শিশুরা তোতা পাখি নয়

কাজী এমজি কিবরিয়া:
শিশুরা শিশুসুলভ আচরণে বিকশিত জীবনের আলোর সন্ধ্যান খুঁজে নেয়। আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। তারা যেভাবে বেড়ে উঠবে আপন ভূবনে নিজের মতো স্বাচ্ছন্দময় আনন্দে সেভাবে বড় হতে শিখবে। মা-বাবার ও পরিবেশের কাছে যে শিক্ষা পায় শিশু সে শিক্ষা গ্রহণ করে। জ্ঞান বিকাশের হাতিয়ার পাঠশালা। সেটা স্কুল হোক, নিজের ঘরে হোক সব পরিবেশে যে শিক্ষা অর্জিত হয় তাই শিক্ষা। পাঠশালা আমাকে পথ দেখায় আলোর পথ, নিজেকে ভেঙে মানুষরূপে তৈরি করার পথ। অজানা বিষয়কে ভালো করে জানবার পথ। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা তাই বলে। আজকের শিশু পাঠশালায় কি শিক্ষা নিচ্ছে তা দেখতে পারছি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্কুলে ভর্তির প্রতিযোগিতা। প্রি প্লে, প্লে থেকে শুরু হয় জ্ঞান দানের নামে মেধা মনন ধ্বংসের যাত্রাবেলা। কত বছর বয়সে সে স্কুলে ভর্তি হবে, স্কুলে ভর্তি হলে নিয়ম কি হবে, স্কুলের অবয়ব কিরকম হবে, কে পড়াবে, কি পড়াবে, কারা পড়বে, জেন্ডার ভেদাভেদ হবে নাকি সহ শিক্ষা হবে, স্কুলে ঘুম ভাঙার আগে যাবে নাকি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ হবে, সবার নিয়ম এক রকম হবে নাকি গরিবের বাচ্চার আরেক নিয়ম হবে, বেতন কত হবে, বেতনের বাইরে অন্য বেতন রবে নাকি ডোনেশনের ফাঁদে ফেইম অ্যান্ড নেইমের ফাঁদে বাচ্চার অভিভাবকের টেনশন বাড়বে এসব প্রশ্ন ভাবিয়ে তোলে। আমরা কোন পথে বাচ্চাকে বড় করব, কার সঙ্গে বাচ্চাকে পড়াব, কোন পরিবেশে মানুষ করব এসব নিয়ে সবার মাথাব্যথা। কেউ বলে কেউ বলে না। সিলেবাসে অনেক পড়া। ক্লাস ওয়ান থেকে যুদ্ধ শুরু। স্কুলে বিভিন্ন কারণে যথাযথ নিয়মে ক্লাস হয় না। কিন্তু সিলেবাসের পড়া শেষ করতে হবে তাই রীতিমতো সংগ্রাম। বাচ্চাদের সঙ্গে মনোবিকাশ করব না জ্ঞান বিকাশের নামে দানবের শিক্ষা দেব। সারাদেশে স্কুলের দোকান। পান-বিড়ির দোকানের মতো। কোথায় মাঠ, কী পড়ায় দেখভালের কেউ নাই। শুধু সেমিনার বৃত্তি পরিবর্তন। স্কুলে বের হয় ৬টায় বা ৭টায়। ২-৩টা পর্যন্ত ক্লাস শেষ করার পর আবার শুরু হয় কোচিং প্রতিযোগিতা। বাসা থেকে দূরে স্যারের বাসা। যেতে হবে মাকে বা বাবাকে বা অন্য কেউ। ৫-৬টা পর্যন্ত পড়া আর পড়া।
খেলা কোথায় বিনোদন কোথায় দৌড়াদৌড়িতে পুরা টায়ার্ড। পরিবার যেন যান্ত্রিক। সকাল থেকে আনা-নেয়ার গাড়ি ভাড়ায় বেতন প্রায় শেষ।
খাবে কি বা মন স্থিরের সুযোগ কোথায়। ৫ম শ্রেণিতে উঠতেই পিএসসি পরীক্ষা। জীবনের শুরুটা পরীক্ষায় ঘেরা। পড়তে পড়তে নাভিঃশ্বাস। হায়রে হাসবার সময়ও নাই। পারিবারিক বন্ধনে ভাটা পড়ে রোবটিক জীবন গড়ার জন্য নিস্তার নাই। স্কুলে ক্লাসের পড়া আদায় করলে বা ভালো করে বুঝিয়ে পড়ালে আবার একই পড়া কোচিংএ হবে কেন? স্যারেরা উৎসাহিত করে। গাঁদা গাঁদা নোট দিয়ে দার্শনিক বানিয়ে ছাড়ে! হায়রে শিক্ষা। কোন শিক্ষায় বড় হবে বাচ্চারা এখনো ফ্রেমে আনতে পারেনি। রিহার্সেলে আমার শিশু ল্যাবের অপারেশন টেবিলে। এভাবে জেএসসি তারপর আবার পরীক্ষা। সৃজনশীলতা যার নেই সে পড়ায় সৃজনশীল ক্লাস। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের সময় পায় না সৃজনশীলতা মন থেকে তৈরি হবে কিভাবে? একটা বাচ্চা দুনিয়ার আলো দেখার সময় নাই, তার মধ্যে মননশীলতা জাগ্রত হবে? তাইতো আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা সমাজহীতকর কাজে জড়িত। টিনএজ থেকে শুরু করে সবার মাঝে উচ্ছৃঙ্খলতার আলকাতরা গায়ে মেখে সমাজকে অন্ধকারে নিয়ে যাচ্ছে নেশার রাজ্যে। জীবনকে নেশা ভেবে বুঁদ করে আছে মেধা। কেউ কারো কথা শুনছে না। আজকের শিশুকে বাঁচাতে পারলে কাল দেশ বাঁচবে। শিশু ও দেশ একই সূত্রে গাঁথা।
লেখক: মানবকণ্ঠের পাঠক