিন বেলা ১১টা থেকে মেলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

নতুন বই: গতকাল নতুন বই এসেছে ২২৫টি। এর মধ্যে সময় প্রকাশন এনেছে হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ‘আমি জেনারেল’, দন্তস্য রওশনের ‘উড়ে গেল গাছটা’, ফরিদ আহমেদের ‘হুমায়ূন আহমেদের উত্তরাধিকারী নির্ধারণ’, শ্রাবণ এনেছে তৌফিক ই এলাহী চৌধুরীর ‘চ্যারিয়ট অব লাইফ’, বিদ্যা প্রকাশ এনেছে মোহিত কামালের ‘বাংলাদেশের তরুণদের ৩০ গল্প’, কথা প্রকাশ এনেছে সুমন্ত আসলামের ‘অদৃশ্য আতঙ্ক’, ইকবাল খন্দকারের ‘রহস্যময় গুহা’, ঐতিহ্য এনেছে জাভেদ হোসেনের ‘মীর তকি মীর গজল থেকে’, জীবনানন্দ দাশের ‘কল্যাণী’, অনিন্দ্য এনেছে মোশতাক আহমেদের ‘ছায়াস্বর্গ’, বাংলা একাডেমি এনেছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘শওকত ওসমান জš§ শতবর্ষ স্মারকগ্রন্থ’, নবযুগ এনেছে নরেশ ভূঁইয়ার ‘দীপার সারাবেলা’, বিদ্যা প্রকাশ এনেছে ফখরে আলমের ‘দুই বাংলার পুতুল’, অনন্যা এনেছে মুনতাসীর মামুনের ‘উনিশ শতকে বাংলা সংবাদ সাময়িক পত্র’, ফরিদুর রেজা সাগরের ‘সিঙ্গাপুরের ডালপুরী ও ছয় ফিলিপ’, ইমদাদুল হক মিলনের ‘একটি রহস্য উপন্যাস’।

মূলমঞ্চের আয়োজন: গতকাল সকালে ছিল একুশে উদযাপন হিসেবে শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতা। বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় ‘রবি গুহ: মুনীর চৌধুরী: সরদার ফজলুল করিম’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। যাতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন মফিদুল হক ও এমএম আকাশ। আলোচনায় অংশ নেন বেগম আকতার কামাল, অজয় দাশগুপ্ত, পিয়াস মজিদ ও অলকানন্দা গুহ। সভাপতিত্ব করেন সন্্জীদা খাতুন। সন্ধ্যায় ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতা: অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতা। অনুষ্ঠানে বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চন্দনা মজুমদার, ইয়াকুব আলী খান এবং সাগরিকা জামালী। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দী। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান।

এ ছাড়া বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শিশু-কিশোর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার প্রাথমিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আনজুমান আরা, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সেলিম এবং মোবারক হোসেন।

আজকের আয়োজন: আজ রোববার অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১০ম দিন মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা। বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে রুশ বিপ্লবের শতবার্ষিকী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন হাসান আজিজুল হক। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন ডা. সারওয়ার আলী, সৈয়দ আজিজুল হক এবং ইমতিয়ার শামীম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন পবিত্র সরকার। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

মানবকণ্ঠ/এসএস