লিটলম্যাগ চত্বর জমেনি

লিটলম্যাগ চত্বর জমেনি

অমর একুশে গ্রন্থমেলা ইতোমধ্যে পার করেছে উনিশ দিন। বলা চলে মেলার ভরা যৌবন চলছে এখন। কিন্তু মেলায় ম্যাগাজিনগুলোর জন্য নির্ধারিত লিটলম্যাগ চত্বর এখনো প্রাণ পায়নি। বর্ধমান হাউসের পাশের বহেরাতলায় এবার প্রায় ১৮০টির মতো লিটলম্যাগের জায়গা বরাদ্দ দেয়া হলেও তিন ভাগের এক ভাগ স্টল এখনো ফাঁকা পড়ে আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বইমেলা এখন মূলত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ায় বর্ধমান হাউসের পেছনের পাশে খুব বেশি লোক সমাগম হচ্ছে না। এ কারণে এখানে স্টল দিতে আগ্রহ নেই ম্যাগাজিনগুলোর।

লিটলম্যাগের এ দুরবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির পরিচালক এবং মেলা আয়োজন কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ বলেন, ‘আমরা লিটলম্যাগকে সহায়তা করতে চাই। তারা যেখানে চাইবে আমরা সেখানেই বরাদ্দ দিতে প্রস্তুত। কিন্তু এ বিষয়ে তাদের মধ্যেই মতবিরোধ রয়েছে। কয়েকটি ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে এবার আমাদের কাছে দাবি করা হয়েছিল এটিকে সোহরাওয়ার্দীতে স্থানান্তরের। কিন্তু পরে অন্যরা এটির বিরোধিতা করতে থাকেন। তারা দাবি জানান, এখানেই থাকবেন তারা। এ কারণে এটি স্থানান্তরিত হয়নি। তবে তারা সবাই একমতে পৌঁছে যদি আবেদন করেন তবে আমরা এটিকে আগামী বছর থেকে সোহরাওয়ার্দীতে স্থানান্তরে প্রস্তুত আছি। আমরা চাই সবার বেচাকেনা যেখানে ভালো হবে সেখানেই তাদের স্টল পড়ুক। এখানে আমরা কারো ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে চাই না।’

লোক সমাগম না হওয়ার কারণে এরই মধ্যে অনেক ম্যাগাজিন স্বত্বাধিকারী দাবি তুলেছেন ম্যাগাজিনের স্টলগুলোকে সোহরাওয়ার্দীতে স্থানান্তরের। কিন্তু তা না হওয়ায় এখানে আসতে চাননি ম্যাগাজিন মালিকরা। তবে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা লিটলম্যাগকে সোহরাওয়ার্দীতে স্থানান্তরে প্রস্তুত থাকলেও ম্যাগাজিন স্বত্বাধিকারীরাই এ বিষয়ে একমত হতে পারেনি। এ কারণে এবার তা সোহরাওয়ার্দীতে স্থানান্তর সম্ভব হয়নি। তারা সবাই মিলে যদি দরখাস্ত করে তবে বাংলা একাডেমি তাতে রাজি আছে বলেও জানা গেছে।

এবারের বইমেলায় ভালো মানের ম্যাগাজিনও এসেছে অনেক কম। মূলত লোক সমাগম কমে যাওয়ায় মেলা উপলক্ষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে ম্যাগাজিনগুলোর মালিকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন বাংলা একাডেমিতে নিলে আবারো লিটলম্যাগে প্রাণ ফিরে আসবে।

এবারের মেলায় আসা ভালো মানের কয়েকটি ম্যাগাজিনের মধ্যে রয়েছে, একুশের সংকলন এনেছে ‘কবিতাচর্চা’, একুশ উপলক্ষে সংখ্যা বের করেছে ‘জলধি’, ‘কাঠপেন্সিল’, ‘শালুক’। নাট্যবিষয়ক খুব সিরিয়াস এক সংখ্যা প্রকাশ করেছে থিয়েটার বিষয়ক ছোটকাগজ ‘ক্ষ্যাপা’। এ পত্রিকার সম্পাদক পাভেল রহমান বললেন, লিটল ম্যাগাজিন চত্বর ছোট ছোট বই ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাচ্ছে। ‘কাঠপেন্সিল’র কর্মী আহমেদ ইউসুফ বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই চত্বর নিয়ে যাওয়া হলে আরো অনেক পাঠকের নজরে আসত। এখানে আমরা অনেকটাই নিঃসঙ্গ। কবি ওবায়েদ আকাশ বললেন, লিটল ম্যাগাজিন চত্বরকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নেয়া এখন সময়ের দাবি। অমরাবতী লিটলম্যাগের প্রকাশক মতিন বাঙালি বলেন, মূল মেলা সোরাওয়ার্দী নিয়ে যাওয়াতে পাঠকরা এখানে কম আসেন।

