শিক্ষাদর্শন ও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা

শিক্ষার দর্শন নিয়ে আলোচনা করার আগে ‘শিক্ষার’ একটা সংজ্ঞা নির্ণয়ের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়। শিক্ষা বলতে আমরা কী বুঝি? মাছ ও অন্য জলজপ্রাণী যেমন জলের অস্তিত্ব বুঝতে পারে না; আমরা যারা অক্সিজেন বা বাতাসের মধ্যে চলাফেরা করি, তারা যেমন অক্সিজেন বা বাতাসের উপস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন থাকি, জন্মের পর থেকে মানুষ তেমনি প্রকৃতি থেকে স্বাভাবিক নিয়মে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে।

সে তা বোঝে না- বুঝতে পারে না। শিক্ষা গ্রহণ করে সে ক্রমশ মানুষ হয়ে ওঠে। আমাদের সাধারণ ধারণা যে, যারা স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে বের হয়, তারাই শিক্ষিত কিন্তু সত্যিই কি তাই? এটা সম্পূর্ণ সত্যি নয় যে, যারা শিক্ষায়তন থেকে পাস করে বের হয়, তারা সবাই শিক্ষিত। আবার এ কথাও ঠিক নয় যে, যারা কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চত্বর মাড়ায়নি, তারা সবাই অশিক্ষিত। আমরা যদি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায়তন গড়ে ওঠার আগের সময়ের দিকে তাকাই তাহলে বিষয়টি বুঝতে সহজ হয়। আমাদের সাধারণ ধারণা অনুযায়ী তখন পৃথিবীতে শিক্ষিত মানুষের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব ছিল না।

কিন্তু ইতিহাস তা বলে না। ইতিহাস বলে যে, তখনো শিক্ষিত মানুষ ছিল এবং তারা তাদের শিক্ষার শক্তিতে অনেক কিছু সৃষ্টি বা আবিষ্কার করেছে। এই মুহূর্তে আমার কয়েকটি যুগান্তকারী আবিষ্কারের কথা মনে পড়ছে, যেগুলো নব্য প্রস্তর যুগে পা রাখার আগের যুগের মানুষের তৈরি। তার মধ্যে প্রথমেই পাথরের হাতিয়ার তৈরির কারখানার কথা মনে পড়ছে, যেগুলো ১৭ থেকে ২০ লাখ বছর পূর্বে মানুষের সুদূর আত্মীয় অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাস অথবা হোমো হ্যাবিলিস নামক প্রজাতি গড়ে তুলেছিল। তারপর আগুনের আবিষ্কারের কথা বলতে হয়, যেটি পাঁচ-চার লাখ বছর পূর্বে হোমো ইরেক্টাস নামের মানুষের পূর্বপুরুষের কীর্তি।

হোমো স্যাপিঅ্যান্সদের প্রধান দুটি আবিষ্কারের মধ্যে চামড়া ও অ্যালকোহল যা দশ থেকে বারো হাজার বছর পূর্বে আবিষ্কৃত হয়েছিল আর ঐতিহাসিক যুগে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে কৃষির আবিষ্কার ও জীবজন্তুর বশীকরণ বা গৃহপালন মানব সভ্যতা গড়ার পথে এক মস্ত বড় পদক্ষেপ। ওই সব আবিষ্কারকের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। সে সুযোগও ছিল না। কিন্তু তাদের প্রকৃতিদত্ত শিক্ষাই তাদের প্রাণিজগতের অন্যসব সদস্যের থেকে ক্রমান্বয়ে আলাদা করে সভ্য মানুষ হওয়ার পথে এগিয়ে দেয়। তাহলে শিক্ষিত মানুষ কাদের বলব? এক কথায় এর উত্তর দেয়া বেশ কষ্টসাধ্য।

যদি বলি একজন শিক্ষিত মানুষ সেই মানুষ যার মধ্যে মানুষ হয়ে ওঠার আকুতি বা আকাক্সক্ষা অন্যসব আকুতি বা আকাক্সক্ষাকে ছড়িয়ে যায়, তাহলে কি বক্তব্যটা পরিষ্কার হয়?

