লিংকনের ‘পিপল’ ও জনগণের নির্বাচন

গণতন্ত্রের প্রকৃত জনগণ কারা? প্লেটো কিন্তু সব জনগণের ভোটাধিকার স্বীকার করেননি। জনগণ কী সব খবর রাখে? তারা কি ওয়েল ইনফরমড্? আব্রাহাম লিংকনের ‘জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের সরকার’- সেই গণতন্ত্র এখন কি আছে? গণতন্ত্র এখন অনেকটাই কর্পোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণে। বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির সুবাদে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে নতুন অনেক কিছু প্রবেশ করেছে, দূরে সরে গেছে জনগণ। ফলে যার যেদিকে ইচ্ছে জনগণকে সেদিকে ধাবিত করছে।

মিডিয়া থেকে প্রাপ্ত বাস্তবতাই জনগণ সত্য বলে মেনে নিচ্ছে। অর্থাৎ মিডিয়া জনগণকে যেদিকে ইচ্ছা নিয়ে যাচ্ছে। মিডিয়া যা সৃষ্টি করছে সেটাই বাস্তবতা এবং এজেন্ডা। কিন্তু সত্যিকার অর্থে যারা জনগণ, তারা সত্যের কতটা জানে। তারা কী জেনে বুঝে, সচেতন এবং সদিচ্ছায় স্বাধীনভাবে ভোট দেয়? সেই বিতর্ক কিন্তু থেকেই যায়। যদিও বুর্জোয়া গণতন্ত্র বলতে যা বোঝানো হয় সে ঘরানার গণতন্ত্রে আমরা অভ্যস্ত। এমতাবস্থায় আসন্ন নির্বাচনে যদি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ লোক ভোটকেন্দ্রে গিয়ে অবাধে সচেতনভাবে নিজ সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভোট প্রদান করেন, তাহলে নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণের মানগত বিষয়টি নিশ্চিত হবে। কিন্তু সমস্যা অশিক্ষিত, নিরক্ষর, দরিদ্র কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও ধর্মান্ধ জনগণকে নিয়ে, যাদের নিজস্ব কোনো বুদ্ধি, বিবেচনা ও উপলব্ধি নেই।

এমন জনগণ অন্যের কথায় প্রভাবিত হন। তারাই মাইকের ঘোষণা মোতাবেক সাঈদীকে চাঁদের মধ্যে দেখেন। তারাই কি গণতন্ত্রের প্রকৃত জনগণ? তারাই যদি প্রকৃত জনগণ হয়, তাহলে অন্য কথা। সেই সব জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করলেই কি প্রকৃত জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত হবে? প্রশ্ন থেকে যায়। কাজেই গণতন্ত্রের প্রকৃত জনগণকে খুঁজতে হবে। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের এক ব্যক্তি এক ভোট। এমন গণতন্ত্রে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ লোক যদি ভোট কেন্দ্রে যায়, তাহলে নির্বাচনের পরিমাণগত বিষয়টি নিশ্চিত হয় কিন্তু মানগত বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

তখন আমরা সেই নির্বাচনকে হয়তো গণতন্ত্রের সফল নির্বাচন বলতে পারি। এবারের নির্বাচন পরিমাণগত দিক থেকে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে বলেই মনে হচ্ছে। এবার নির্বাচনে ছোটবড় অনেক দলই অংশগ্রহণ করছে। কাজেই ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন এবার হচ্ছে না। বলা চলে সব দল অংশ নিচ্ছে। যাদের নিবন্ধন নেই তারাও বেশ উৎসাহী। নিবন্ধনহীন দলগুলো বড় জোটের নিকট ৫০ থেকে ৬০টি করে আসন দাবি করছে। তাদের কথাবার্তাও বেশ জোরালো। কাজেই এবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যা আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল এবং জনগণের অংশগ্রহণ। যদিও বর্তমানে গণতন্ত্রে প্রকৃত স্বাধীন জনগণ নেই। জনগণ এখন কিছু ব্যক্তি, গোষ্ঠী, পক্ষ এবং সংগঠন, বিশেষ শ্রেণি দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। সমাজের মৌলভী সাহেব, সরদার সাহেব থেকে শুরু করে মেয়র, ওয়ার্ড কমিশনার সাহেব জনগণের নিয়ন্ত্রক।

তারাই জনগণের মগজ ধোলাই করে যেদিকে ইচ্ছে নিয়ে যাচ্ছে। এটাই হলো ইমপেরিক্যাল বাস্তবতা। জনগণ সচেতন এবং বুদ্ধিমান হলে গণতন্ত্রের ব্যাপক সফলতা পাওয়া যেত। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় আমরা অতীতে লক্ষ্য করেছি যে, দেশে জ্বালাও পোড়ানোর মতো অনেক কাজের ইন্ধন জুগিয়েছে মৌলবাদীরা। দেশে এখনো মাইলের পর মাইল এলাকা রয়েছে, যেখানে ধর্মীয় নেতা যা বলেন, স্থানীয়রা ঠিক তাই করে। মাইকের ঘোষণায় তারা চলে। আর সেই সব এলাকার মাইকগুলোর নিয়ন্ত্রন এখনো মৌলবাদীদের দখলে। শিক্ষা, সচেতন এবং চিন্তার স্বাধীনতাসহ সব দিক থেকে আমাদের যে পর্যায়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই পর্যায় এখনো আমরা উপনীত হতে পারিনি। সব বিষয়ে অগ্রগতি অর্জনে অনেক সময় লাগবে। মিডিয়া যেভাবে তথ্য দিচ্ছে, ঠিক সেইভাবেই আমরা বাস্তবতা নির্মাণ করছি। কিন্তু মিডিয়ার তথ্য ঘাটতির বিষয়টি আমলে আসছে না।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পেছানো নিয়ে অনেক কথাই বলা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, আগামী ২৯ জানুয়ারি বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হবে। কাজেই ২৮ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব কিছু শেষ করতেই হবে। আবার নির্বাচনের পর কিছু সময় নির্বাচন কমিশনের হাতে রাখতে হবে। কেননা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর কিছু কিছু কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বা নির্বাচন স্থগিত থাকে। অনেক প্রার্থী একইসঙ্গে দুই-তিন আসনে নির্বাচন করেন। আবার উপ-নির্বাচনও করতে হয়। এজন্য নির্বাচন কমিশনকে কিছু সময় হাতে রাখতে হবে। এই সব বিষয় বিবেচনা করে নির্বাচন খুব বেশি পিছানোর সুযোগ নেই। তবে সব বিষয় সামনে রেখে নির্বাচন পেছানো নিয়ে বেশি জোরাজুরি করার কিছু নেই। কিন্তু আমাদের দেশে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর নির্বাচন পর্যন্ত ২০ থেকে ২৫ দিনের বেশি সময় দেয়া হয় না।

