শিশু নির্যাতন বাড়ছে

কার না আছে মৃত্যু ভয়! সবাই বাঁচতে চায়। এরপরও মানুষ মারা যায়। কারণ জন্মিলে মৃত্যু অনিবার্য এটাই চিরন্তন সত্য। কিন্তু যে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার মৌলিক অধিকার কিন্তু সে মৌলিক অধিকার চলার পথে, কর্মক্ষেত্রে কোথাও নিশ্চিত নয়। সড়ক দুর্ঘটনা, নৌ-দুর্ঘটনা, সন্ত্রাসীদের হাতে মৃত্যু, বিনা বিচারে মৃত্যু, এমনকি গৃহকর্তার হাতে কতজনকেই না জীবন দিতে হচ্ছে। ১২ বছরের শিশু গৃহকর্মী জাহিদুল ইসলাম শাওন। বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার উত্তর সাহেবগ্রামে। সে ফরিদগঞ্জের বদরপুর আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র। বাবার অভাবী সংসার। পড়াশোনার খরচ চালানোর সক্ষমতা এবং তিন বেলা ঠিকমতো খাবার সংস্থানও ছিল না শাওনের।

একই এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন। ভালোভাবে খাওয়া দাওয়ার নিশ্চয়তা এবং পড়াশোনার কথা বলে জাহাঙ্গীর শাওনকে ঢাকায় এনে ইস্কাটন গার্ডেনের ১২/এ নম্বর বাড়ির এগারো তলার এক গৃহকর্তার বাসায় রাখেন। পড়াশোনা তো দূরের কথা প্রায় ১ মাস ধরে শাওনের ওপর চলত অমানসিক শারীরিক নির্যাতন। গৃহকর্ত্রী তামান্না, তামান্নার ভাই প্রায়ই নানা অজুহাতে ছেলেটিকে নির্যাতন করত। বাড়ি তো নয় এ যেন কোনো নির্যাতন সেল! কখনো টাকা চুরির অভিযোগ, আবার স্যুটকেসের চাবি চুরির অভিযোগে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি ইলেকট্রিক শকও দেয়া হতো। মৃত্যুভয় তাড়িয়ে বেড়ায় শাওনকে। বাড়িতে বাবার নিকট খবর দেয়ারও কোনো সুযোগ নেই।

অগত্যা অমানসিক নির্যাতন সহ্য করেই ওকে কাজ করতে হতো। একদিন আড়াই লাখ টাকা চুরির অভিযোগে শিশুটিকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। হুমকি ধমকি দিয়ে বলা হয়, গ্রাম থেকে শাওনের বাবাকে ধরে এনে পুলিশে ধরিয়ে দেবে। দুঃসহ এক যন্ত্রণায় কাতর শিশু শাওন বাড়িতে মোবাইল ফোনে কথা বললে সামনে ছুরি নিয়ে গৃহকর্তা ও ছোট ভাই তানজিল বসে থাকত। হুমকি দেয়া হতো, নির্যাতনের কথা বললে জবাই করা হবে। উপায় কি? শেষ পর্যন্ত শাওন সিদ্ধান্ত নিল সে যে কোনো মূল্যেই হোক এই বাসা থেকে পালাবেই। রাতে খাবারও দেয়া হয়নি।

নির্যাতন করে মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত নেয় ১১ তলা এ্যাপার্টমেন্টের পাইপ বেয়ে নিচে নেমে আসবে। কি ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত! এটা কি কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে করা সম্ভব? শুধু প্রাণ বাঁচাতেই গত ২০ জুন দিবাগত রাতে শিশু শাওন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাইপ বেয়ে নিচে নেমে আসে। নিচে নামার সময় বড় কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে শাওনের মৃত্যুও হতে পারত। কিন্তু সে ধরনের কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলেও শাওন নিচে নেমে এসেও শেষ রক্ষা করতে পারেনি। ধরা পড়ে যায়। আবার নতুন করে শুরু হয় শারীরিক নির্যাতন। কোনো সহƒদয় ব্যক্তির নজরে ঘটনাটি এলে উনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশের সহায়তা কামনা করেন।

তৎক্ষণিক রমনা থানার পুলিশ এগিয়ে আসে। তারা অভিযান চালিয়ে ওই বাসার গার্ডরুম থেকে শাওনকে বন্দি অবস্থায় উদ্ধার করে। ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসার জন্য পাঠায়। অবশ্য পুলিশ বাদী হয়েই থানায় মামলা করেছে। শেষ পর্যন্ত সাক্ষী ও থানার চূড়ান্ত প্রতিবেদন ঠিকঠাকমতো দিলে হয়তো অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হবে। শঙ্কার জায়গাটি হচ্ছে, বিচারক উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণ ব্যতীত কোনো অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে পারেন না। আর আমাদের দেশে আইন আছে ঠিকই কিন্তু প্রকৃত অর্থে পুলিশ ও সাক্ষীরা নানাভাবে প্রভাবিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। এ ঘটনায় এমন কিছু ঘটুক, তা আমরা প্রত্যাশা করি না।

