শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কি এ যুগে অচল?

গুরু দ্রোণাচার্যকে আঙুল কেটে দক্ষিণা দিয়েছিলেন একলব্য। গুরুভক্তির এরকম উদাহরণ এ যুগে শুধু অচলই নয়, কল্পকথাকেও হার মানায়। কারণ গুরুর প্রতি, শিক্ষকদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ কমছে। সেই কমার হার যে কতটা নিম্নগামী তার একটি উদাহরণ উঠে এসেছে গত সপ্তাহে সংবাদমাধ্যমে। ‘বিদ্যালয়ের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ: শিক্ষায় প্রাণের উজ্জীবন’ শীর্ষক এডুকেশন ওয়াচ-২০১৭-এর প্রতিবেদন প্রকাশ হয় সংবাদপত্রে। প্রতিবেদনের যে তথ্যটি চমকে ওঠার মতো তা হলো- শিক্ষকদের আদর্শ মনে করে না অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী। গণসাক্ষরতা অভিযানের এই প্রতিবেদন শুধু যে চমকেই ওঠায় তাই নয়, বরং বেদনাবিদ্ধও করে। শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীর যে শ্রদ্ধাবোধের কথা আমরা লালন করে এসেছি, এতকাল শুনে এসেছি তা সত্যিই এ যুগে অচল হয়ে পড়ছে? দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে ১ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থী, ৫৭৬ শিক্ষক, ১ হাজার ২৮০ অভিভাবক ও স্কুল কমিটির সদস্যদের মতামত নেয়া হয় জরিপে। ‘ছাত্ররা শিক্ষকদের নৈতিকতা ও সততার উদাহরণ হিসেবে দেখতে চায়, কিন্তু বর্তমান সমাজে আশা করা যায় না’-শীর্ষক জরিপের ফলে প্রাথমিকের ৫০ শতাংশ, মাধ্যমিকের ৬৪ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই বিষয়টির সঙ্গে একমত পোষণ করেছে।

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয় ৬৫ শতাংশ অভিভাবক এবং প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এই মতের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। দেশে বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় দশ লাখেরও বেশি শিক্ষক রয়েছেন। শিক্ষাকে যেমন জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়, তেমনি এই মেরুদণ্ডকে শক্ত সামর্থ্য করার দায়িত্ব শিক্ষকদের। অথচ শিক্ষকদের ওপর যদি শিক্ষার্থীর শ্রদ্ধাবোধ না থাকে, শিক্ষককে আদর্শ হিসেবে মেনে নেয়া না যায়, শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর মনে প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন, তাহলে তা আমাদের জন্য সত্যিকার অর্থেই অশনি সংকেত।

ব্যক্তি অর্থ মানুষ। আর ব্যক্তির আচরণ যখন তার আপন বৈশিষ্ট্য এবং কাজের মধ্য দিয়ে অন্য ব্যক্তি বা সমাজকে প্রভাবিত করে তখন তা হয়ে ওঠে ওই ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব। শিশু বেড়ে ওঠে যে পরিবেশে, সেখানে ঘরে বাবা-মায়ের পরেই বেশি সময় থাকে বিদ্যালয়ে। তাই স্বাভাবিকভাবেই শিশুর ওপর শিক্ষকের প্রভাব বেশি। বাবা-মায়ের পরেই শিক্ষককে সে তার মনে স্থান দেয়। বাবা-মাকে যেমন করে সে অনুকরণ অনুসরণ করতে থাকে, তেমনিভাবে শিক্ষককেও। এক্ষেত্রে সেই শিক্ষকই শিশুর কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে, যে তার আপন বৈশিষ্ট্য এবং কাজ দিয়ে শিশুর মন জয় করে নেয়। এক্ষেত্রে শিক্ষকের পাঠদানের কৌশল যেমন কাজ করে, তার জানার পরিধি যেমন কাজ করে তেমনি শিশুর প্রতি তার মমত্ববোধও একটি মূল্যবান বস্তু হিসেবে উপস্থিত হয়।

