লেভেল ক্রসিংগুলো যেন মৃত্যুকূপ

কালিয়াকৈর (গাজীপুর) সংবাদদাতা :
জয়দেবপুর-রাজশাহী রেললাইনের গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং। এসব অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে প্রাণ হারাচ্ছেন পথচারী, পরিবহন শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। এসব লেভেল ক্রসিং যেন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। আহত হন অনেক মানুষ, যাদের অনেককেই বরণ করতে হয়েছে পঙ্গুত্ব। ফলে ঝুঁকিতে রয়েছে জনজীবন।
অপরদিকে এসব অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ের ছোট-বড় প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই তদন্ত কমিটি হয়। হয় মামলা, জরিমানাও। অথচ দুর্ঘটনার কারণ সেই অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং গেটম্যান ও গেট ব্যারিয়ার দেয়ার কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। ফলে এসব দুর্ঘটনার কারণ অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলো সেই অরক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।
এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরের কালিয়াকৈর শিল্পাঞ্চল হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, গ্রাম থেকে আসা লোকজন এখানে ব্যাপক হারে বসতি গড়ে উঠেছে। তাদের ও এখানকার মানুষের চলাচলের জন্য যেখানে সেখানে লেভেল ক্রসিং পার হওয়ার রাস্তাও তৈরি করা হয়। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব লেভেল ক্রসিংয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো গেটম্যান ও গেট ব্যারিয়ার দেয়নি। শুধু দু-একটিতে সতর্কীকরণ সাইন বোর্ড টাঙিয়ে দায় সারলেও বেশিরভাগ লেভেল ক্রসিংয়ে সে সতর্কীকরণ সাইন বোর্ডও নেই। এ ছাড়া এসব লেভেল ক্রসিং ঘেঁষেই অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থাপনাও। স্থানীয় লোকজন এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য দাবি জানালেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং দিয়ে নিয়ন্ত্রণহীন পথচারী ও যানবাহন চলাচল করায় দুর্ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এতে ট্রেন চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর জয়দেবপুর-রাজশাহী রেললাইনের কালিয়াকৈর উপজেলার বক্তারপুর এলাকায় লেভেল ক্রসিংয়ের ওপর বিদ্যুতের খুঁটিভর্তি একটি ট্রাক বিকল হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে লালমনি এক্সপ্রেসের একটি ট্রেন এসে ট্রাকটিকে ধাক্কা দেয়। এতে ট্রেনের সামনের অংশ ও ট্রাকটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। এ সময় ওই ট্রেনের সহকারী চালক নুর আলম শরীফ নিহত হন। ট্রাকের চালক সেলিম রেজাসহ ট্রেনের অন্তত ২০ যাত্রী আহত হয়। এর আগে একই বছরের ২৬ আগস্ট একই লেভেল ক্রসিংয়ে মাছ ভর্তি একটি পিকআপভ্যানের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। এতে পিকআপ ভ্যানের চালক শাকিল হোসেন (৪০) ও মাছ ব্যবসায়ী বাবু মিয়া (৩৪) দু’জন মারা যান। এ সময় আহত হন আরো তিনজন। বছরখানেক আগে ওই লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে কাভার্ডভ্যানের চালকসহ দু’জন মারা যান।
আতঙ্কের আরেক নাম গোয়ালবাথান অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং। ২০১৭ সালের ৮ জানুয়ারি এ লেভেল ক্রসিংয়ে কলকাতাগামী মৈত্রী এক্সপ্রেসের সঙ্গে একটি প্রাইভেট কারের সংঘর্ষ হয়। নিহত হয় পাঁচজন। এ সময় ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৫ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। একই লেভেল ক্রসিংয়ে বছর দুয়েক আগে ট্রেনে কাটা পড়ে দাদা সামছুউদ্দিন ও নাতি রুবেল হোসেনের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালের ০৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটির ভেতরের অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে বালু বোঝাই একটি ট্রাক ও একটি ট্রেনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষের ঘটনায় ট্রাকের চালক মো. করিম মিয়া (৫০) ও তার সহযোগী গুরুতর আহত হন। ২০১৬ সালের ৩১ অক্টোবর উপজেলার সফিপুর ভান্নারা সড়কের ধোপাচালা অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় কাভার্ডভ্যানের চালক আব্দুল কাদের ও তার সহযোগী মাজেদুল নিহত হন। তা ছাড়া কাভার্ডভ্যানটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। ২০১৩ সালে ২৬ এপ্রিল উপজেলার খাড়াজোড়া লেভেল ক্রসিং ট্রেনের ধাক্কায় লেগুনার চালক জলিল নিহত হন। এ সময় আহত হন আরো ৮ জন। ওই বছরের ১৩ ডিসেম্বর রাজশাহী-জয়দেবপুর রেললাইনের উপজেলার বরাব এলাকায় ট্রেন সঙ্গে টমটমের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে টমটমের চালক নিহত ও ১০জন আহত হন। এসব দুুুর্ঘটনায় শুধু তদন্ত হয়, মামলাও হয় এমনকি মৃত ব্যক্তির নামেও মামলা হয়। অথচ দুর্ঘটনার কারণ সেই অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং রক্ষিত করার কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। এ ছাড়াও গত দু-তিন বছরে এ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হয়েছে অনেক মানুষ।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জয়দেবপুর-রাজশাহী রেললাইনের গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার স্বাকাশ্বর থেকে সূত্রাপুর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় অর্ধশতাধিক অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এগুলো মধ্যে উপজেলার বক্তারপুর, গোয়ালবাথান, কালামপুর, ধোপাচালা, বরাব, নয়ানগর, ভাউমান টালাবহ লেভেল ক্রসিং বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। শুধু দু-একটিতে সতর্কীকরণ সাইন বোর্ড টানানো হয়েছে। তাতে লেখা আছে ‘সাবধান এই লেবেল ক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান নাই। পথচারী ও সকল প্রকার যানবাহনের চালক নিজ দায়িত্বে পারাপার করিবেন এবং যে কোনো দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে নিজেই বাধ্য থাকিবেন’ এমন লেখা সংবলিত একটি সাইন বোর্ড টাঙিয়েই দায় সেরেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এতে কর্তৃপক্ষ কোনো রকমে দায় সারলেও বাকিগুলোতে সতর্কীকরণ সাইন বোর্ডও নেই।