শিক্ষার্থীদের গবেষণার ক্ষেত্র ধ্বংস করে শিক্ষকদের লন টেনিস কোর্ট!

শিক্ষার্থীদের গবেষণার ক্ষেত্র ধ্বংস করে শিক্ষকদের লন টেনিস কোর্ট!

প্রায় ৭০ বছর পূর্বে সরকারি বিএম কলেজের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য স্থাপিত নেট হাউজ ও মাঠ পরীক্ষণ কেন্দ্রের (বোটানিক্যাল গার্ডেন) গাছ কেটে নির্মিত হচ্ছে শিক্ষকদের খেলার জন্য লন টেনিস কোর্ট। এ কারণে সেখানকার বহু গাছ কাটা হয়েছে। এতে করে শিক্ষার্থীদের গবেষণা একেবারেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছে। এক বছর আগে একই স্থানে টেনিস কোর্ট নির্মাণ করতে গিয়ে প্রতিরোধের মুখে পড়ে তত্কালীন অধ্যক্ষ নির্মাণ কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হন।

বিএম কলেজের একাধিক সাবেক শিক্ষক জানান, নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা ১৯৫০ সালে বিএম কলেজের মৃত্তিকা ও উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য এ বোটানিক্যাল গার্ডেনটি করেছিলেন। তিনি তখন বিএম কলেজের শিক্ষক ছিলেন। নিজ হাতেই গার্ডেনে রোপণ করেছিলেন নাগলিঙ্গমসহ বিভিন্ন বিরল প্রজাতির গাছ ও অর্কিড। সেসব গাছের একটি তালিকা গার্ডেনের পাশে শোভা পেলেও পরিচর্যা ও সংরক্ষণের অভাবে একাধিক প্রজাতির বিরল গাছ এখন আর নেই। তবে ১৯৫০ সালের পর থেকেই বোটানিক্যাল গার্ডেনটি বিএম কলেজের মৃত্তিকা বিভাগের শিক্ষার্থীদের গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে।

বিএম কলেজের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, কলেজ ছুটি থাকার সুযোগ নিয়ে কর্তৃপক্ষ গবেষণার জন্য করা বোটানিক্যাল গার্ডেন হুমকির মুখে ফেলে এর ভেতরে টেনিস কোর্ট নির্মাণ শুরু করে। কোর্ট নির্মাণে ইতিপূর্বে বহু গাছ কাটা হয়েছে। যে অংশটি কোর্টের জন্য সিমেন্ট করা হয়েছে সেখানে আর গাছ লাগানোর সুযোগ নেই। তাছাড়া সেখানে টেনিস খেলা শুরু হলে কোর্ট সংলগ্ন যে গাছ রয়েছে তার বেশিরভাগ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। এ কারণে আমাদের গবেষণার ক্ষেত্রটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তাতে করে আমরা আমাদের বাস্তব জ্ঞান থেকে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা করছি। আমাদের গবেষণা যাতে বন্ধ হয়ে না যায় এ কারণে আমরা বাগান উচ্ছেদ করে টেনিস কোর্ট নির্মাণের কিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছি। শিক্ষার্থীরা আরো জানান, এক বছর আগে সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর ইমানুল হাকিম একই উদ্যোগ নিলে মৃত্তিকা ও উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে টেনিস কোর্ট নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।

গার্ডেনটি হুমকির মুখে ফেলে টেনিস কোর্ট নির্মাণ শুরু করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরাও। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) বরিশালের বিভাগীয় সমন্বয়ক কাজী এনায়েত হোসেন বলেন, বিএম কলেজের বোটানিক্যাল গার্ডেনটি মূল্যবান ঐতিহ্য। তার পাশে টেনিস কোর্ট করা হলে গার্ডেনের গাছগুলো সুরক্ষিত থাকবে না। শিক্ষার সঙ্গে সহায়ক পরিবেশ রাখতে হবে ক্যাম্পাসে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় আহ্বায়ক রফিকুল আলম বলেন, বিএম কলেজের অমূল্য সম্পদ বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশে টেনিস কোর্ট নির্মাণ করার কাজটি আত্মঘাতী। কলেজে অনেক জায়গা আছে। সেসব জায়গায় না করে কেন ওই গার্ডেনের পাশে টেনিস কোর্ট নির্মাণ করা হচ্ছে— তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের খোঁজ নেয়া উচিত।

মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞানী এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এসএম ইমামুল হক বলেন, কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের গবেষণার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করা উচিত নয়। টেনিস কোর্ট নির্মাণ করে শিক্ষার্থীদের গবেষণার কেন্দ্র্রটি কেন কলেজ কর্তৃপক্ষ হুকমির মুখে ফেলেছে তা বোধগম্য হচ্ছে না। দুর্লভ বৃক্ষসমৃদ্ধ বোটানিক্যাল গার্ডেনটির স্বার্থে ক্যাম্পাসের অন্য কোনো স্থানে টেনিস কোর্ট নির্মাণ করা উচিত।

বিএম কলেজের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মাহমুদুল ইসলাম ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, গার্ডেনের পাশে কেন টেনিস কোর্ট করা হচ্ছে তা কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবেন। উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম জানান, টেনিস কোর্ট করার জন্য নেট হাউজ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ওই নেট হাউজ কোথায় হবে, সেটা কেউ জানে না। কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. শফিকুর রহমান সিকদার দাবি করেন, টেনিস কোর্টটি নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে না। গার্ডেনের পাশে আগেই টেনিস কোর্ট ছিল। সেটি সংস্কার করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা না চাইলে অন্য ব্যবস্থা করা হবে।

উল্লেখ্য, ৮ জানুয়ারি মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য স্থাপিত নেট হাউজ ও মাঠ পরিক্ষণ কেন্দ্রে (বোটানিক্যাল গার্ডেন) লন টেনিস কোর্ট নির্মাণের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদী অবস্থান কর্মসূচি পালন করে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.