কারণ মমতা দিয়েই আমরা আমাদের চারপাশের প্রিয় পরিবেশকে ঘিরে রাখি। ফলে শিশু তার পরিবেশের প্রিয় অংশে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষককে রাখে। শিক্ষককেই আদর্শ হিসেবে দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠে। আর সেই বেড়ে ওঠার পথে মেধা ও মননের মধ্য দিয়ে নিজের স্বাতন্ত্র্যতাকেও উপলব্ধি করতে শেখে। তবে এক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখেন শিক্ষক। অথচ সেই শিক্ষক সম্পর্কে এখন শিক্ষার্থীর মনে নেতিবাচক ধারণা কাজ করছে। তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ উঠে যাচ্ছে। কেন? প্রতিনিয়ত আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে। শিক্ষার্র্থী বাড়ছে, শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) জাতীয় শিক্ষা জরিপ (পোস্ট-প্রাইমারি) ১৯৯৯-এর প্রাথমিক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ১৯৮৩-১৯৯৯ মাত্র এই ১৬ বছরে দেশে কলেজের সংখ্যা বেড়েছে ২৬৯%। ১৯৮৩ সালে যেখানে সারাদেশে কলেজের সংখ্যা ছিল ৫৯৬টি, ১৯৯৩ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৯৮৭টিতে আর ১৯৯৯ সালে সেই সংখ্যা এসে থেমেছে ২১৯৮টিতে। এই বৃদ্ধির ধারা এখনো অব্যাহত। এ তো শুধু কলেজের সংখ্যা, একইভাবে বাড়ছে প্রাথমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। বেড়েছে সরকারি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও।

গুরুর প্রতি ভক্তির যেসব গল্প আমরা ছেলেবেলায় শুনে এসেছি, তার কিছুটা আমরাও লালন করেছি, করি। আমাদের ছেলেবেলাতেও সেই পরিবেশই দেখেছি। আমার বাবা, আমার গুরুজনদেরও দেখেছি রাস্তায় তাদের শিক্ষকের সঙ্গে দেখা হলে শ্রদ্ধায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়তে। আজ আর সেই পরিবেশ নেই, নেই যে তার উদাহরণ উঠে এসেছে জরিপের ফলেই। এডুকেশন ওয়াচ-২০১৭ এর প্রতিবেদনটি অধিকাংশ সংবামাধ্যমেই যথার্থ গুরুত্ব পায়নি। মর্যাদার সঙ্গে ছাপা হয়নি। তার কারণ হয়তো এই যে, আমরা এটাকে খুব সাধারণ বলেই মনে করছি। কিন্তু যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এই অপ্রত্যাশিত এবং ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে তার যথাযথ মূল্যায়ন জরুরি। আর সেটা হতে হবে বাস্তববুদ্ধির আলোতেই।

অন্যথায় শিক্ষককে যে আসনে বসানো হয়েছিল, তার যে সেই আসনচ্যুতি ঘটেছে, সেই বিপর্যয় আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর এসে পড়বে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের ওপর শিক্ষার্থীদের হামলার ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। দাবি আদায়ের নামে অন্যায় ও অন্যায্যভাবে শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানকে অসম্মান করা হয়েছে। তার পেছনের কারণগুলো আমরা কখনোই খতিয়ে দেখিনি। তা আমরা বিবেচনায় আনিনি। যদি শুরুতেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা বিষয়গুলো অন্ধকার গোপন সুড়ঙ্গে না রেখে আলোচনায় নিয়ে আসত তাহলে আজকে শিক্ষকদের প্রতি এই অবমাননাকর মন্তব্য শিক্ষার্থীদের থেকে আসত না।
লেখক: সাংবাদিক, কবি

মানবকণ্ঠ/এএএম

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.