ছোট কাগজ তিথিয়ার সম্পাদক হোসাইন মোহাম্মদ সাগর বলেন ভিন্ন কথা, তার মতে বর্তমান সময়ে লিটলম্যাগের চর্চাটা কমে যাচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন লেখকরা লিটল ম্যাগে লেখার মাধ্যমে সাহিত্য জগতে প্রবেশ করতেন। তবে এখন সে সময়টা আর নেই। এখন সবাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফলে লিটলম্যাগে লেখক এবং ভালো লেখকের অভাব হচ্ছে, ফলে পাঠক কমছে ভালো কিছু না পাওয়ার জন্য। পাশাপাশি লিটলম্যাগ চত্বর হলেও অধিকাংশ স্টলেই রয়েছে ব্যক্তিবিশেষের বই খুঁজলে লিটলম্যাগ খুব কমই পাওয়া যাবে। আর চর্চা কমার ব্যাপারটা তো আছেই। আর এ সবকিছু মিলিয়েই লিটলম্যাগের প্রতি আগ্রহ কমেছে সাধারণ পাঠক এবং লেখকদের। যার ফলে আনাগোনা কম।

ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশের সহ প্রকাশক আদিত্য অন্তর বলেন, লিটলম্যাগ সাহিত্যের বড় একটি মাধ্যম। এই মাধ্যমেই অনেক সাহিত্যিক বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন। অথচ এই মাধ্যমকে বাংলা একাডেমির ভেতর রেখে মূল মেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এতে মেলার ক্রেতা ও দর্শনার্থীর কাছে অদেখাই থেকে যাচ্ছে লিটলম্যাগ। পাঠক সুমি আক্তার এ বিষয়ে বলেন, আগে মেলায় এলেই দেখতাম লিটল ম্যাগ সেই জমজমাট। কিন্তু এখন দেখছি শুধু পাঠকই নেই তা নয় বরং ম্যাগাজিনই নেই মেলাতে। দেখুন একটিও ভালো মানের ম্যাগাজিন খুঁজে পাবেন না। অনেক স্টল তো ফাঁকাই পড়ে আছে। এমন থাকলে মানুষই বা কেন আসবে? সোহরাওয়ার্দীতে নিলে হয়তো বা লিটলম্যাগে আবার প্রাণ ফিরতে পারে।’

নতুন বই: গতকাল ১৯ ফেব্রুয়ারি ছিল অমর একুশে গ্রন্থমেলার ১৯তম দিন। এদিন মেলায় গল্পের বই এসেছে ৩৪টি, প্রবন্ধ ৭টি, কবিতা ৪৫টি, গবেষণা ৭টি, ছড়া ৫টি, জীবনী ১১টি, মুক্তিযুদ্ধ ৪টি, বিজ্ঞান ২টি, ভ্রমণ ২টি, ইতিহাস ১টি, স্বাস্থ্য ১টি, অনুবাদ ১টি, সায়েন্স ফিকশন ১টি এবং অন্যান্য ৬টিসহ মোট ১৪২টি বই। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে ছিল গ্রন্থকুটির থেকে প্রকাশিত সন্তোষ ঢালীর সামাজিক ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক বই ‘মন না মতি’, শব্দশিল্প থেকে প্রকাশিত আব্দুল লতিফের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই ‘একটুকরো স্বাধীনতার অংশ এবং সনদবিহীন মুক্তিযোদ্ধা’, অগ্রদূত এনেছে জহিরুল মিঠুর ‘নোঙর তার লুট হয়ে গেছে’, শব্দশৈলী এনেছে কাজী এনায়েত উল্লাহর ‘বিশ্বপ্রবাহ’, মহাকাল এনেছে রাশেদ চৌধুরীর ‘বাংলা উচ্চারণের নিয়ম’, গতি প্রকাশনী এনেছে জিয়াউল হকের ‘দুষ্টু এক আমি’, পাঠক সমাবেশ এনেছে হুরে জান্নাত শিখার ‘আমার হারানো আমি’ পদক্ষেপ থেকে প্রকাশিত আনোয়ারা সৈয়দ হকের গল্পগ্রন্থ ‘আমি কুকুর ভয় পাই’, অনার্য পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত তানভির মোকাম্মেলের কবিতার বই ‘বেহুলা বাংলা ও অন্যান্য কবিতা’ অনন্যা থেকে প্রকাশিত ইমদাদুল হক মিলনের বই ‘একাত্তর ও একজন মা’।

মানবকণ্ঠ/এসএস