শহীদ বদিউল আলম: এক সূর্যসন্তানের অন্তর্ধান

১৯৭১-এর ২৫ মার্চের সেই বিভীষিকাময় রাতের পর বাঙালি তরুণসমাজে সংগ্রামের প্রতিবাদী চেতনা জেগে উঠেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকবর্গের লেলিয়ে দেয়া পাকি-আর্মির বর্বরতম ও নির্মম গণহত্যার প্রতিবাদে সশস্ত্র সংগ্রামে জড়িয়ে পড়া ছাড়া বাঙালিদের উপায় ছিল না।

চিরচেনা বাঙালি মুখচ্ছবির তরুণ বদিউল আলম ছিলেন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম গেরিলা দলের একজন। শুধু অদম্য দেশপ্রেম আর বুকভরা সাহসকে পুঁজি করে বদিউল আলম, আশফাকুস সামাদ, শহীদুল্লাহ খান এবং মাসুদ উমর- যারা সবাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য অস্ত্র জোগাড় করতে ঢাকা ত্যাগ করেন। প্রক্রিয়াটি শুরু করেন বদি যিনি পরবর্তীতে ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলাযোদ্ধা হিসেবে একাত্তরের আগস্টে ঢাকায় পরিচালিত একাধিক অপারেশনে দুর্ধর্ষ সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন।

বদিউল আলমের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জুন, ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত গফরগাঁও উপজেলার শিলাসী গ্রামে। পিতা আব্দুল বারী এবং মাতা রওশন আরা খানম। জন্মের পর তাঁর নানা সালাম সাহেব নাতির নাম রেখেছিলেন তপন অর্থাৎ সূর্য। নানার দেয়া নামের যথার্থতা প্রমাণ করে বাস্তবিকই তিনি জীবন সায়াহ্নে এদেশের একজন সূর্যসন্তানে পরিণত হয়েছিলেন। সূর্যের মতোই ছিল তাঁর তেজস্বিতা। তীক্ষè মেধা এবং অসাধারণ স্মরণশক্তির অধিকারী বদিউল আলম ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ হতে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন।

তিনি ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্থনীতিতে (সম্মান) এবং দেশের ক্রমবর্ধমান জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে পরিবারের সম্মতিক্রমে অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পাস করেন ১৯৭০ সালের শেষের দিকে ঢাকা ফিরে আসেন। আধুনিক ও প্রগতিশীল চিন্তাধারার প্রতিভাবান লেখক ও মনীষীদের লেখা ও মতামতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। কিন্তু ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের কালরাত্রির পর লেখক বদিউল আলমের জীবনের মোড় পাল্টে যায়, জন্ম নেয় মুক্তি সংগ্রামী বদি।

বাবা আবদুল আলীর সুযোগ্য পরিচালনায় ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে বই পড়ার তীব্র নেশা গড়ে ওঠে। স্কুলজীবন থেকেই রিডার্স ডাইজেস্টের নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন। স্কুলজীবনে বইয়ের লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়ার লোভে অনেকসময় সহপাঠীদের বই কিনে দিতেন, তাদের সঙ্গে বই বিনিময় করে পড়তেন। ইংরেজি ভাষায় ছিল তাঁর অসাধারণ দখল। করাচি বিশ্ববিদ্যালয় হতে এম.এ পরীক্ষা দিয়ে আসার পর বায়তুল মোকাররম, নিউ মার্কেট থেকে তাঁর পছন্দের বই কিনে নিয়ে আসতেন। মার্কস-অ্যাঙ্গেলস, লেনিন, হ্যাক্সলি, সকোলভ, সমারসেট মম, উইল ডুরান্ট। এছাড়াও ছিল শেক্সপিয়ারের রচনা সমগ্র। এই সময় প্রায় প্রতিদিন তিনি একটা করে নতুন বই পড়ে শেষ করতেন। তাঁর এমনই বই এর নেশা ছিল যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দুর্ধর্ষ অপারেশন সেরে এসে আবারো নিমগ্ন হয়ে পড়তেন বইয়ের মাঝে।

ছোটবেলা থেকেই অন্যায় দেখলে রুখে দাঁড়াতেন। স্কুলে পড়ার সময় সহপাঠীদের মাঝে ঝগড়া হলে অন্য ছেলেদের মতো দূর থেকে না দেখে দু’দলের মধ্যে ঝগড়া মিটিয়ে দিতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনেও বদি সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। নিজের জীবন বিপন্ন করেও অনেক অসহায় নিরপরাধ ছেলেকে বাঁচিয়েছিলেন। শুধু সাহসের জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে সব রাজনৈতিক দলের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। নিপীড়ন ও নিপীড়কের বিরুদ্ধে সর্বদাই তিনি ছিলেন সোচ্চার যেখানে অনেকেই নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকতেন। ঠিক এ কারণেই যুদ্ধে যাওয়ার প্রাক্কালে মাকে বলেছিলেন, ‘আম্মা, পাকিস্তানি বাহিনী অন্যায় করছে। আমাদের ওপর অত্যাচার করছে। এই অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতেই হবে।’