বিষয়টা আর একটু পরিষ্কার করার জন্য মানুষ ও ঈশ্বর সম্পর্কে ধর্মমত ও বিজ্ঞানীদের একাংশের মতামত তুলে ধরা যায়। ধর্মমতানুসারে মানুষ হলো ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি ও তারই আদলে সৃষ্টি এবং ঈশ্বরেরই অংশ। ঈশ্বর হলো সর্বশক্তিমান, সর্বমঙ্গলময়, সর্বজ্ঞ এবং সর্বত্রগামী। ধর্মাচরণের মাধ্যমে মানুষ ঈশ্বরের প্রতিকল্পকে স্পর্শ করতে চায়। যা হয়তো কখনো হয়ে উঠবে না। তাতে ক্ষতি নেই। ক্রমান্বয়ে সে সর্বশক্তিমান, মঙ্গলময়, সর্বজ্ঞ ও সর্বত্রগামী ঈশ্বরের কাছে পৌঁছাতে চায়। বিজ্ঞানী ও যুক্তি ও সংশয়বাদীরা এ কথা স্বীকার করেন না। তারা উল্টো কথা বলেন।

তাদের মতে, মানুষ মোটেই ঈশ্বরের প্রতিরূপ বা আদলে সৃষ্ট নয়। ঈশ্বরই আসলে মানুষের আদলে সৃষ্ট। মানুষ নিজেকে সর্বশক্তিমান, সর্বমঙ্গলময়, সর্বজ্ঞ এবং সর্বত্রগামী ভাবতে ভালোবাসে। স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে তার ঈশ্বর-কল্পনায়। মানুষ ঈশ্বরের মাঝেই তার সে অপূর্ণ স্বপ্নকে সফল করতে চায়। যে ব্যক্তব্যই সত্যি হোক না কেন, উভয়ের বক্তব্য বিচার করলে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, মানুষ ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চায়। সে ঈশ্বর হতে চায়। সেই প্রচেষ্টা আর উদ্যমের অপর নাম শিক্ষা। সে শিক্ষা মানুষের গড়া শিক্ষায়তনের মধ্যে মিলতে পারে, নাও মিলতে পারে; কিংবা প্রকৃতির বুকে বিচরণকারী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন মানুষও সে শিক্ষায় নিজেকে শিক্ষিত করে তুলতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষের প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষহীন পূর্বপুরুষেরা শিক্ষার দ্বারোদ্ঘাটন করে মানুষের সভ্যতার পথে, সংস্কৃতির পথে, বিজ্ঞানের পথে, চলার পথ কেটেছিল। সেই পথ ধরে আজ মানুষ বর্তমান অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যখন সে সর্বশক্তিমান, সর্বমঙ্গলময়, সর্বজ্ঞ ও সর্বত্রগামী হয়ে উঠতে না পারলেও অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে আজ শক্তিবান হয়ে উঠেছে-এ কথা মিথ্যা নয়। এই ‘হয়ে’ ওঠার পেছনে যে প্রক্রিয়াটি প্রধান ভূমিকার কাজ করেছে তারই নাম শিক্ষা।

সমাজ সভ্যতার অগ্রযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ যেমন ক্রমে শক্তিধর হয়ে উঠেছে, তেমনি তার জীবনে দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা এবং মিশ্র অনুভূতি। সমাজে সৃষ্টি হয়েছে নানারকম বিশৃঙ্খলা, অস্থিরতা, সৃষ্টি হয়েছে মানুষে মানুষে বিভেদের প্রাচীর। অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাস অথবা হোমো হ্যাবিলিস এবং হোমো ইরেক্টাসের সহজ-সরল অনাড়ম্বর জীবন পরিত্যাগ করে হোমো স্যাপিঅ্যান্স ক্রমাগত উন্নতর এবং জটিলতার জীবনযাত্রার পথে অগ্রসর হয়েছে। সেই সঙ্গে মানব সমাজ ক্রমাগত শ্রমবিভাজনের পথে এগিয়েছে। মানব সমাজের যৌথ কর্মপ্রয়াস ক্রমশ উঁচু-নিচু, ছোট বড়, সম্মানজনক-অসম্মানজনক বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং সেসব স্তরে কর্মরত মানুষের মধ্যে ক্রমশ বিভেদের দেয়াল গড়ে ওঠে। যৌথ শ্রম প্রয়াসের মতো যৌথ মানব সমাজও বিভাজনের পথে অগ্রসর হয়।

কর্মের ভিত্তিতে সমাজে গড়ে ওঠে শ্রমবিভাজন-কেউ পরিণত হয় দৈহিক শ্রমমুক্ত, পরশ্রমভোগী শাসকশ্রেণীতে আর অধিকাংশই পরিণত হয় দৈহিক শ্রম-প্রদানকারী গতর খাটা মানুষে। শাসকশ্রেণী দৈহিক শ্রমপ্রদানকারীর শ্রমসহ সমাজ শাসনের কর্তৃত্ব দখল করার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার বিষয়টিও নিজেদের অধিকারে নিয়ে নেয় এবং নিজের শাসন-শোষণের প্রয়োজনে একটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলে, যার মাধ্যমে কাকে কতটুকু কী শিক্ষা দেয়া হবে, তা তারাই নির্ধারণ করে। ফলে গতর খাটা মানুষের শ্রম-শক্তির মতো মানুষের শিক্ষার জন্মগত অধিকার থেকে অধিকাংশ মানুষ বিচ্যুত হয় এবং তার বিকাশের অসীম সম্ভাবনার পথটি হয়ে যায় রুদ্ধ।

শোষণের উপায়গুলো যত শক্তি সঞ্চয় করে, শিক্ষা যন্ত্রটির ওপর শাসকশ্রেণীর কবজা ততই শক্তিশালী হয় এবং ‘সুনাগরিক তৈরির নামে তারা সাধারণ মানুষের জন্য যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলে, তা তার প্রগতিশীল ও সৃজনশীল চরিত্র হারিয়ে ক্রমে প্রতিক্রিয়ার দুর্গে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথ বিষয়টি বুঝেছিলেন। তিনি বলেন, ‘ইস্কুলে যারা পড়া মুখস্থ করেছে আর ইস্কুলের বাইরে পড়ে থেকে যারা পড়া মুখস্থ করেনি, তাদের মধ্যে শ্রেণী বিভাগ ঘটে গেছে-শিক্ষিত ও অশিক্ষিত।’ এভাবে শিক্ষা পরিণত হয় শ্রেণী শোষণের শক্তিশালী হাতিয়ারে আর শিক্ষিতেরা হয়ে ওঠে সে হাতিয়ার প্রয়োগের স্ক্রু-নাট-বল্টু। অক্টোবর বিপ্লবের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম জনশিক্ষা কমিশনার (১৯১৭-১৯২৯) আনাতোলি ভাসিলিয়েভ লুনাচারস্কির (১৮৭৫-১৯৩৩) মতে, ‘The school has always been and cannot help but be a class weapon.’ বার্ট্রান্ড রাসেলও শেষ বিচারে সিদ্ধান্তে পৌঁছেন ‘But inspite of these exceptions, education in the modern world tends to be a rcactionary force, supporting the Government when it is conservative and opposing it when it is progressive.’ এই বক্তব্যের প্রমাণ বর্তমান প্রবন্ধেই পাওয়া যাবে। লুনাচারস্কির মতে, সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের ফলে সমাজ শ্রেণীবিভক্ত হয়ে পড়ে। তখন থেকেই শিক্ষা শাসকশ্রেণীর স্বার্থ সংরক্ষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়। Class-feeling in Education’ প্রবন্ধে রাসেলও বলেন, ‘Ever since the dawn of civilization class inequality has existed.’ সেই শ্রেণী বৈষম্যই শিক্ষা বৈষম্যের জন্ম দেয়। রাসেল আরো বলেন, আধুনিককালে যারা শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয়করণের বন্দোবস্ত করে, তারা অসীম বিকাশমান মানবশক্তিকে একটি রক্ষণশীল, প্রতিক্রিয়াশীল পচা বস্তুতে পরিণত করে। এখানে বুর্জোয়া জাতীয় রাষ্ট্রের চরিত্র প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তার কথা ‘Those who institute state system of education will cause men to deteriorate even as citizens, if they taka a narrow view of what constitute a good citizen.’ সুসভ্য নাগরিক গড়ার দায়িত্ব যখন রাষ্ট্র গ্রহণ করে এবং রাষ্ট্রনায়ক যদি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির প্রতিভূ হয়, তাহলে তারা তাদের শ্রেণীস্বার্থে সংকীর্ণ ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ গ্রহণ করে।

