শিক্ষক আন্দোলনে শিক্ষায় অস্থিরতা

এমপিওভুক্ত করার দাবিতে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে অনশন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে বাড়ি ফিরেছেন। এখন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকরা অনশন কর্মসূচি পালন করছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছে বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরাম। পুলিশি বাধায় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে না পেরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সামনে অবস্থান নেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা।

প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ এই তিন স্তরের ৯ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীর আন্দোলনে বেসামাল দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। নন-এমপিও শিক্ষকরা এমপিওভুক্তির, আর এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা জাতীয়করণের দাবি করছেন। ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকরা প্রাথমিকের শিক্ষকদের মতো জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলন করছেন। সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সহকারী ও প্রধান শিক্ষকরা বেতন বৈষম্য নিয়ে ক্ষুব্ধ। টাইম স্কেল ও পদোন্নতির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। অন্যদিকে কলেজ শিক্ষকদের ক্যাডার ও নন-ক্যাডার নিয়ে আন্দোলন চলছে।

সরকারের শেষ বছরে বিভিন্ন দাবি আদায়ে রাজপথে নেমেছেন শিক্ষক সমাজ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের শেষ সময়ে শিক্ষক সংগঠনগুলো মাঠে নেমে দাবি আদায়ের চেষ্টা করে। শিক্ষকদের জন্য কিছু জটিলতা সরকারই সৃষ্টি করেছে। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের কিছু দাবি চাঙা হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলেও সরকার দেশের সবচেয়ে বড় এই পেশাজীবী গোষ্ঠীকে ঠিকভাবে সামাল দিতে না পারায় কেউই এখন আর খুশি নয়।

সংযুক্ত ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয়করণ, শিক্ষকদের বেতন স্কেল সরকারি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকদের মতো করাসহ কয়েকটি দাবিতে ওই সব মাদরাসার শিক্ষকরা আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করছেন। বর্তমানে সংযুক্ত ইবতেদায়ি মাদরাসা আছে ৯ হাজার ৩৫৫টি। এগুলোর শিক্ষক সংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার। বাংলাদেশ সংযুক্ত ইবতেদায়ি শিক্ষক সমিতি ফাউন্ডেশনের ডাকে গত বুধবার থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনশন কর্মসূচি পালন করছেন ওই সব শিক্ষক। তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন। পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় এসব মাদরাসার শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। কিন্তু বিনা বেতনে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসায় শিক্ষকতা করছেন তারা। এর মধ্যে ১ হাজার ৫১৯টি মাদরাসার ৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষক সরকার থেকে ভাতা পান। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকরা পান মাসে আড়াই হাজার টাকা ও সহকারী শিক্ষকরা পাচ্ছেন ২ হাজার ৩০০ টাকা।

সমিতির সভাপতি কাজী রুহুল আমিন চৌধুরী বলেন, ৩৩ বছর ধরে অভিভাবকহীন ছিলাম। প্রধানমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেয়ার পর ২০১৬ সালের ১৮ মে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেয়া হয়। মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলে সরকারিকরণের আশ্বাস দেন। জাতীয়করণের জন্য একটি ওয়ার্কিং কমিটিও গঠন করা হয়। কিন্তু হঠাৎ করে এই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, গত ৩৩ বছর ধরে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষক সরকারি বেতন-ভাতা বঞ্চিত রয়েছেন। যারা যৎসামান্য পাচ্ছেন তাও তিন মাস পর পর। নিবন্ধিত প্রাথমিক স্কুলকে জাতীয়করণ করা হলেও ইবতেদায়ি মাদরাসাগুলোকে বঞ্চিত করা হয়েছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা বাড়ি ফিরবেন না।

গতকাল থেকে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছে বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরাম। দেশে মাধ্যমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত ৯৫ শতাংশ শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হয় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। দেশে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ৩৭ হাজার। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারী প্রায় ৫ লাখ। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে সাড়ে ২৬ হাজার। এগুলোর ৪ লাখের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী সরকার থেকে মূল বেতন ও কিছু ভাতা পান। তাদের এমপিওভুক্ত শিক্ষক বলা হয়।

এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রায় সব সংগঠন এখন শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের দাবিতে ধাপে ধাপে আন্দোলন করে আসছে।
প্রবীণ শিক্ষক নেতা মাজহারুল হান্নান বলেন, সরকার যে টাকা দেয় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যে আয় হয়, সেটা মিলিয়ে আর কিছু টাকার সংস্থান হলে জাতীয়করণ করা সম্ভব। সুপরিকল্পিতভাবে শিক্ষাকে জাতীয়করণের দাবি জানান তিনি।

