শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কে নৈতিক বিপর্যয়

পৃথিবীর পরিমণ্ডলে মানব জাতির সভ্য হওয়ার পেছনে শিক্ষার অবদান অনস্বীকার্য। মানুষের জন্মের পর প্রাথমিক নৈতিক শিক্ষা মানুষ তার নিজ পরিবারের কাছ থেকে গ্রহণ করে। তবে এরপর পাঠশালার শিক্ষকই সেই মানব শিশুকে ভিন্ন চোখে বিশ্ব দেখতে শেখায়, প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলায় সাহায্য করেন।

আমরা জানি, শিক্ষার উদ্দেশ্য জ্ঞান বিতরণ নয় মূল্যবোধ তৈরি করা। সেই মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষায় একজন শিক্ষার্থী মানুষ হওয়ার ভিত তৈরি করে ছোট থেকেই। ধীরে ধীরে সে বড় হয়ে ওঠে চেতনায়। শিক্ষার্থীর সেই ভিত অনেকটাই তৈরি করে দেন একজন শিক্ষক। তাই শিক্ষকরা সমাজের সবচাইতে সম্মানের আসনে বসবাস করেন। শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের আবেগ অনুভ‚তি সত্যিই অন্যরকম। বর্তমানে এই আবেগ অনুভ‚তিতে কেমন যেন একটা ফাঁকা ফাঁকা পরিবেশ বিরাজ করছে। এই জন্য আসলে দায়ী কে শিক্ষক নাকি শিক্ষার্থী নাকি অভিভাবক?

শিক্ষাদানের মহান ব্রত যার কাজ তাকেই শিক্ষক বলা হয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাদানের কাজে নিয়োজিত তারা। শিক্ষকরা জাতি গঠনের কারিগর। একজন আদর্শ শিক্ষকই পারেন তার অনুসারীদের জ্ঞান ও ন্যায় দীক্ষা দিতে। শিক্ষার্থীর মানবতাবোধকে জাগ্রত করে একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকে সার্থকই করে তোলেন না, পাশাপাশি দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেন। স্বীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করে তাদের দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেন। উইকিপিডিয়া শিক্ষককে এভাবেই মূল্যায়ন করেছে। ঠিক এর বিপরীতে শিক্ষকদের অনুসারীদের শিক্ষার্থী বলা হয়।

একটা সময় শিক্ষাদানের মহান ব্রত নিয়েই এক একজন শিক্ষক হতেন। সেই সূত্রে উইকিপিডিয়া ঠিক সংজ্ঞায়নই করেছে। ওই সময়টাই শিক্ষক মানেই ছিল গাম্ভীর্য ও মানসিক প্রাচুর্যতা। শিক্ষক হয়ে তারা সুখ অনুভব করতেন। শিক্ষার্থীরাও তাদের পরশে সোনা হতেন। সেই সময় পেরিয়ে বর্তমান সময় বড় বেশি দ্রুতময়। সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে যত সব ব্রত। এখনকার অনেক শিক্ষক ব্রত কী বুঝেন না। অবশ্য উইকিপিডিয়ার পরের অংশটি কিছু ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে যায়। তারা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাদানের কাজে নিয়োজিত। কিন্তু তাদের ‘শিক্ষা’র সঙ্গে শিক্ষার বিস্তর পার্থক্য। তারা শিক্ষা মানে সুনির্দিষ্ট কিছু অংশ বুঝানো, ব্যাংকিংয়ের মতো গৎবাধা পরীক্ষা ইত্যাদি ইত্যাদি বুঝেন। তাদের বেলায় উইকিপিডিয়ার সংজ্ঞায়নে শিক্ষকদের জাতি গঠনের কারিগর বলা হয় কথাটি পাওয়া যায় না। তারা জাতি গঠনে কোনো ভ‚মিকা রাখতে পারেন না। উইকিপিডিয়া ঠিক পরের বাক্যেই বলছে- একজন আদর্শ শিক্ষকই পারেন তার অনুসারীদের জ্ঞান ও ন্যায় দীক্ষা দিতে। ঠিক এরপরই বলছে- শিক্ষার্থীর মানবতাবোধকে জাগ্রত করে একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকে সার্থকই করে তোলেন না, পাশাপাশি দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেন, স্বীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করে তাদের দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তার পুত্রের শিক্ষকের কাছে লেখা পত্রে বলেছিলেন, ‘আমার পুত্রকে জ্ঞানার্জনের জন্য আপনার কাছে পাঠালাম। তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন- এটাই আপনার কাছে আমার বিশেষ দাবি।’ জগৎবিখ্যাত বীর আলেকজান্ডার তার শিক্ষক এরিস্টটলের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বলেছিলেন, ‘আমার পিতা, আমি আমাকে জয় করেছি ; এরিস্টটল, এই জ্ঞান যোগ্যতার সহিত বসবাস করতে সাহায্য করেছে।’