তখন সুনাগরিকের পরিবর্তে অধঃপতিত নাগরিক তৈরি হয়। এভাবে শ্রমবিচ্যুতির (Labour alienation) সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবন থেকে শিক্ষা বিচ্যুতি ঘটে। রাষ্ট্র ও তার পরিচালকবৃন্দের হাতে শিক্ষা বন্দি হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র তার প্রয়োজনানুসারে সুনাগরিক তৈরির জন্য যে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে সেখানে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মেধা ও মননের বিকাশ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থারও পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়ে। সমাজ-বিপ্লবের মাধ্যমে যে প্রগতিশীল শ্রেণী ক্ষমতায় আসে, তাদের কাছে তখন পুরনো সমাজ কাঠামোটি অপ্রয়োজনীয় মনে হয় এবং পুরনো শাসকশ্রেণীর পতনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের শাসনের যন্ত্রগুলো ধ্বংস সাধনে অগ্রসর হয়। তাই শাসকশ্রেণীর শ্রেণী চরিত্রের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার এক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। দু’ দু-বার সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার পরিবর্তনের নিকট দুটি দৃষ্টান্ত আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। দেখা যায়, দু’বারই সমাজ পরিবর্তনে নিবেদিতপ্রাণ প্রগতিশীল শাসকরা যখন তাদের প্রয়োজনে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে গেছেন, উভয় ক্ষেত্রেই তাদের পুরনো প্রতিক্রিয়াশীল শাসকশ্রেণীর কাছ থেকে প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রতিষ্ঠা এবং বুর্জোয়া বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পর দেখা যায়, ব্রিটেনের কোনো প্রতিষ্ঠানই উনিশ শতকীয় পুনর্জাগরণের স্পর্শ থেকে দূরে সরে থাকতে পারেনি। সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ‘শিক্ষা’ সে নবজাগরণ থেকে দূরে থাকবে, তা আশা করা যায় না। মধ্যযুগের শিক্ষা ছিল মূলত যাজক তৈরির কারখানা। রাসেল বলেন, In the middle ages education meant the education of priest এছাড়া মধ্যযুগের রাজতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য দক্ষ রাজনীতিবিদ ও সেই সঙ্গে উপনিবেশগুলোর জন্য দক্ষ প্রশাসক তৈরি, ধর্মীয় আইন বিশেষজ্ঞ, ডাক্তার, স্কুলশিক্ষক এবং রাজ্য শাসনের জন্য উপযুক্ত আমলাতন্ত্র তৈরি করা হতো। কিন্তু ক্ষমতাসীন নতুন বুর্জোয়া শ্রেণী কেবল তাতেই সন্তুষ্ট নয়। অভিজাততন্ত্রের তার আর প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই যাজক তৈরির কারখানার। তার চাই লাখ লাখ দক্ষ জনশক্তি যারা বিকাশশীল পুঁজিবাদী অর্থনীতির গাড়িকে কেবল সচলই রাখবে না- তাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে। অক্সফোর্ড-কেমব্রিজসহ পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তখনো পুরনোপন্থিদের হাতে বন্দি।