যে বয়সে শিশুদের শিক্ষা গ্রহণ করার কথা, সে বয়সে এ দেশের শিশুরা পেটের দায়ে বাসাবাড়িতে কিম্বা বাস, টেম্পো, ফ্যাক্টরিতে ঝুঁকির কাজ করতে বাধ্য হয়। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ এ দেশের শিশুদের মধ্যে একটি বড় অংশ শিক্ষার আলো নিতে পারে না। যদিও সরকার সবার শিক্ষার সুযোগকে নিশ্চিত করতে বিনা বেতনে পড়াশোনা, বিনামূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহ, এমনকি শিশুদের জন্য ফিডিং প্রজেক্ট চালু করেও শতভাগ শিশুর লেখাপড়া নিশ্চিত করতে পারছে না। সংসারের বাস্তব অবস্থার কারণেই অনেকে শিশুর ইচ্ছা থাকলেও পড়াশোনার সুযোগ পায় না। ফলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ক্রমান্বয়েই বাড়ছে।

অথচ সমৃদ্ধ জাতি গঠন করতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। সবার জন্য শিক্ষা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে দেশের অর্থনীতিতে যে বৈষম্য দিনে দিনে প্রকট হচ্ছে, তা রোধ করতে হবে। শুধু প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করলেই হবে না, শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এখন শিক্ষার বাণিজ্যিকরণ এমনভাবে হয়েছে, যেখানে অর্থ ব্যতীত শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব নয়। নার্সারি থেকে শুরু করে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ভর্তি কোচিং এবং ভালো ফলের আশায় কোচিং করা নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফলে শিক্ষা ব্যয় বেড়েছে, যা দেশের অধিকাংশ পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব হয় না। মূলত এসব কারণেই নিম্নবিত্ত, শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে সন্তানদের শিক্ষা দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ শিক্ষিত জাতি গঠনের কোনো বিকল্প নেই।

যদিও আমরা সভ্যযুগে বসবাস করছি, কিন্তু এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা দেখলে মনে হয়, সভ্যতার লেশমাত্র আমাদের সমাজে নেই! মনে হয় এটা বর্বর যুগের আরেক প্রতিচ্ছবি। দিনে দিনে সামাজিক অবক্ষয় চরম আকার ধারণ করেছে। পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, শিশু অপহরণ, গুম, খুন ও নির্যাতনের মতো ঘটনা একটি সুস্থ সমাজ গঠনে বড় অন্তরায়। প্রকৃত অর্থে একটি সুখী সমৃদ্ধশালী সুস্থ রাষ্ট্র কাঠামোর জন্য ন্যায়বিচারের কোনো বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক সময়ে অমানবিক শিশু নির্যাতনের ঘটনা যেভাবে বাড়ছে, তাতে এটাই স্পষ্ট, বিকৃত মানসিকতাসম্পন্ন কিছু মানুষ নিজেদের দাম্ভিকতাকে প্রমাণ করতেই বর্বরতামূলক আচরণ চালিয়ে যাচ্ছে। যাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক চেতনা বলতে কিছুই নেই। আছে শুধু বর্বরতা। যারা যেনতেনভাবে অবৈধ অর্থের পাহাড় গড়তে এমন কোনো হীন কাজ নেই, যা করতে সামান্য কুণ্ঠাবোধ করে। এদের আবার অনেকেই টাকার জোরে জনগণের নেতা সেজে জনস্বার্থ পরিপন্থী কাজ দেদার চালায়।

কিন্তু তাদের আইনের আওতায় আনাও কঠিন। কারণ অপকর্ম করে ঠিকই, কিন্তু থেকে যায় ধরাছোঁয়ার আড়ালে। আমাদের সমাজে এ ধরনের অধপতিত লোকরাই সব ধরনের কর্তৃত্বের অধিকারী। ফলে শাওন, রাজনদের মতো নিরীহ নিরপরাধ কিশোরদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এমনকি অনেককে জীবন পর্যন্ত দিতে হয়। কখন কবে কিভাবে এসব অমানুষদের রাহুগ্রাস থেকে এ দেশের সাধারণ মানুষ মুক্ত হবে, তা বলাও কঠিন। তবে, এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়, অবশ্যই দেশের মানুষ একদিন ঐক্যবদ্ধভাবে মানুষরূপী জানোয়ারগুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। সেদিন খুব দূরে নয়।
– লেখক : কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এফএইচ

Leave a Reply

Your email address will not be published.