কবি কাজী কাদের নেওয়াজের শিক্ষকের মর্যাদা কবিতা শিক্ষকের অতীত সময় ভালো করে বলে দেয়। সহজাত সম্পর্কে শিক্ষার্থীর রূপটিও বলা হয়ে যায়। কবিতাটির কিছু লাইন,
‘বাদশাহ আলমগীর
কুমারে তাহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লির।
একদা প্রভাতে গিয়া
দেখেন বাদশাহ-শাহজাদা এক পাত্র হস্তে নিয়া
ঢালিতেছে বারি গুরুর চরণে
পুলকিত হৃদে আনত-নয়নে,
শিক্ষক শুধু নিজ হাত দিয়া নিজেরি পায়ের ধুলি
ধুয়ে মুছে সব করছেন সাফ সঞ্চারি অঙ্গুলি।
শিক্ষক মৌলভী
ভাবিলেন আজি নিস্তার নাহি, যায় বুঝি তার সবি।’

শিক্ষক-শিক্ষার্থী অতীত সম্পর্কে কবিতার এ পর্যন্ত ঠিক আছে। শুধু পরের অংশে শিক্ষার্থী বাদশাহ কর্তৃক ভর্ৎসনার শিকার হবে। যা কবি বলেছেনও। দ্বৈরথ এ সম্পর্কের বর্তমানের রূপ বলে এ পর্যন্ত ঠিক থাকলেও শেষ লাইনের শঙ্কাই সত্যি হবে। বাদশাহের সন্তানের দ্বারা এমন কাজ করানোয় শিক্ষকের বিচার হবে। বর্তমান সময়ে হচ্ছেও তাই।
ওই সময় শিক্ষক মানেই ছিল ভিন্ন বিষয়। যেন আরেক জনক। যিনি পারেন না এমন কিছু নাই। তবে তা আধুনিক পরিমণ্ডলের মতো নয়। যা কিছু মন্দ তা ওই সময়ে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীর জন্য দূরে রাখতেন। আর বর্তমানে যা কিছু মন্দ তাই শিক্ষক-শিক্ষার্থী পারস্পরিক ব্যবহার করেন। অতীতে শিক্ষকরা তার বলয়ের সবাইকে সন্তান মনে করতেন। তাদের আচরণেও এমনটা প্রকাশ পেত। শিক্ষার্থীদের সুখে-দুঃখে হাসি-কান্নায় মাখামাখি হতেন তারা। বর্তমানে পারস্পরিক তারা পুঁথিগত পাঠ ভাগাভাগি করেন। মূলটা ছেড়ে সবই করেন। শ্রদ্ধা ও স্নেহের জায়গাটি অনেক সংকুচিত। অদূর ভবিষ্যতে তা কোথায় গিয়ে ঠেকবে ভাবা দুষ্কর।

