শিক্ষার্থীদের মারবেন না প্লিজ

৯০ দশকের আগে আমরা দেখেছি স্বৈরতান্ত্রিক গণতন্ত্র; আর ৯০ দশকের পর থেকে দেখছি গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র! এভাবেই আমরা কখনো মর্মাহত হয়েছি; আবার কখনো আশাবাদী হয়েছি। তবে ক্ষণে ক্ষণে আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আশাবাদী হয়েছি। ১/১১ এর পরে আমরা সকল অরাজনৈতিক জনগণ এই ভেবে আশাবাদী হয়েছিলাম যে, আমাদের দেশের রাজনীতির হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালা-তুল্য দুই বড় রাজনৈতিক দল এবার রাজনীতির মহাসড়কের গতিরোধকের সামনে পড়ে নিজেদের ভাল-মন্দগুলো ভালভাবে বুঝতে পারবে এবং নিজেদেরকে পরিবর্তন করবে।

কিন্তু তা হলো না! আমরা আবার মর্মাহত হলাম। এভাবেই চলছে; তবুও চলুক! তবুও আমরা অরাজনৈতিক সাধারণ জনগণ কিছুই বলিনি; বলতেও চাই না যেন! আমরা বারবার দেখেছি- আমাদের রাজনৈতিক জনগণ সবসময় তাদের নিজেদের কথা বলে, তাদের স্বার্থের কথা বলে, তাদের প্রতিপক্ষের মন্দ কাজের উদ্ধৃত করে নিজের মন্দ কাজের জাস্টিফাই করে। তারা কেউ অরাজনৈতিক সাধারণ জনগণের দুর্ভোগের কথা বলে না; তাদের পক্ষে কথা বলে না। তখন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল/জোটটি সাধারণ জনগণকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যস্ত থাকলেও, ক্ষমতাহীন রাজনৈতিক দল/জোটটি মুখে কুলুপ এঁটে রাখে; কারণ ভবিষ্যতে তারাও কোন একদিন ক্ষমতাসীন হতে পারে।

একটা পর্যায়ে আমরা দীর্ঘ মেয়াদের কথা ভেবে অনেক বেশি মর্মাহত হই; আমরা দেশের ভবিষ্যত নিয়ে স্বপ্ন দেখা ভুলে যেতে থাকি। এতদ্বস্বত্ত্বেও আমরা কারো উপর নির্ভর করছি না; আমরা ধৈর্য্য ধারণ করছি; আমরা বেঁচে থাকতে চাইছি; আমরা রিজিকের সন্ধানে ঘর থেকে বের হচ্ছি; আমরা থেমে থাকছি না। আমরা আমাদের পঞ্চম ইন্দ্রিয়কে নিষ্ক্রিয় করে অনুভূতিহীনভাবে জীবনযাপন করছি। তবুও আমরা কিছু বলছি না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ভাইবোনেরা চাকরির প্রতিযোগিতা করার সুযোগ চেয়ে নির্যাতিত হয়; তবুও আমরা কিছু বলিনি। সাধারণ জনগণের করের টাকায় পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও ঐ জনগণের সন্তানদেরকে খোটা শুনতে হয়; তবুও আমরা কিছু বলিনি।

হাতুড়ি দিয়ে জাতির মেরুদণ্ড ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে, লোহার পাইপ দিয়ে পা ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলা হয়েছে, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে; তবুও আমরা কিছু বলিনি। গত রোববার দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে কুর্মিটোলায় বাস চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী আব্দুল করিম রাজীব ও দিয়া খানম মিম নিহত হয়েছে; তবুও আমরা কিছু বলিনি। বাসের নিচে পিষ্ট হয়ে পড়ে থাকা দুই শিক্ষার্থীর স্কুল ইউনিফর্ম পরিহিত থেঁতলে যাওয়া লাশ দেখেছি; তবুও কিছু বলিনি। একই স্থানে নিজের সন্তানকে ভেবে আমাদের বুক ফেটে গেছে, নীরবে চোখের জল ফেলেছি, একটু আওয়াজও করিনি।

কিন্তু গত ৪ দিন ধরে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া আমাদের সন্তানেরা নির্যাতিত হচ্ছে; তবুও কি আমরা কিছু বলবো না? হুম; তবুও বলবো না। আমরা বিনীত অনুরোধ করছি- “স্কুল-কলেজ পড়ুয়া আমাদের সন্তানদের গায়ে হাত তুলবেন না; বল প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের যৌক্তিক দাবীকে দমন করবেন না।” এরা অত্যন্ত যৌক্তিক দাবী করছে; নিরাপদ সড়ক চাইছে, ঘর থেকে সড়কে বেরিয়ে নিরাপদে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা চাইছে, তাদের বন্ধু হত্যার বিচার চাইছে, তাদের ভাই/বোন হত্যার বিচার চাইছে। এরা অসতর্ক ড্রাইভিংকে না বলতে বলছে, ড্রাইভারকে সতর্ক করতে বলছে, সড়ক দুর্ঘটনার নামে গণহত্যা বন্ধ করতে বলছে।