তাই নতুন যুগের নতুন প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গণতন্ত্রায়নের লক্ষ্যে ১৮৫০ সালের এপ্রিল মাসে জন রাসেল যখন পার্লামেন্টে একটি বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন নিয়োগের ঘোষণা দেন, তখন ভীমরুলের চাকে ঢিল পড়ে। অক্সফোর্ড কেমব্রিজসহ প্রতিক্রিয়ার সব ঘাঁটিগুলো সে কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অবতীর্ণ হয় এবং কমিশন বয়কট করে। তাদের অভিযোগের মূল কথা ছিল, নতুন সরকার তাদের সংকীর্ণ বুর্জোয়া ভাবাদর্শানুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থাকে গড়ে তুলতে চায়- একটি রাজনৈতিক ভাবাদর্শ শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কে প্রবেশ করাতে চায়। এভাবে তারা ‘নিরপেক্ষ শিক্ষাকে’ শ্রেণীচেতনার দ্বারা কলুষিত করতে চায়। বলাই বাহুল্য, ওই কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ব্রিটেনে আধুনিক বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক শিক্ষাব্যবস্থার বীজ রোপিত হয়।

আজও সারা বিশ্বে সেই বুর্জোয়া ভাবাদর্শিক শিক্ষাই মুখ্য স্থান অধিকার করে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই গণতন্ত্রায়ন যারা মেনে নিতে পারেননি, সেই কট্টর ক্যাথলিক সম্প্রদায় ব্রিটেনে নিজেদের জন্য পুরনো যুগের ঐতিহ্য অনুসারে একটি ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং তখনকার প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ পণ্ডিত দার্শনিক হেনরি নিউম্যানকে তার প্রথম রেক্টর নিযুক্ত করেন। নিউম্যান ছিলেন একজন কট্টর ক্যাথলিক। রেক্টরের দায়িত্বভার গ্রহণ করে তিনি ১৮৫২ সালের ২১ নভেম্বর ছাত্র-শিক্ষকের সামনে নীতি-নির্ধারণী ন’টি বক্তৃতা দেন। অ্যারিস্টোটলের ‘এথিকসের’ সমমর্যাদাপূর্ণ ওই বক্তৃতায় তিনি সার্বিকভাবে শিক্ষার আদর্শ এবং বিশেষভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র নিয়ে আলোচনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয় বলতে কী বোঝায় তার পুষ্পিত বক্তৃতার ভূমিকার প্রথমেই স্পষ্ট ভাষায় তা ব্যক্ত করেন।

‘The view taken of a University in these discourses is the following: That it is a place of teaching universal knowledge. This implies that its object is, on the one hand, intellectual, not moral; and, on the other, that it is the diffusion and extension of knowledge rather than the advancement. If its object were scientific and philosophical discovery, I do not see how it can be the seat of literature and science. Such is a University in its essence, and indipendently of its relation to the Church.’ কট্টর ক্যাথলিক হওয়া সত্ত্বেও তার মতো পণ্ডিতের পক্ষে যুগের পরিবর্তিত বাস্তবতা উপলব্ধি করতে অসুবিধা হয়নি এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার পক্ষে কথা বলতে ভীত হননি।

‘শিক্ষা’ ও ‘শিক্ষাদর্শন’ সম্পর্কে এই যৎকিঞ্চিৎ আলোচনার পর বাংলাদেশের শিক্ষা সম্পর্কে আর কিছু বলার থাকে বলে আমার মনে হয় না। বাংলাদেশে ‘শিক্ষা’ নামে যে বস্তুটি চালু আছে তা এত পুরনো, পশ্চাদমুখী এবং সময়ের এত প্রতিকূল যে, এ শিক্ষা থেকে শিক্ষার্থীদের সমকালীন শিক্ষা পাওয়া সম্ভব নয় আর সমকালীন, সময়োপযোগী শিক্ষা ছাড়া সবচেয়ে পেছনের আসন থেকে কীভাবে মই বেয়ে বাংলাদেশ ওপরে উঠবে, তা বোঝা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে অবস্থিত উন্নত বিশ্বের মিশনগুলো তাদের পাঁচ/সাত বছরের পুরনো কম্পিউটার যন্ত্রগুলো বঙ্গোপসাগরে ফেলে না দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা সংস্থায় ‘দান’ করে তাদের বদান্যতার পরিচয় দেয়। আমরাও সেগুলো পেয়ে ধন্য হয়েছি।

কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছি, তারা কেন সেগুলো দান করে দিল? না, দেখিনি, ভিখারি কখনো চেয়ে দেখে না ভিক্ষার চালে কতটা কাঁকর মেশানো থাকে। মাত্র পাঁচ/সাত বছরের কম্পিউটার যন্ত্রগুলো আজ তাদের কাছে অচল হয়ে গেছে। ওগুলো দিয়ে উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাবে না। তাদের দরকার সর্বাধুনিক যন্ত্র। তার জন্য জায়গার প্রয়োজন। তাই পুরনোগুলোকে ফেলে দিতেই হয়। শিক্ষাও তেমনি একটি যন্ত্র। কম্পিউটার যন্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী, মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় যন্ত্র সেটি। সমাজপ্রগতির সঙ্গে সে যন্ত্রটিও একসময় অচল হয়ে পড়ে। তখন পুরনো শিক্ষা কাঠামোটিকে ফেলে দিয়ে নতুন করে তাকে সাজাতে হয়; সাম্প্রতিকতম জ্ঞানের আলোকে শিক্ষাকে তখন ঢেলে সাজানো অপরিহার্য হয়ে পড়ে। ‘সব সময়ের জন্য শিক্ষা থাকবে প্রগতিমুখী- তার দৃষ্টি থাকবে সামনের দিকে পেছনে নয়’- এটাই শিক্ষার মূল দর্শন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. কুদরত-এ-খুদার নেতৃত্বে শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর একটা প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিল।

বলব না যে সে কমিশনের রিপোর্ট সর্বাঙ্গসুন্দর ছিল। কিন্তু দু’বছর ধরে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকসহ সর্বস্তরের মানুষের মতামত নেয়ার একটা শুভ প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছিল। একটা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছিল সে রিপোর্টে। নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে জেনারেল সাহেবরা ক্ষমতা দখল করে দেশবাসীর সে মতামত ছেঁড়া কাগজের মতো ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল এবং ইসলামের নামে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনামলের মতো আধা-সামন্ততান্ত্রিক-আধাবুর্জোয়া একটি আধা খেঁচড়া প্রতিক্রিয়াশীল শিক্ষাব্যবস্থা জাতির ওপর চাপিয়ে দিয়েছে।

ধর্মের নামে পৃথিবীতে অনেক অপকর্মই করা হয়েছে। একাত্তরে এদেশে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল এবং লাখ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হরণ করা হয়েছিল, ইসলামেরই নামে। চরমভাবে অনৈসলামিক শাসকরা ইসলামের নামে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে করে তুলেছে চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও মধ্যযুগীয়। এ শিক্ষাব্যবস্থা সাম্প্রদায়িক বিষে জর্জরিত। এ শিক্ষা দিয়ে আধুনিক বিশ্বে মর্যাদার আসনে স্থান পাওয়া সম্ভব নয়। ‘আধুনিকীকরণের’ গালভরা বুলি আওড়িয়ে-এদেশের শিক্ষাকে যে কতটা অনাধুনিক করে তোলা হয়েছে তা আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।

পনেরো বছর বয়সের জামা যদি আজ ষাট বছর বয়সে শরীরে চাপাতে যাই তাহলে ওই জামার যে দশা হবে, বাংলাদেশের শিক্ষার অবস্থাও তাই। পঁচাত্তরের নৃশংস রক্তাক্ত কালো অধ্যায়ের পর জনগণের মতামত যাচাই করে এদেশে কোনো শিক্ষানীতি প্রণয়নের চেষ্টা হয়নি। এদেশে কোনো শিক্ষা দর্শন নেই। যা আছে তার উদ্দেশ্য মূলত দুটি। এক. এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে অশিক্ষিত রাখার ব্যাপক পরিকল্পনা এবং দুই. শাসকশ্রেণীর সন্তানদের জন্য আলাদা আধুনিক শিক্ষার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা যেন তারা চিরকাল এদেশ শাসন-শোষণ করতে পারে। এ শিক্ষাব্যবস্থা আজ জাতিকে ধ্বংসের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। – লেখক: শিক্ষাবিদ

মানবকণ্ঠ/এএএম