অতীত খুব বেশি দেখা হয় নি। বেশি হলে নব্বইয়ের গোড়া থেকে দেখছি, উপলব্ধি করছি। তবে, বই-পুস্তক পড়ে শিক্ষকের আগের রূপ কিছুটা জানতে পেরেছি। আর চলমান আধুনিক সময়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর বর্তমান রূপ আঁচ করছি। আর ভবিষ্যৎ ভবিষ্যতেই থাক। ধারণা করার চেষ্টা চলবে।

বর্তমানে শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষক শাসন করলে অভিভাবক বলেন নির্যাতন। শিক্ষকরা অনেকে বিবেককে বিক্রি করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন আর্থিক সম্পর্ক। টাকা দিলে সাজেশন দিব, না দিলে পরীক্ষায় মার্কস কম দিব- এমন নীতিতে শিক্ষকদের দিনাতিপাত। আর শিক্ষক-অভিভাবকদের লাগামাহীন ঘোড়দৌড় খেলায় শিক্ষার্থীরা চ্যাঙদোলা দিয়ে লাফায়। ফলাফল- ‘আই এম জিপিএ ফাইভ’।

অতীত শিক্ষাদান ছিল গৃহকেন্দ্রিক, কালক্রমে এ শিক্ষাদান পদ্ধতি বিকিরণের পথ ধরে উদার অঙ্গনে স্বচ্ছন্দ ও অনুশীলনের সরঞ্জাম কম্পিউটার পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে। এছাড়া স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি ও আদর্শের ছায়াতলে লালিত হচ্ছে অসংখ্য জীবন স্বপ্ন। প্রকৃত মনুষ্যত্বের আলোকে সৎ ও চরিত্রবান জীবন উদ্ভাসিত করুক এই কামনায় সৃষ্টি করা হয়েছে নানা রকমের শিক্ষা বা শিক্ষাঙ্গন। কিন্তু যুগের হাওয়া বদলে এখন অনিয়ম ও উচ্ছৃঙ্খলতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা বৃদ্ধির মূলে রয়েছে আত্মস্বার্থ।

বেশিদিন আগে নয়, এই তো এই শতাব্দীর প্রথম দিকে আমরাও প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস চলাকালীন কিংবা পরবর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে শিক্ষক দেখলে এক অন্যরকম শ্রদ্ধাবোধ অনুভূতি কাজ করতো। শিক্ষকরাও ছাত্র-ছাত্রীদেরকে নিজের সন্তানদের মতো ভালোবাসতেন। পড়ালেখায় একটু দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের নজর থাকত বেশি। এমনকি দুষ্টু-চঞ্চল শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে নানা কৌশলে শাসন করতেন উনারা। কখনো কখনো বাধ্য হয়ে বেত্রাঘাত করতেন। প্রয়োজনে অভিভাবক ডেকে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার ব্যাপারে সজাগ করতেন। অভিভাবকরাও শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাই শিক্ষক-অভিভাবকদের মধ্যে ওই সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্কের কারণে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা ও নৈতিকতার ব্যাপারে সজাগ থাকতো। শিক্ষকরা টিউশনি করতেন তবে সেটা শুধুমাত্র বাণিজ্য মানসিকতার ভিত্তিতে নয়। গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীরা খুব অল্প টাকা মাসিক বেতনে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনাবেতনে শিক্ষকরা পড়াতেন শুধুমাত্র বিবেকের তাড়নায়।

মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ওইসব চিত্রের ঠিক উল্টোপৃষ্ঠে অবস্থান করছি আমরা। শিক্ষকদের আঙিনায় চড়া বেতনে প্রাইভেট পড়ার লাগামহীন ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় ধনীর দুলালরা দোলনায় চড়ছে, মধ্যবিত্তরা প্রতিনিয়ত হোঁচট খাচ্ছে আর গরিব মেধাবীরা ঝরে পড়ছে। সমীকরণ আরেকটা আছে, মধ্যবিত্ত মাঝামাঝি মেধাবীদের আবার নামীদামী শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়াতে চান না। কারণ, সেই শিক্ষার্থীর পেছনে সময় বেশি ব্যয় করতে হবে। কম সময়ে অধিক টাকা উপার্জনের মাধ্যম মেধাবী শিক্ষার্থী। অভিভাবকরাও বেতন বেশি দিতে রাজি তবে শর্ত একটাই জিপিএ ফাইভ চাই..ই..চাই। পরীক্ষার আগে সেই শিক্ষক অনেক মূল্যবান একটা সাজেশন এনে সেই শিক্ষার্থীর হাতে দেন। শিক্ষার্থীদের কাছে বিষয়টা (সাজেশন) সোনার হরিণ পাওয়ার মতো। মধ্যবিত্তরা কষ্ট করে বাচ্চার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে খেয়ে না খেয়ে শিক্ষকদের বেতন জোগাড় করে দেন। আর গরিব পরিবারের সন্তানরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাসের ওপর নির্ভরশীল হলেও সেখানে দেয়া হচ্ছে একটি গরুর দুইটি শিং, দুইটি চোখ, দুইটি কান ও একটি লেজ আছে এমন ধরনের লেকচার। শিক্ষক-অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের এই হ-য-ব-র-ল সম্পর্কের কারণে শিক্ষকদের প্রতি অভিভাবকদের শ্রদ্ধা নেই, শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের সম্মান নেই, শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের আবেগ ও ভালোবাসা নেই। শিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের আবেগঘন ভালোবাসা নেই, শিক্ষকদের অবসরকালীন বিদায়ে শিক্ষার্থীদের চোখে পানি নেই।

সার্টিফিকেট কেন্দ্রিক পড়ালেখায় সবাই জিপিএ ফাইভ চায়। আগেও সবাই ভালো রেজাল্ট পাওয়ার মোহে সাধনা করতো। তবে তখন শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতা করে, পড়ার পেছনে সময় দিয়ে রেজাল্ট ভালো করতো। আর এখন শিক্ষক আর কিছু কোচিংভিত্তিক সাজেশনের ওপর ভর করে রেজাল্ট ভালো করা হচ্ছে। পার্থক্য, আগে শিক্ষার্থীদের মাঝে নীতি-নৈতিকতা বোধ প্রখর ছিলো আর এখন তারা আত্মকেন্দ্রিক চিন্তায় মগ্ন।

একপেশে শিক্ষকদের দোষারোপ করার কোনো সুযোগ নেই। অভিভাবকরা এর জন্য অনেকটাই দায়ী। আগে পড়াশোনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষকদের দেয়া কোনো শাসনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা অভিভাবককে কিছু বলার চিন্তাও করতো না। আর এখন সহনশীল আচরণ থেকে সামান্যতম বিচ্যুতি ঘটলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করে দেন অভিভাবকরা। আর আমরা হুজুগে বাঙালিরা কোন কিছু বুঝার আগেই মানববন্ধনের মতো আন্দোলনের আয়োজন করে ফেলি। সেই শিক্ষক হন সবার কাছে নিন্দিত আর সেই শিক্ষার্থী হয় ক্যাম্পাসের আলোচিত(?)।

এমন সমীকরণে শিক্ষক-অভিভাবক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক সরল থাকার সুযোগই বা কই! মানুষের নৈতিক শিক্ষার শুরু হয় পরিবার থেকে। সেই নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে জীবনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমন্বয় হয় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। বর্তমানে নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় গড়ে উঠছে আমাদের শিক্ষাঙ্গন। এই ব্যবস্থা আমাদের সমাজকে কতদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে জানি না তবে এতটুকু উপলব্ধি করছি, শিক্ষকদের প্রতি মানুষের সম্মানবোধ, আবেগ ও ভালোবাসা কমে যাচ্ছে।- লেখক: সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এএম