এরা প্রতিপক্ষ দলের নয়, চাঁদাবাজ নয়, সন্ত্রাসী নয়, জঙ্গি নয়। এদের মাঝেই আছে আমাদের ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, সেনা প্রধান, পুলিশ প্রধান। আপনারা এদেরকে মারবেন না। আমাদের বর্তমান ভাল নয়; বর্তমানে আমাদের দেশে বিচারপতির বিচার হয়; তবুও আমরা ততটা মর্মাহত হইনি। আমরা মর্মাহত হই- সড়কে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে পুলিশের লাঠির নিচে পড়ে থাকতে দেখে কিংবা ছোট ছোট শিক্ষার্থীর ইউনিফর্মের কলার কিংবা গলায় পুলিশের হাত দেখে। এদেরকে মারবেন না; দয়া করে এদের কথা শুনুন। এদের কোন নেতা নেই; তাদেরকে কেউ উস্কানি দিচ্ছে না।

তাদের উস্কানি দেয়ার দরকার নেই। তারা অত্যন্ত মেধাবী; তারা ন্যূনতম ইতিহাস জানে। তারা প্লেকার্ডে বলছে ‘আন্দোলন করে আমরা দোষী হলে, দোষী প্রিয় বঙ্গবন্ধু, দোষী রফিক-জব্বার-সালাম-বরকত’; উল্টো পথে গাড়ি নিয়ে যাওয়া বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের গাড়ি থামিয়ে উনাকে বঙ্গবন্ধুর সময়ের ছাত্রনেতা ছিলেন স্মরণ করিয়ে স্লোগান দেয় ‘আইন সবার জন্য সমান’। তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে লাইসেন্স পরীক্ষা করে লাইসেন্সবিহীন বাসগুলোকে আটকে রেখেছে, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের একটি গাড়ির চালক লাইসেন্স দেখাতে না পারায় দীর্ঘ সময় তার গাড়ি আটকে রাখা হয়েছে, ছাত্রদের লাইসেন্স পরীক্ষায় আটকে গেলেন খোদ এক পুলিশ সদস্য, মাথায় হেলমেট না থাকায় এই পুলিশ সদস্য ছাত্রদের কৌতুকের শিকারও হয়েছেন।

এই ছাত্ররা নিজেরাই শাপলা চত্বরে আটকে যাওয়া একটি অ্যাম্বুলেন্সকে নিরাপদে ঝামেলাপূর্ণ স্থান ত্যাগ করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে; এই ছাত্ররাই ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের গাড়ির ভাঙ্গা গ্লাস ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে পথচারীদের চলাচলের উপযোগী করে দিয়েছে; এই ছাত্ররাই সারিবব্ধভাবে চলাচলের উপায় দেখিয়ে রিক্সার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে দিয়েছে। এদেরকে মারবেন না; দয়া করে এদের কথা শুনুন। এরাই আমাদের ভবিষ্যত; এরা স্বপ্নের মধ্য দিয়ে আলো দেখতে পায়।

‘বেপরোয়া ড্রাইভাররা উচ্চকণ্ঠে বলে দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে, ড্রাইভার-হেল্পার মিলে ছাত্রকে ধাক্কা দিয়ে খাদে ফেলা দিয়েছে, ড্রাইভার-হেল্পার মিলে আহত ছাত্রকে নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে, দোষী ড্রাইভার-হেল্পারের বিরূদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না, এমনকি প্রভাবশালী নেতা বেপরোয়া ড্রাইভার-হেল্পারের পক্ষে সাফাই গায়’- এইসব শুনেই স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে, তারা হয়েছে সহিংস। এদেরকে পরম মমতায় শান্তিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করুন।

শিক্ষক কর্তক শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলা তো দূরের কথা, চোখ রাঙানোও কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। তাহলে পুলিশ কিভাবে ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের উপর লাঠি বা হাত তুললো? দয়া করে এদেরকে মারবেন না। নির্বাহী আদেশ দিয়ে দেশের সব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে সাময়িকভাবে হয়তো সমাধান করা যাবে; কিন্তু সড়কে শিক্ষার্থী মৃত্যুর মিছিল কি দূর হবে, শিক্ষার্থীরা কি নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে? আমরা স্পষ্টতই দেখেছি- ‘ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে অনেক সভা-সেমিনার ও পরিকল্পনা হয়, আবার ক্ষমতাহীনদের ক্ষমতা লাভের আশায় অনেক জ্বালাও-পোড়াও হয়; কিন্তু আমাদের সন্তানদের জীবন নিরাপদ হয় না, আমরা নিরাপদ সড়ক পাই না, আমরা স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা পাই না।’

আমরা শুধু পাই আশ্বাস। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, আগামী সপ্তাহে প্রস্তাবিত সড়ক নিরাপত্তা আইন অনুমোদনে মন্ত্রিসভায় তোলা হবে এবং আগামী ২ মাসের মধ্যে আইনটি সংসদে পাস হবে। এইজন্য তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে সময় চেয়েছেন। একইভাবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। সব আশ্বাসই একদিন নি:শ্বাসের মত হাওয়ায় উড়ে যায়। তারপর আবার নতুন কোন ঘটনা, আবার নতুন নতুন আশ্বাস! এভাবেই চলছে, এভাবেই চলবে…।

লেখক: আয়কর উপদেষ্টা ও কলামিস্ট