এমপিওভুক্ত করার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে অনশন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে বাড়ি ফিরেছেন স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা। দেশে এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে ৫ হাজার ২৪২টি। এগুলোতে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৭৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার। সর্ব শেষ ২০১০ সালে ১ হাজার ৬২৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছিল। এরপর থেকে এমপিওভুক্তি বন্ধ রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নতুন নীতিমালায় এসব প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হবে। এজন্য হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট উইং।

এ সরকারের আমলে শিক্ষকদের বেশ কিছু সুবিধা দেয়া হয়েছে। প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক স্কুল সরকারি করা হয়েছে। সব শিক্ষকের বেতন সরকারি চাকুরেদের মতো দ্বিগুণ হয়েছে। প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের পদমর্যাদা বেড়েছে। কিন্তু সরকারি প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল নিয়ে বিরোধটি সামনে এসেছে। দেশের ৬৩ হাজার ৬০১টি সরকারি প্রাথমিক স্কুলে প্রায় সোয়া ৩ লাখ শিক্ষক আছেন। ২০১৪ সালের ৯ মার্চ সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণি ঘোষণা করে। কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল করা হয় ১১তম গ্রেডে। আর প্রশিক্ষণবিহীন প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয় ১২তম গ্রেড। অন্যদিকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল হয় ১৪তম গ্রেডে এবং প্রশিক্ষণবিহীন সহকারী শিক্ষকদের স্কেল নির্ধারণ হয় ১৫তম গ্রেডে। তখন থেকেই সহকারী শিক্ষকরা তাদের বেতন স্কেল প্রধান শিক্ষকের এক ধাপ নিচে রাখার দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষকরা বলে আসছেন, তাদের চাকরি দ্বিতীয় শ্রেণি হলেও বেতন স্কেল করা হয়েছে তৃতীয় শ্রেণির। দীর্ঘ আন্দোলনের পর সরকারপ্রধান শিক্ষকদের বেতন গ্রেড এক ধাপ বাড়িয়ে দশম গ্রেড করার উদ্যোগ নেয়। এই খবরে সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে নতুন ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা প্রধান শিক্ষকের চেয়ে এক ধাপ নিচের স্কেলে বেতন নির্ধারণ করার দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আমরণ অনশনে নামেন। তিন দিনের মাথায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার শহীদ মিনারে গিয়ে আমরণ অনশন ভাঙান। কিন্তু সরাসরি দাবি না মানায় ক্ষুব্ধ মন নিয়ে বাড়ি ফেরেন সহকারী শিক্ষকরা। এজন্য তারা দাবি করে আসছেন, তাদের বেতন স্কেল এক ধাপ বাড়িয়ে দশম গ্রেড করতে হবে। প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেড করার উদ্যোগ আপাতত স্থগিত রাখা হবে। এতে প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে প্রতিটি স্কুলে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে সহকারী শিক্ষকদের মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

টাইম স্কেল ও পদোন্নতির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকরা। বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির ব্যানারে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেয়াসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করছেন তারা। সারাদেশে ৩৩৬টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১০ হাজার শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও আছেন প্রায় ৮ হাজার।

এদিকে কলেজ শিক্ষকদের ক্যাডার ও নন-ক্যাডার নিয়ে আন্দোলনে নেমেছে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তারা। দেশে বর্তমানে ৩৩৫টি সরকারি কলেজ আছে। যেসব উপজেলায় সরকারি কলেজ নেই, সেগুলোতে একটি করে বেসরকারি কলেজকে জাতীয়করণ করছে সরকার। এতে নতুন করে আরো ২৮৩টি বেসরকারি কলেজ জাতীয়করণের জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। কিন্তু আগে থেকে নীতিমালা ছাড়াই এতগুলো বেসরকারি কলেজকে জাতীয়করণ করায় সংকট তৈরি হয়েছে। অভিযোগ আছে, ভালো ও পুরনো কলেজ বাদ দিয়ে যেনতেন কিছু কলেজ জাতীয়করণের জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনও হয়েছে।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সভাপতি আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার বলেন, জাতীয়করণ হওয়া কলেজের শিক্ষকদের ক্যাডারভুক্ত করার উদ্যোগ তারা মানবেন না। তাদের নন-ক্যাডার রাখতে হবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস