শিক্ষকদের জন্য সুখবর আসছে

শিক্ষকদের জন্য সুখবর আসছে

বছরজুড়ে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তর দাবি নিয়ে রাজপথে ছিলেন শিক্ষকরা। এ ছাড়া বেতনের ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ সত্ত্বেও অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের বাজেটে খাত উল্লেখ না করলেও নন-এমপিও ও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ততে ৫০০ কোটি টাকা এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি সরকারি চাকরিজীবীদের মতো বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতা বাবদ ৫৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে গতকাল শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, বাজেটে আলাদাভাবে উল্লেখ না থাকলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে এটা কোনো বাধা হবে না। বাজেট থোক বরাদ্দ রয়েছে। এমপিওভুক্তর ব্যাপারে সরকার কাজ করছে।

বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার এমপিওভুক্ত (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) ছয় বছর বন্ধ রয়েছে। এমপিরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার তাগিদ দিচ্ছেন। এ নিয়ে কয়েক দফা শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জাতীয় সংসদে এমপিদের তোপের মুখেও পড়েছেন। এমপিরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার তালিকা দেয়ার পরও তা না হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। সারাদেশে এমপিদের চাপ এবং আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে এমনটি ভাবা হচ্ছিল। তবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তর জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি। এনিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। এমপিওভুক্তর দাবিতে শিক্ষক-কর্মচারীরা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে চেয়েছিল। কিন্তু পুলিশি বাধায় নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের রোববারের ওই কর্মসূচি পণ্ড হয়ে যায়।

২০১০ সালে সর্বশেষ ১ হাজার ৬২৪টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছিল। ২০১১ সালে ১০০০ স্কুল-মাদরাসা এমপিওভুক্ত করার ঘোষণা দেয়া হলেও তা করা হয়নি। নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত বন্ধ রয়েছে ২০১১ সাল থেকে। এতে নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ভীষণ কষ্টে দিন কাটছে। এমপিওভুক্তর দাবিতে অন্তত ২৫ বার আন্দোলন হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে আশ্বাসও মিলেছে। কিন্তু এমপিওভুক্ত করা হয়নি।

আগামী ৩০ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পাস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন বলেই বাজেটে এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহবার হোসাইন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, শিক্ষকদের জন্য সুখবর আছে। তবে একটু অপেক্ষা করতে হবে। বাজেটে সুস্পষ্ট ঘোষণা না থাকার বিষয়ে সচিব বলেন, সব কিছু বাজেটে থাকবে বিষয়টি এমন নয়। এটি হয়তো প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বরাদ্দ থেকে ঘোষণা দিতে পারেন। এর জন্য আন্দোলন নয়, বাজেট পাস না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জন্য ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বরাদ্দ থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টে দিতে ৪০০ কোটি টাকা, বৈশাখী ভাতার জন্য ১৮৬ কোটি টাকা এবং নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হবে। সরকারের রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে প্রস্তাবিত বাজেটে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনী বছরে শিক্ষকদের জন্য উপহার হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিবেন। তাই প্রস্তাবিত বাজেটে এ তিনটি খাতের কথা অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেননি। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরে জাতীয় সংসদের আসন অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হবে। সেক্ষেত্রে আসন প্রতি ৩টি করে মোট ৯০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

দেশে এখন এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে এক রকম বিনা বেতনে চাকরি করছেন কয়েক লাখ শিক্ষক-কর্মচারী। বর্তমানে দেশে ২৭ হাজার এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক রয়েছেন ৩ লাখ ৫৭ হাজার ২৮৮ জন এবং কর্মচারী রয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৩৭৫ জন। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্কুল ১৬ হাজার ১১৮টি, কলেজ ২৩৭০টি এবং মাদরাসা রয়েছে ৭ হাজার ৫৯৭টি। অভিযোগ আছে, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৩ হাজারের বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অপ্রয়োজনীয়। শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই কম। পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলও অত্যন্ত হতাশাব্যাঞ্জক। তারপরও এমপিওভুক্ত হওয়ার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের পেছনে প্রতি মাসে সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে।

অন্যদিকে এমপিওভুক্ত হওয়ার জন্য যেসব শর্ত পূরণ করা উচিত তার সব থাকা সত্ত্বেও সাত হাজার স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা এমপিওভুক্ত হতে পারেনি। রাজনৈতিক বিবেচনা, স্থানীয় এমপির সুপারিশ ছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সংখ্যা, অবস্থানগত দিক, পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বিবেচনায় আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমপিওভুক্তর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় অনেক পুরনো প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘদিন এমপিওবঞ্চিত থাকছে। দলীয় প্রভাব কিংবা অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র সাইন বোর্ডধারী প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। বহু পুরনো ও যোগ্য প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ছে। এতে এমপিও খাতে কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এসএস