শিক্ষকের উন্নত জীবন, শিক্ষার উন্নতি

মাস শেষে খালি পকেট আর মুখে হাসি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষটির নামই মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্ত আর মাধ্যমিক শব্দ দুটি যেন ওতপ্রোতভাবেই জড়ানো। নিজেদের পাওয়া না পাওয়া সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত মেধাবী প্রজন্ম তৈরির চেষ্টায় মগ্ন সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকবৃন্দ। তাই দ্বিধাহীনভাবেই বলতে পারি, আমাদের দেশের সেরা বিদ্যালয় এবং সেরা শিক্ষার্থীগুলো সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকেই আসে। আমি এ অর্থেই সেরা বলি, শুধু ভালো ফলাফল নয়, সার্বিক দিক বিবেচনা করেই। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের যেটুকু সুযোগ-সুবিধা নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা এই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষক হিসেবে একজন বাংলাদেশি উচ্চতর ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও কঠিন যুদ্ধে উত্তীর্ণ হয়ে তবেই পান প্রবেশাধিকার। এরপরও তাদেরকে নিয়মিত নানাবিধ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেকে সময়োপযোগী করে তুলতে হয়। শ্রেণিকক্ষ ছাড়াও সরকারি নানাবিধ দায়িত্ব তাদের পালন করতে হয়। এসবও হাসিমুখে মাথা পেতে নেন তারা এবং অত্যন্ত দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে সম্পন্ন করেন। এত কিছুর পরেও কোনো শিক্ষক দুর্নীতিগ্রস্ত এমন প্রমাণ পাওয়া ভার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু দুর্নীতি প্রকাশিত হচ্ছে। আর সেটা হলো প্রাইভেট কোচিং। মহামান্য আদালত কোচিং বাণিজ্যের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন। তবে কোনটা প্রাইভেট কোচিং বা কোনটা কোচিং বাণিজ্য তা সুস্পষ্ট না হলেও এ নিয়ে জনমনে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতামত পত্রিকার পাতায় বা অন্যান্য যোগাযোগমাধ্যমে খুব দেখা যাচ্ছে।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীও এ বিষয়ে তার অভিমত দিয়েছেন। তিনি শিক্ষা পরিবারের অভিভাবক, তিনি যে করেই হোক তার পরিবারের সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও উন্নতি ভাববেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন শিক্ষক নানাবিধ কারণে প্রাইভেট পড়াতে বাধ্য হন। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের চাহিদা। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বিভিন্ন বোর্ড পরীক্ষা, পার্শ্ববর্তী কলেজের পরীক্ষা কেন্দ্র, রমজান মাস, ঈদুল ফিতর/ঈদুল আযহা, পূজা, গ্রীষ্মের/শীতের ছুটি এমন বিবিধ কারণে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকে। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর পরিবার তখন বাসায় ব্যক্তিগতভাবে ১০/১৫ হাজার টাকা খরচ করে গৃহশিক্ষক এনে পড়াতে অক্ষম। তখন তারা কয়েকজন মিলে স্যারের বাসায় গিয়ে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন। অনেক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধানগণ সরকারি পরিপত্র অমান্য করে বিষয় শিক্ষকদের তার নিজ বিষয়ের ক্লাস দেন না। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে বিষয় শিক্ষকের অভাববোধ ঠিকই বুঝতে পারে। তখন শিক্ষার্থীরা বিষয় শিক্ষক খুঁজে বের করে তার বাসায় পড়ানোর অনুরোধ করেন। প্রাইভেট পড়ানোর সর্বশেষ কারণ হতে পারে শিক্ষকের আর্থিক উন্নতি। সরকার বর্তমানে সব সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দ্বিগুণ করেছেন। যদিও তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে গেছে মানুষের জীবনযাত্রার মান। নিত্যব্যবহার্য প্রতিটি জিনিসই ক্রয়সীমার বাইরে। এছাড়াও সন্তানদের উচ্চ-শিক্ষা, বিয়ে, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নিজেদের শারীরিক অসুস্থতাও মেটাতে হয় একই আয়ের ভেতর দিয়ে। একজন শিক্ষকেরও অধিকার আছে প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য কর্মচারীর মতো সচ্ছল জীবনযাপন করার। বেশিরভাগ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সময়-সীমা ৫/৬ ঘণ্টা। বাকি সময়টুকু তারা শিক্ষার্থীদের পেছনে ব্যয় করার মাধ্যমে কিছু আর্থিক লাভবানও হন। এটাই সন্তুষ্টি। কিন্তু খোঁজ নিলেই জানা যাবে সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকেরা সম্মাীন খুব কম পরিমাণে নেন, আমার অনেক সহকর্মীকে দেখেছি ১৫ জন ছাত্র পড়ালে ৩/৪ জন তারা বিনা বেতনেই পড়ান। যেখানে বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা নেন দ্বিগুণ, কোথাও তিন গুণ।

