গণধর্ষণের পর নদীতে শিশু : ৫ লাখ টাকায় ওসির রফা!


বাবা মারা যাওয়ার পর জীবিকার টানে মা চলে গেছেন প্রবাসে। মেয়েটি থাকে মামার বাড়িতে। লেখাপড়া করে স্থানীয় একটি মাদরাসায় ৪র্থ শ্রেণিতে। গত রোববার সন্ধ্যায় বাড়ির পার্শ্ববর্তী বাজারে কসমেটিক্স কিনতে যায় সে। বাড়ি ফেরার পথে এলাকার তিন যুবক তাকে অপহরণ করে নৌকা দিয়ে নিয়ে যায় মেঘনা নদীর মাঝ খানে। নৌকায় মেয়েটিকে গণধর্ষণ করে তারা। গণধর্ষণ করেও ক্লান্ত হয়নি । বিবস্ত্র অবস্থায় ফেলে দেয় নদীতে। সাতার কেটে তীরে উঠে প্রাণ বাঁচায় মেয়েটি।

ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে মরিয়া হয়ে উঠেন স্থানীয় ইউপি সদস্য মোস্তফা। গ্রাম্য সালিশে ৪ লাখ টাকায় ক্ষতিপূরণ দিয়ে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কথামতো টাকা দেয়নি ধর্ষকরা। স্বজনরা বিচারের জন্য যান থানার ওসির কাছে । কিন্তু ওসি অইনি ব্যবস্থা নেয়াতো দূরের কথা মেয়েটির ইজ্জতের মূল্য ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করে সমঝোতা করে দেন। আর এ টাকার মধ্যে মেয়েটির পরিবার পেয়েছে আড়াই লাখ টাকা আর বাকি টাকা ভাগভাটোয়ারা হয়েছে পুলিশের মাঝে।

এদিকে পুলিশের সহায়তায় ধর্ষণের ঘটনা ধামা চাপা দেয়ার খবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে ঝড় উঠেছে সমালোচনার। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি ঘটেছে নরসিংদী সদর উপজেলার নজরপুর ইউনিয়নের চম্পকনগর গ্রামে। ধর্ষিতা মেয়েটি স্থানীয় আলিয়া মাদরাসার ৪র্থ শ্রেণির ছাত্রী।

সরেজমিনে চম্পকনগর গিয়ে নির্যাতিত ছাত্রীর পরিবার ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাবা মৃত্যুর পর ওই মাদরাসাছাত্রী চম্পকনগরের মামার বাড়িতে থেকে পড়াশুনা করত। গত রোববার সন্ধ্যায় সে পার্শ্ববর্তী বাজারে কসমেটিক্স কিনতে যায়। সেখান থেকে বাড়ি ফেরার পথে সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে একই গ্রামের সাদ্দাম মিয়া (২৫), সজিব (২২) ও ফরহাদ (২৩) মেয়েটিকে অপহরণ করে নৌকায় দিয়ে মেঘনা নদীর মাঝ খানে নিয়ে যায়। সেখানে তারা পালাক্রমে ওই মাদরাসাছাত্রীকে গণধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর আসামিরা তাকে বিবস্ত্র অবস্থায় নদীতে ফেলে দেয়। সাতার কেটে তীরে উঠে কালাই গোবিন্দ্রপুরের ইমানের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেয় মেয়েটি। খবর পেয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য মোস্তফা ও স্বজনরা গিয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করেন।

এদিকে ধর্ষকরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় পরই ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে উঠেপড়ে লাগেন স্থানীয় ইউপি সদস্য মোস্তফা। তিনি সাবেক ইউপি সদস্য কামাল মেম্বার, আলি নূর ও ফজলুকে নিয়ে নির্যাতিত মেয়েটির পরিবার ও ধর্ষকদের মধ্যে সালিশের মাধ্যমে ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার উদ্যোগ নেয়। এরই প্রেক্ষিতে আয়োজিত গ্রাম্য সালিশে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণিত হওয়ায় প্রত্যেককে দেড় লাখ টাকা করে মোট সাড়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানা ধার্য করেন। একই সঙ্গে এই ঘটনায় কোন মামলা না করার জন্য নির্যাতিত স্কুলছাত্রীর পরিবারকে নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু কথামতো জরিমানার টাকা না দেয়ায় বুধবার সকালে নরসিংদী সদর থানা পুলিশের ধারস্থ্য হয় নির্যাতিত মাদরাসা ছাত্রীর পরিবার। কিন্তু বিধিবাম পুলিশও অভিযোগ মামলা হিসেবে নথিভুক্ত না করে উল্টো ৫ লাখ টাকায় ঘটনাটি সমঝোতা করে দেন।

পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সদর মডেল থানার ওসি সৈয়দুজ্জামান ৫ লাখ টাকায় গণধর্ষণের ঘটনাটি সমঝোতা করেন। এর মধ্যে নির্যাতিত ছাত্রীর পরিবারকে দেয়া হয়েছে আড়াই লাখ টাকা। আর বাকি টাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সার্কেল) শাহারিয়ার আলম ও থানা পুলিশের মধ্যে ভাগভাটোয়ারা হয়।

ইউপি সদস্য মোস্তফা বলেন, মেয়েটি আমাদেরকে জানিয়েছে, একে একে ৩ জন তাকে ধর্ষণ করেছে। এরই প্রেক্ষিতে আমরা অভিযুক্ত ৩ জনকে দেড় লাখ টাকা করে জরিমানা করেছিলাম। কিন্তু তারা জরিমানার টাকা না দেয়ায় মেয়েটির পরিবার থানায় যায়। সেখানে ওসি সাহেব বিষয়টি সমাধান করে দিয়েছেন। তাই থানায় কোন মামলা হয়নি।

নরসিংদী সদর মডেল থানার ওসি সৈয়দুজ্জামান বলেন, ঘটনাটি স্থানীয় ভাবে সমঝোতার চেষ্টা করা হয়েছে সত্য কিন্তু পুলিশ সমঝোতা করেছে এটা সত্য নয়। আমরা নির্যাতিতার পরিবারকে বুঝিয়ে অভিযোগ নিতে বিলম্ব হয়েছে। এখন মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করেছি। তাছাড়া বিষয়টি ওসি (তদন্ত) সালাউদ্দিন তদন্ত করেছেন। তিনি এই ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। টাকা নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, টাকা নিলে মামলা নিলাম কি ভাবে?

পুলিশ সুপার সাইফুল্লাহ আল মামুন বলেন, ধর্ষণের ঘটনা কেউ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সে যদি পুলিশও হয় তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মানবকণ্ঠ/এসএ/এফএইচ