শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত চা শ্রমিকের সন্তানরা

শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত চা শ্রমিকের সন্তানরা

শ্রম আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের কোনো চা-বাগানে ২৫ জন শিক্ষার্থী থাকলেই সেই বাগান কর্তৃপক্ষকে সেখানে স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু কে মানে এ নিয়ম? মৌলভীবাজারের ৯২টি চা বাগানের অনেক বাগানেই নেই স্কুল। আর সরকারিভাবে এসব চা-বাগানগুলোতে স্কুল তৈরি করা হলেও জনসংখ্যার অনুপাতে তা অপর্যাপ্ত। আর স্কুলগুলোর শিক্ষার মান নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। মাত্র দু’একজন শিক্ষক দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে স্কুলগুলো। অনেক স্কুলে আবার চা শ্রমিকদের দিয়েই শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানো হচ্ছে। আর এ বিষয়গুলো যথাযথভাবে মনিটর না করায় চা শ্রমিকের সন্তানরা তাদের মৌলিক অধিকার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এদিকে সরকার বিভিন্ন বাগানে নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা ও বিনামূল্যে বই দিলেও লেখাপড়ার অন্যান্য খরচ জোগাতে না পেরে অনেক শিক্ষার্থী লেখাপড়া ছেড়ে দিচ্ছে। চা শ্রমিকদের লেখাপড়ার উন্নয়ন নিয়ে বাগান মালিকরা বেশ উদাসীন। অনেক বাগান মালিকরা চিন্তা করেন শ্রমিক যদি লেখাপড়া করে শিক্ষিত হয়ে যায় তাহলে আর বাগানে কাজ করবে না- এমনটাই জানালেন অনেক চা শ্রমিক।

মৌলভীবাজারের চা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চা বাগান অঞ্চলে শিক্ষার হার খুবই কম। যে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার কথা তারা কাজ করে চা বাগানে। মৌলভীবাজারের ৯২টি চা বাগানের মধ্যে কোনো চা বাগানে নেই কলেজ, হাইস্কুল রয়েছে মাত্র দুটি আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে হাতেগোনা কয়েকটি। একদিকে যেমন ৫-৬ কিলোমিটার হেঁটে ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে যেতে হয় অন্যদিকে শারীরিক অবয়ব ও ভাষাগত সমস্যার কারণে তারা মূল ধারার ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা বিভিন্ন ধরনের লাঞ্ছনার শিকার হয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার আগেই অনেক শিশু ঝরে পড়ে। ফলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই কিশোর বয়সেই অনেকে চা শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করে।

কুলাউড়ার ওয়াজেদ নগর চা বাগানের উত্তম গোয়াল বলেন, ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছি। কিন্তু লেখাপড়া করার ইচ্ছে থাকলেও লেখাপড়া করতে পারিনি। লেখাপড়া করব টাকা কই? বাবা যে মজুরি পান তা দিয়ে খরচই চলে না। তাই বাধ্য হয়ে লেখাপড়া ছেড়ে এখন কাজ করি।

মুরইছড়া চা বাগানের সত্যজিৎ উড়াং বলেন, লেখাপড়া করার অনেক ইচ্ছে ছিল কিন্তু আমরা যে শিকলে বন্দি। ইচ্ছে থাকলেও লেখাপড়া করতে পারি না। লেখাপড়া থেকে ইতি টানার পেছনে মূল কারণ হলো অর্থনৈতিক সংকট। বাবা-মা বাগানে যে মজুরি পেতেন তা দিয়ে খরচ চলত না, লেখাপড়া করব কীভাবে। তাই লেখাপড়া ছেড়ে বাগানে শ্রমিক হিসেবেই কাজ করতে হচ্ছে।

কুলাউড়া লংলা চা বাগানের হীরা লাল বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরুতে পারিনি। পরিবারের অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে লেখাপড়া ছেড়ে কাজের পেছনে ছুটে যেতে হয়। কুলাউড়া শহরে একটি বাসায় ২ হাজার টাকা বেতনে কাজ করি। এই টাকা দিয়ে চেষ্টা করি পরিবারে কিছু সহযোগিতা করার।

