শহীদ রুমী: এক আত্মত্যাগী তরুণের প্রতিকৃতি

মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির কাছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের পরিচয় ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের এবং ১৯৯২ সালে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আহ্বায়িকা ও নেত্রীর বদৌলতে তরুণ প্রজšে§র ‘আম্মা’ হিসেবে। যুগ হতে যুগান্তরে এবং প্রজš§ হতে প্রজš§ান্তরে সবার শ্রদ্ধার ‘আম্মা’ বাস্তব জীবনে জš§দাত্রী ছিলেন দু’পুত্র সন্তানের। তার জ্যেষ্ঠ ছেলে রুমী ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে মাকে অলংকৃত করে ’শহীদ জননী’ পদবি দিয়ে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেপথ্য নায়ক শরীফ ইমাম এবং শহীদ জননী জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ সন্তান রুমীর জš§ ১৯৫১ সালের ২৯ মার্চ। শিশু রুমীকে ঘিরে ছিল জাহানারা ইমামের অনেক স্বপ্ন যার প্রতিফলন তিনি দেখতে চেয়েছিলেন নামকরণের মধ্য দিয়ে। ছেলে তার শুধু কবি জালালুদ্দিন রুমীর মতো জ্ঞানী ও দার্শনিকই হবে না, মানুষের দুঃখ দুর্দশা নিরাময় করবেÑ এই আশায় ডাক নাম রেখেছিলেন রুমী আর পোশাকি নাম শাফী অর্থাৎ যে নিরাময় করে। রুমী লেখাপড়া, খেলাধুলা, আদব-কায়দা সবদিক দিয়েই চৌকস হয়ে গড়ে উঠছিল। ছোটবেলা থেকেই ছিল তার বই পড়ার অভ্যাস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ও আন্দোলনের ইতিহাস রুমী ছোটবেলা থেকেই আগ্রহ সহকারে পড়তো। রাজনীতি সচেতন বাবা-মায়ের প্রভাবে ছোটবেলা থেকেই রুমীর মনে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, স্বাধীনতা আকাক্সক্ষা-বিষয়গুলো গেঁথে গিয়েছিল। বাবা-মায়ের সুযোগ্য পরিচালনা এবং সঠিক নির্দেশনায় রুমী হয়ে উঠে স্পষ্টভাষী, সাহসী এবং দৃঢ়চিত্তের অধিকারীÑ পরিণত হয় তারুণ্যের প্রতীকে। উল্লেখ্য, মেধাবী ছাত্র রুমী স্টার মার্কস নিয়ে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল এবং আমেরিকার ওষষরহড়রং ওহংঃরঃঁঃব ড়ভ ঞবপযহড়ষড়মু (ওওঞ) এ তাঁর ভর্তি সম্পন্ন হয়। ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ছিল সেপ্টেম্বর ’৭১ এ। কিন্তু বিধাতার লিখন ছিল অন্যকিছু। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আকস্মিক আক্রমণে ঘুমন্ত, নিরীহ এবং নিরস্ত্র জনগণ হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। দেশের এই চরম সংকটকালে রুমী অংশ নেয় মুক্তিযুদ্ধে। বাবা-মার সম্মতিক্রমে রুমী ১৪ জুন প্রশিক্ষণের জন্য মেলাঘরের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করে এবং আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে অন্যান্য গেরিলা যোদ্ধাদের সঙ্গে ঢাকায় প্রবেশ করে গেরিলা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের ২৫ আগস্ট রুমী অন্যান্য গেরিলাসহ ধানমন্ডির ১৮ নম্বরে দুর্ধর্ষ গেরিলা অপারেশন সম্পন্ন করে। এই অপারেশনে কিছুসংখ্যক পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। অপারেশন শেষে পলায়নকালে পাক-আর্মিদের একটি জিপ তাদের গাড়িকে অনুসরণ করলে রুমী তার স্টেনগানের বাঁট দিয়ে পেছনের কাচ ভেঙে ফায়ার করলে চালক গুলিবিদ্ধ হয় ফলে জিপটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। রুমীর প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের কারণে সেদিন গেরিলা যোদ্ধাদের জীবন রক্ষা পায়। এ ঘটনার চারদিন পর ২৯ আগস্ট ক্র্যাক প্লাটুনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গেরিলাযোদ্ধা পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়ে।
রুমীকে আনুমানিক রাত ১২টার দিকে তার বাসভবন হতে বাবা, ছোট ভাই, বন্ধু এবং চাচাতো ভাইসহ পাকবাহিনী ধরে নিয়ে যায়। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে রুমী তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কোনো কিছু স্বীকার করতে নিষেধ করে দেয় এবং সব দায়ভার নিজের ওপর নেয়। পরে বিষয়টি জানতে পেরে ছেলের জন্য হাহাকার এবং দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মা জাহানারা ইমাম রুমীর বইয়ের আলমারি খুলে হেনরি এলেগের ’জিজ্ঞাসা’ বইটি চোখের সামনে মেলে ধরেন যেটি রুমী তাকে কিছুদিন আগে পড়তে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘আম্মা, যার ওপর টর্চার করা হয়, খানিকক্ষণ পরে সে কিন্তু আর কিছু ফিল করে না। পরে যারা শোনে বা পড়ে তারাই বেশি ভয় পায়।’ রুমী আরো বলেছিল শত্রুর হাতে ধরা পড়ার পর কি কি পন্থায় টর্চার সহনীয় করে মুখ বন্ধ রাখা যায়। রুমী তার নিজস্ব লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত বই হতে প্রাপ্ত জ্ঞানের আলোকে পূর্ব হতেই মানসিকভাবে নিজেকে তিল তিল করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গড়ে নিয়েছিল। গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী মাত্র বিশ বছর বয়সী রুমী স্বল্প সময়ের মধ্যেই অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার আত্মোৎসর্গকারী তরুণের ন্যায় দেশবাসীকে পাকিস্তানি হায়েনাদের কবল থেকে মুক্ত করে দিয়ে যায়। শহীদ রুমী বাঙালি তরুণ সমাজের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে যুগ হতে যুগান্তরে। তার ৬৬তম জš§বার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আবু ইউছুফ