এ বিষয়গুলো আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাদের অনেকের সঙ্গেই কথা বলে জেনেছি মনের আনন্দে কেউ পড়ায় না। একেবারে দায়ে পড়েই তারা প্রাইভেট পড়ায়। এজন্য তাদের পারিবারিক ও সামজিক জীবন ব্যাহত হয়। আমি হলফ করে বলতে পারি আর যাই হোক শিক্ষকেরা লোভী বা দুর্নীতিবাজ নন। এখনো তাদের পরিবারের জন্য নিজস্ব মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করতে পেনশনের টাকার ওপরই নির্ভর করে থাকতে হয়। তাদের কোনো সুযোগই নেই কোনো অসদুপায়ে রাতা রাতি কোটিপতি হয়ে যাওয়া বা ফ্ল্যাট, বাড়ির মালিক হয়ে যাওয়া। যেখানে আমরা প্রায় প্রতিদিনই পত্রিকা খুললেই দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন সরকারি অফিসের পিয়ন, অফিস সহকারী শত ছাড়িয়ে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন। অথচ দুদক পড়ে আছে মাধ্যমিকের শিক্ষকদের নিয়ে। একজন সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষক আজীবন অতি সাধারণ জীবনযাপন করবেন এটাই যেন তাদের নিয়তি হয়ে গেছে। অথচ উন্নত বিশ্বে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাইতেও বেশি সম্মানজনক চাকরি মাধ্যমিক এবং নিম্ন মাধ্যমিকের। তাদের সুযোগ-সুবিধাও সর্বোচ্চ। উন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া সহজ কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষক হওয়া কঠিন। আর আমাদের দেশে অতিরিক্ত সুযোগসুবিধা তো দূরের কথা সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকেরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকেই বঞ্চিত বছরের পর বছর। পাওয়া না পাওয়া নিয়ে সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকদের মধ্যে অভিমান, অভিযোগ বা কষ্টের শেষ নেই। প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীই তাদের চাকরির যুগপূর্তিতে টাইমস্কেল পান। কিন্তু আমাদের সরকারি মাধ্যমিক পরিবার এখনো বকেয়া টাইমস্কেল বঞ্চিত হয়ে হাহাকার করছেন। ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত তারা বছরের পর বছর। টাইমস্কেলের সঙ্গে জুনিয়র শিক্ষকদের সিলেকশন গ্রেড প্রাপ্তিতেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

অতিরিক্ত সুবিধা তো দূরের কথা নিজের প্রাপ্য বেতনটা যদি কম পান সেটা কোন চাকরিজীবী মেনে নেবে সেটা আমার জানা নেই। তবে সরকারি মাধ্যমিকের একজন শিক্ষক ২৫ বছর চাকরি করার পরও তিনি বিনা পদন্নোতিতে একই পদে চাকরিকাল অতিবাহিত করেন। একই পদে থেকে তাদের যেতে হয় অবসরে। অথচ অন্য সেক্টরে ২৫ বছর চাকরিতে একজন সরকারি কর্মকর্তার প্রাপ্তির খাতায় অনেক কিছুই লেখা হয়ে যায়। প্রাইভেট কোচিং যদি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর হয় তবে অবশ্যই তা একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়াই উচিত। তাই প্রাইভেট কোচিং বন্ধ করার কঠিন আইন জারি করা প্রয়োজন। আর এর বিকল্প হিসেবে শিক্ষকদের কিছু সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা জরুরি। সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকদের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় আবাসনের ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের সন্তানদের যে কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, তাদের জন্য রেশনের ব্যবস্থা করতে হবে, আলাদা হাসপাতাল নির্মাণ করে বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে, প্রয়োজনে দেশের বাইরেও চিকিৎসার জন্য পাঠানোর ব্যয়ভারও বহন করতে হবে, সরকারি খরচে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং অবসরকালীন সময়ে তাদের জন্য বিনোদন ও সমাজ সেবামূলক বিভিন্ন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই মানুষ গড়ার কারিগরগুলো যেন সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে।

কথায় আছে, ‘পেটে খেলে পিঠে সয়।’ একজন মানুষের জীবনে এর বেশি চাহিদা থাকে না, থাকতে নেইও। এসব সরকারি সুযোগ বৃদ্ধি পেলে একজন শিক্ষক তার অবসর সময়ে প্রচুর পড়াশোনা করবেন এবং শিক্ষা নিয়ে গবেষণা করবেন। সৃজনশীল চিন্তায় নিজেকে মগ্ন রাখতে সক্ষম হবেন। আমি আবারো বলছি, সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকেরা অত্যন্ত মেধাবী। তাদের মাঝে যে সৃষ্টিশীলতা আছে তা বাঁচিয়ে রাখতে তাদের মাথার ওপর আকাশটাকে উন্মুক্ত করতে হবে। উন্নত দেশের মতো সর্বোচ্চ মর্যাদাকর পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে ঘোষণা করে শিক্ষক এবং তাদের পরিবারের দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। আর এমনটা হলেই মেধাবীরা এ পেশায় আসা সম্মানের মনে করবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষা গুরুর সর্বোচ্চ মর্যাদার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়েও নিজের শিক্ষকের সঙ্গে লাল-গালিচায় এক সঙ্গে হাঁটেননি এমনকি তার শিক্ষকের কাঁধের চাদরটি পড়ে যেতে দেখে পরম মমতায়, ভালোবাসায় গায়ে জড়িয়ে দিয়েছেন। একজন শিক্ষকের জীবনে সর্বোচ্চ প্রাপ্তি এটাই। সরকারি মাধ্যমিক পরিবারের শিক্ষকেরাও আশায় বুক বেঁধে আছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ২০১২ সালে ঘোষিত শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির সফল বাস্তবায়ন। সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকেরা আশায় বুক বেঁধে আছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি নির্দেশনার জন্য। সরকারি মাধ্যমিকের প্রতিটি শিক্ষক বিশ্বাস করেন তাদের পেশাগত যে কোনো সমস্যা সমাধান করে সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা একমাত্র মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রীই দেবেন।

– লেখক : সহঃ শিক্ষক, মোহাম্মদপুর কমার্শিয়াল ইনস্টিটিউট সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়