তবে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন কেন্দ্রের নেতারা বলেন, আগের তুলনায় চা শ্রমিক ও তাদের সন্তানদের মধ্যে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও এখনো অনেকেই যাতায়াত ও আর্থিক সমস্যার কারণে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না। বাড়ি থেকে স্কুল দূরে হওয়ায় এই শিক্ষার্থীদের অনেকে স্কুলে যায় না।

রাঙ্গীছড়া চা বাগানের মিঠুন, কালিটি চা বাগানের বলরাম বলেন, অনেক কষ্ট করে ডিগ্রি পাস করেছি। এখন চাই ভালো একটি চাকরি করে জীবনকে পরিবর্তন করব। জানি না সে আশা সফল হবে কিনা।

কুলাউড়ার চাতলাপুর চা বাগানের ছেলে মিন্টু দোশোয়ারা। জীবনে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে জয়ী হয়েছেন জীবনযুদ্ধে। উচ্চশিক্ষা নিয়ে কাজ করছেন গণমাধ্যমে। ডেইলি স্টারের মৌলভীবাজার প্রতিনিধি তিনি। পাশাপাশি চা শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নে দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম করছেন। মিন্টু দেশোয়ারা মানবকণ্ঠকে বলেন, আর্থিক অনটনই চা শ্রমিক সন্তানদের শিক্ষা অর্জনে বড় বাধা। মূলত এ কারণেই প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, সরকার বই দিলেও খাতা-কলম ও পোশাক কেনার সামর্থ্য অনেক চা শ্রমিকের নেই। তাই লেখাপড়া বন্ধ করে হাজার বছরের পুরনো পেশা শ্রমিক হিসেবেই তাদের কাজ করতে হয়।

চা বাগানের অনেক অভিভাবকও এখন সচেতন হয়েছেন, তারা চান না তাদের ছেলে কিংবা মেয়ে তাদের মতো চা শ্রমিক হয়ে জীবিকা নির্বাহ করুক। রাঙ্গীছড়া চা বাগানের প্রকাশ বলেন, ‘আমরা চা শ্রমিক হিসেবে যে জীবন কাটাচ্ছি তা অত্যন্ত অমানবিক। বাবা হিসেবে আমি চাই না আমার সন্তানও আমার মতো কষ্ট করে বেঁচে থাকুক। এ জন্য অনেক কষ্ট করে ছেলেকে পড়ালেখা শেখাচ্ছি। আমি চাই আমার ছেলে লেখাপড়া করে বাঁচার মতো বেঁচে থাকুক।

কর্মধা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল মালিক বলেন, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে চা শ্রমিকদের সন্তানরা। তারা কিশোর বয়সেই কর্মসংস্থানের প্রতি বেশি ঝুঁকছে। দোকানে দোকানে পার্টটাইম কাজ করছে এরা। এদের সামান্য মাসিক উপার্জনকে তাদের বাবা-মা বেশি গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষাজীবনের প্রতি অনীহা গড়ে তুলছেন।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রাম ভজন কৈরী বলেন, নানা সংকটের কারণে অনেক চা শ্রমিকের সন্তানরা লেখাপড়া করতে পারছে না। আমরা চেষ্টা করছি সন্তানদের লেখাপড়া নিশ্চিত করতে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারও চা শ্রমিকদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে আন্তরিক।

তিনি আরো বলেন, যদি কোনো বাগানের দেড় কিলোমিটারের মধ্যে সরকারি স্কুল থাকে, তবে বাগান কর্তৃপক্ষ সেখানে স্কুল না দিলেও সমস্যা নেই। আর এ সুযোগে অনেক মালিক স্কুল তৈরির ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। যেসব চা বাগানে স্কুল নেই সেসব বাগান মালিককে বাধ্য করে স্কুল প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আগামীকাল শেষ পর্ব: নিজের ভাষাটাও ভুলে গেছেন চা শ্রমিকরা

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.