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ক্র্যাক প্লাটুনের অবদান অবিস্মরণীয়। বদি ছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনখ্যাত গেরিলা বাহিনীর অন্যতম মেধাবী এবং দুঃসাহসী যোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়াই বদি যে দুঃসাহসিক অপারেশনগুলো করেছিলেন তাতে সহজেই অনুমেয় যে অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং অসীম সাহসিকতার কারণেই তাঁর পক্ষে উন্নতমানের প্রশিক্ষণ আয়ত্ত করা সম্ভব হয়েছিল। একাত্তরের আগস্টে ঢাকা শহরে অনেক দুর্ধর্ষ গেরিলা আক্রমণ পরিচালিত হয় ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যদের দ্বারা। এর মধ্যে ৮ আগস্ট তারিখে পরিচালিত অসাধারণ সফল অভিযান অপারেশন ফার্মগেটের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র ৯২ সেকেন্ড যা পাকিস্তানি বাহিনীর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

এই অপারেশন পরিচালনায় সহযোদ্ধাদের একমত করতে বদি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯ আগস্ট তারিখে ক্র্যাক প্লাটুনের বেশ কয়েকজন গেরিলা দুটি পৃথক নৌকায় সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন রেকি করতে গেলে প্রথম নৌকাটি একটি মিলিটারি ভর্তি নৌকার সম্মুখীন হয়ে পড়ে। এ সময় কাজী কামাল এবং জুয়েল তাদের স্টেনগান নৌকার পাটাতনে লুকিয়ে রেখেছিলেন কিন্তু বদি তা না রেখে কোলের মধ্যে রেখেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্টেনগান তুলে আর্মিদের নৌকার ওপর ব্রাশফায়ার করেন। মিলিটারিরা গুলি চালালেও বদির ব্রাশফায়ারের মুখে সুবিধা করতে পারেনি। তাঁর অন্যান্য উল্লেখ্যযোগ্য অপারেশনসমূহ ছিল ২৫ আগস্টের ধানমণ্ডি অপারেশন, খালেদ মোশাররফের মেয়ে উদ্ধার, অপারেশন জর্দার টিন। শুধু ঢাকা শহরেই নয়, গ্রামের মানুষের মনোবল ধরে রাখার জন্য বদি তাঁর নিজ এলাকা এবং কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন ভাটি এলাকায় অপারেশনে যুক্ত ছিলেন। তখন গ্রামে গ্রামে শান্তি কমিটির তৎপরতা ছিল খুব বেশি।

বদির নেতৃত্বে বিভিন্ন গ্রামে অভিযান চালিয়ে এলাকার রাজাকার ও শান্তি কমিটির বিলুপ্তি ঘটানো হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকেই বদি দলবল ও অস্ত্রশস্ত্রসহ তাড়াইল থানার জাওয়ার গ্রামে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেন। প্রায় প্রতি রাত্রেই বদিউল আলমের নেতৃত্বাধীন দলের গোলাগুলিতে শান্তি কমিটির সদস্যরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। এপ্রিল ’৭১ মাসের শেষের দিকে জাওয়ারের পার্শ্ববর্তী গ্রাম ধলার শান্তি কমিটির নেতৃবৃন্দের বাড়িতে হানা দেয়। এই অপারেশনের ফলে ধলা ও পার্শ্ববর্তী অন্য কয়েকটি গ্রামের শান্তি কমিটির নেতা ও সদস্যদের মাঝে এমন ভয়-ভীতির সঞ্চার হলো যে তাদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে দিল এবং বাকিরা একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। বদির দল পাকুন্দিয়া সদরেও রাজাকারদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে প্রচণ্ড মার খাবার পর পাকুন্দিয়ার রাজাকার বাহিনী বস্তুত মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল।

২৯ আগস্ট, রোববার, দুপুর ১২টার দিকে বদি ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ জালালুদ্দীনের বাসভবন থেকে পাকি আর্মির হাতে ধরা পড়েন বদিউল আলম। অধ্যক্ষের ছেলে ফরিদ ছিল বদির বন্ধু। বদি সে বাড়িতে গিয়েছিলেন তাস খেলার জন্য। ফরিদ বাড়ি থেকে বের হয়ে ৫/৬ মিনিট পর সঙ্গে নিয়ে আসে পাকিস্তানি কয়েক সেনা কর্মকর্তা, ধরা পড়ে যান বদি। ১৯৭১-এর ২৯ আগস্ট উল্লেখ্যযোগ্যসংখ্যক গেরিলা যোদ্ধা ধরা পড়েন। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ পরবর্তীতে ফিরে এলেও ফিরে আসেননি বদি, আলতাফ মাহমুদ, জুয়েল, আজাদ, রুমী, আবু বকর, হাফিজসহ অনেকে। ১৯৭১-এর ২৯-৩১ আগস্ট আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ক্ষণিকের জন্য রাহুগ্রস্ত হলেও সূর্যসন্তানদের তীব্র আলোকচ্ছটায় বাংলার আকাশে রাহুমুক্ত হয়ে উদিত হয় স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। সব সূর্যসন্তানই বাঙালি জাতির মনে গভীর শ্রদ্ধার আসনে আসীন। – লেখক : সাংস্কৃতিক কর্মী, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক

মানবকণ্ঠ/এএএম