শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় দিবসগুলো উদযাপন এবং চলমান বাস্তবতা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় দিবসগুলো উদযাপন এবং চলমান বাস্তবতা

দিন যায়-দিন আসে। এটিই প্রকৃতির নিয়ম। তবে কিছু দিন হারিয়ে যায় চিরতরে। আবার কতিপয় দিবস বিশেষ তাত্পর্যের সাক্ষী হয়ে স্থায়ী আসন লাভ করে প্রতিটি জাতির জীবনে। এমন দিবসগুলো স্বীকৃতি পায় জাতীয় দিবস হিসেবে। ফলে এ দিনগুলো আর সাধারণ থাকে না। হয়ে ওঠে অনন্য-অসাধারণ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে একটু দেখা যাক। মাতৃভাষার দাবিতে প্রাণ দানের ঘটনা বিশ্বের মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশেই ঘটেছে। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষা করতে বহু আলাপ-সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তদানীন্তন শাসক গোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বাংলার দামাল ছেলেরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকার রাজপথে মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রফিক, শফিক, সালাম, জব্বার এবং বরকত। উল্লেখ্য, শহীদ রফিক মানিকগঞ্জের কৃতীসন্তান এবং মানিকগঞ্জ শহরের প্রধান সড়কের নামটিও তার স্মরণে। ২১ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক হতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিভাবে বন্ধ থাকে। ২১ ফেব্রুয়ারি এখন শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বিধি মোতাবেক প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিবসটি পালন করার কথা। জ্ঞানী-গুণীদের চারণভূমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে তো এর ব্যত্যয় ঘটার কোনো সুযোগই নেই। এর মূল উদ্দেশ্য, শিক্ষার্থীদের দিবসটির তাত্পর্য সম্পর্কে ধারণা দেয়া ও সচেতন করার মাধ্যমে দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করা।

১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম দিবস। এ দিনের তাত্পর্য এ কলামে লিখে শেষ করা যাবে না। এক কথায় বলা যায়, বাঙালি জাতির ইতিহাসের একটি অনন্য দিন এটি। এরপর আসে বাঙালি জাতির জীবনের অন্যতম দিন ২৬ মার্চ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা ও হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান বেতারের মাধ্যমে পাকিস্তানি পরাধীনতার গ্লানি হতে মুক্ত করতে স্বাধীনতার ডাক দেন অর্থাত্ বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। এর পর পরই বাংলার আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ প্রাণ ও অগণিত নারীর অপমানের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ২৬ মার্চও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকাভুক্ত। অর্থাত্ এদিন শ্রেণিকক্ষে সিলেবাসভিত্তিক পাঠদান করা হয় না। এর পর আসে জাতীয় শোক দিবস অর্থাত্ ১৫ আগস্ট। বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক ও বেদনার দিন। সেদিন জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মম ও অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়। এমনকি বাদ যায়নি বঙ্গবন্ধুর দশ বছরের শিশুপুত্র শেখ রাসেল! যাঁর জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না-স্বাধীন দেশে সেই বঙ্গবন্ধুকেই বুলেটের আঘাতে জীবন দিতে হলো! অন্যান্য জাতীয় দিবসের মতো এদিনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সিলেবাসভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকে।

বছরের শেষে আসে মহান বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। হাজার বছরের শৃঙ্খলার নাগপাশ হতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব আর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। ৯৩ হাজার পাকসেনার আত্মসর্ম্পণের মাধ্যমে দুঃশাসনের অবসান শেষে বাংলার জনগণ লাভ করেন বহু আকাঙ্ক্ষিত বিজয়। তাই তো এদিন আমাদের বিজয় দিবস। এ তো গেল আলোচিত দিবসগুলোর ঐতিহাসিক তাত্পর্য। এবার আসা যাক এসব জাতীয় দিবগুলোর উদযাপন প্রসঙ্গে। সরকারি-বেসরকারি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উল্লিখিত জাতীয় দিবসগুলো পালনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে কি হচ্ছে? এক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় তিনটি অবস্থান। এক. একশ্রেণির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব দিবস মোটেও পালন করা হয় না। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মাদ্রাসা এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। দুই. প্রতিষ্ঠানপ্রধান স্থানীয় শিক্ষক-কর্মচারী এবং অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীর মাধ্যমে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় দিবস উদযাপন করে থাকেন। তিন. প্রতিষ্ঠানপ্রধান সব শিক্ষক-কর্মচারী এবং ব্যাপক শিক্ষার্থীকে নিয়ে নগণ্যসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় দিবস উদযাপন করে থাকেন। এমন বাস্তবতা মোটেও প্রত্যাশিত নয়। তবুও এমনই হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, সরকারিভাবে তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা এবং শিক্ষক সমাজের চরম দায়িত্বহীনতাকেই এর অন্যতম কারণ বলে ধরা যায়।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারের ভাণ্ডার হতে শতভাগ বেতন-ভাতা আর এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারের গোলা হতে শতভাগ বেতন এবং আংশিক ভাতা পান। এমপিওবিহীন শিক্ষক-কর্মচারীরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হতে কম-বেশি বেতন-ভাতা পান অথচ সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় দিবসগুলো বছরের পর বছর ধরে উদযাপন করা হয় না। বিষয়টি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। এ ব্যাপারে জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০১২ তে (ধারা ৫ এর উপধারা ৫.১৯) পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে—জাতীয় দিবসসমূহে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রেখে দিবস উদযাপন করার কথা। আর জাতীয় দিবসসমূহ উদযাপনের টার্গেট গ্রুপ হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এটি সহ-পাঠক্রমিক কার্যক্রমের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। শুধু সিলেবাসের বই পড়ে পরীক্ষা পাসের নামই শিক্ষা নয়। জাতীয় ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতিবিষয়ক জ্ঞানলাভ শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ সত্যটি শিক্ষক সমাজকে অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে।