এবারো এর বেশি সময় দেয়া হবে না। তবে জোটের রাজনীতে আসন ভাগাভাগি এবং নেতৃত্ব, প্রচার-প্রচারণা সংশ্লিষ্ট অনেক কিছুতেই সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য সময় বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছে। এবার নির্বাচনের আরেকটি বিষয় হচ্ছে গায়ক, অভিনয় শিল্পী, খেলোয়াড়সহ অনেক তারকার প্রার্থী হওয়া। তাদের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে। কিন্তু ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত কিংবা মাহবুবে আলম এর বিষয়ে আলোচনায় আসছে না। আমরা জানি রাজনীতিতে ভালো লোক আসেন না। কিন্তু তারা যখন রাজনীতিতে আসছেন, আমরা যেন তাদেরকে ভালো চোখে দেখি। তারা হয়তো রাস্তায় গিয়ে রাজনীতি করেননি। কিন্তু তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এবং জনগণকে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন।

ড. ফরাসউদ্দিন সেই আদর্শে আজীবন ছিলেন। এদিক থেকে তাদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। মাশরাফি বিন মর্তুজার বিষয় নেতিবাচকভাবে নেয়ার কিছু নেই। কারণ তার খেলোয়াড় জীবনের ক্যারিয়ার প্রায় শেষের দিকে। সেই অর্থে সাকিব আল হাসানকে নির্বাচনে বাধা দেয়া ঠিক আছে। কারণ তার বয়স এবং সময় এখনো হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তাকে খেলাধুলায় মনোযোগ দেয়ার কথা বলেছেন। তবে এবার বড় দু’টি দলে এক আসনের জন্য ১৫ থেকে ১৬ জন মনোনয়ন প্রার্থী। এর নেপথ্যে কারণ রয়েছে। অনেকে প্রার্থী হওয়ার মাধ্যমে দলের নিকট তার নির্বাচনের আগ্রহ দেখানোর বিষয়টি চলে আসে। যাতে ভবিষ্যতে কাজে আসে। অর্থাৎ দলে নাম লেখানো কিংবা অবদান রাখা।

এবার নমিনেশন বিক্রি করে ১২ কোটি টাকারও বেশি আওয়ামী লীগের ফান্ডে জমা হয়েছে। এর মাধ্যমে নেতাকর্মীরা দলে অবদান রাখছেন। রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের কাছ থেকে চাঁদা না নিয়ে বরং নিজেদের লোকদের কাছ থেকে দল চালানোর অর্থ সংগ্রহ করছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচন ৭ ডিসেম্বর হয়েছিল। ডিসেম্বরে নির্বাচন সম্পন্ন করার সঙ্গে আবহাওয়া, পরিবেশগত কারণ রয়েছে। ডিসেম্বরে নির্বাচন হলে বাইরের নির্বাচন পর্যবেক্ষক কমে যাবে, এটা সঠিক নয়। ডিসেম্বরে বড়দিন উপলক্ষে দেশের সব ক‚টনৈতিক অ্যাম্বেসি বন্ধ করে দেশে চলে যাবেন না।

আর ঠিক বড়দিনেই তো নির্বাচন হচ্ছে না। বড়দিন ২৫ ডিসেম্বর। নির্বাচন বড়দিনের কয়েকদিন পরে। পূর্বের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক অনেক পর্যবেক্ষক দল এসেছিল। এবারো অনেক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং প্রতিষ্ঠান আসবে। আর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সিদ্ধান্ত কিংবা সময়সূচি হঠাৎ করে নেয়া হয়নি। প্রায় দুই বছর আগে থেকে ডিসেম্বরে নির্বাচনের বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছিল। বর্তমানে জোটের রাজনীতিতে প্রায় সব দলেরই নির্বাচনী প্রস্তুতি, প্রার্থিতা, আসন ভাগাভাগির একই অবস্থা। ২০ দল, ১৪ দল এমনকি জাতীয় পার্টিরও। নির্বাচন না পিছানোর কারণে কোনো দলেরই বড় কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পুরো রাষ্ট্র ব্যবস্থা এখন নির্বাচন কমিশনের হাতে চলে গেছে। নির্বাচন কমিশন যদি সে ক্ষমতা ব্যবহার না করতে পারে তাহলে সেটি তাদের সমস্যা।

– লেখক : উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়