কারণ, শিক্ষকদের আন্তরিকতাই এ ব্যাপারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার্থীদের সহ-পাঠক্রমিক কার্যাবলি পরিচালনা করা শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্বের অন্যতম অংশ। অনেক শিক্ষককেই জাতীয় দিবস উদযাপন করাকে নিছক ছুটি মার হিসেবে বিবেচনা করতে দেখা যায়। এভাবে ছুটির হিসাব করাটা বিবেচনাপ্রসূত ও শিক্ষকসুলভ নয়। আর তর্কের খাতিরে ছুটি মারের কথা মেনে নিয়েও বলা যায়, ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাত্সরিক সরকারি ৮৫ দিনের ছুটি হতে ৫ দিন বাদ দিলে কি চলেই না? এছাড়াও আছে ২০ দিনের নৈমিত্তিক ছুটি ও ১০ দিনের চিকিত্সা ছুটি। বিষয়টি আদর্শিক। বেতন-ভাতা যাই হোক না কেন, শিক্ষকতার পেশায় থেকে এভাবে লাভ-ক্ষতির জাবেদা করলে কেমন যেন দেখায়। অন্য দশটি পেশার চেয়ে শিক্ষকতা নিঃসন্দেহে ভিন্ন। সমাজের মানুষের প্রত্যাশাও শিক্ষকদের কাছে অনেক। এ ব্যাপারে আমাদের শ্রদ্ধেয় অগ্রজদের ভূমিকা স্মরণ করা যেতে পারে। উনাদের বেতন-ভাতা আমাদের চেয়ে অনেক কম ছিল। তবে আমাদের চেয়ে ঢের বেশি ছিল সামাজিক মর্যাদা। আর একটু দায়িত্বশীল ও পেশাদারি মনোভাবাপন্ন হলেই শিক্ষকরা তাদের মর্যাদার হূতরাজ্য পুনরুদ্ধার করতে পারবেন বলে আশা করা যায়। সে রাজ্যের বাসিন্দা হওয়া কি কম গৌরবের?

জাতীয় দিবসগুলো উদযাপনের মাধ্যমে আজকের শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্তি হতে মুক্ত হয়ে সত্যের সন্ধান পাবে। ওরা জানতে পারবে আমাদের ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার কথা। জানতে পারবে ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড তথা জাতির জনকের নির্মম হত্যার কথা। ওরা বুঝতে সক্ষম হবে ব্যক্তি বা পারিবারিক শোক কীভাবে জাতীয় শোক হয়। শিক্ষার্থীরা শিখতে পারবে নিজের পিতা আর জাতির পিতার মধ্যকার পার্থক্য। ওরা জানতে পারবে অন্যান্য জাতির পিতার কথা। বিভ্রান্তির ঘূর্ণিপাক হতে বেরিয়ে এসে ওরা জানতে পারবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষক কে? শিক্ষার্থীদের এসব জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ধারণা দেয়া শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব। যুক্তি দেয়া যেতে পারে, জাতীয় দিবসগুলোর কথা তো শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মধ্যেই বলা যায়। কেন শুধু শুধু দিবস উদযাপন করে ছুটির মজা ধ্বংস করা? পারিবারিক জীবন বিপন্ন করা? প্রতি-উত্তরে বলা যায়, আপনার বা আপনার সন্তানের বার্থ ডে/ম্যারেজ ডে’র কেক নির্ধারিত দিনের কয়েক সপ্তাহ আগে বা পরে কাটলে কেমন হবে? কেক তো কেকই! আবার জাতীয় দিবসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক-কর্মচারীর অনুপস্থিত থাকাই যাবে না এমন কোনো কথাও কোথাও নেই। কর্তৃপক্ষের সামনে যৌক্তিক কারণ উপস্থাপন সাপেক্ষে তা অবশ্যই করা যাবে। কাজেই এ ব্যাপারে যেন বাড়াবাড়ির কোনো অপ্রীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি না হয় সে দিকেও যথাযথ কর্তৃপক্ষের সচেতন থাকা দরকার। মোদ্দা কথা হলো, জাতীয় দিবসগুলোয় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের গণহারে অনুপস্থিতি রোধ করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। অনেক সময় কর্তৃপক্ষের ও শিক্ষকদের শতভাগ আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কমসংখ্যক শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির কারণে জাতীয় দিবস উদযাপনকে ফলপ্রসূ করা যায় না। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের গাইড টিচাররা (নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থীর একাডেমিক ও সহ-শিক্ষাক্রমিক কার্যক্রমের মানোন্নয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক) ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারেন। অবশ্য দেশের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এখন পর্যন্ত গাইড টিচার ধারণাটি অপরিচিত। আসুন, আমরা শিক্ষক হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে শিক্ষার্থীদের আগামীর যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলি। এতে আমাদের কিছুটা সময় ব্যয় হলেও মানসিক প্রশান্তি কম থাকবে না। আমরা যে মাস্টারদা সূর্য সেনের উত্তরসূরি!
– লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ঝিট্কা খাজা রহমত আলী ডিগ্রি কলেজ, হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ

মানবকণ্ঠ/এসএস