লাল শাপলায় শরৎ সৌন্দর্য

তারুণ্য মানেই উদ্যমী, উচ্ছল, উচ্ছ্বসিত। জগৎটাকে ঘুরে ঘুরে দেখার আপ্রাণ চেষ্টা আর শরৎ এলে ঢেউ খেলানো পানির মতো তারুণ্যের জীবনেও দোলা দেয়। বর্তমান সময়ে শীত-হেমন্ত নয়, এখন সারা বছরই ঘুরে বেড়ানো যায়। বর্ষা শেষে শরতের শুরুতে প্রকৃতি আরো নিজের রূপের ডালি মেলে ধরে। যেমনটি করে ষোড়শী তরুণী। এই শরতে পর্যটক/যুগলদের স্বল্প সময়ে ঘুরে আসার মতো প্রকৃতির এক নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের খোঁজ-খবর জানিয়ে
লিখেছেন জাভেদ হাকিম

প্রিন্ট মিডিয়ার কল্যাণে জানতে পারি উজিরপুরের সাতলায় ফুটে আছে লাল শাপলা। ওমনি আমিসহ দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের চার বন্ধু প্রস্তুত। পরের দিন রাতেই ‘দে-ছুট’। আমি বুড়িগঙ্গা পারের মানুষ হলেও জাহাজ ভ্রমণ আমাকে বাড়তি আনন্দ দেয়। রাত নয়টায় সদরঘাট হতে জাহাজ ছাড়ে। বরিশাল ঘাটে পৌঁছবে ভোর চারটয়। এই দীর্ঘ সময় ফেসবুকিং, গপসপ [গল্প-গুজব] আর ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম। জাহাজ সময়মতো পৌঁছল। বাসের অপেক্ষায় দেরি না করে ঘাট থেকেই মাহেন্দ্রতে চেপে ছুটি। সাতলা বিলের ফুটন্ত লাল শাপলা দেখতে হলে যতটা সম্ভব ভোরে পৌঁছতে হবে উজিপুরের নয়াকান্দী গ্রামে। সকালের ফাঁকা রাস্তার সুযোগে প্রায় দেড় ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাই নয়াকান্দী। সড়কের পাশেই খেয়াঘাট। গাড়ি থেকে নেমেই হুড়মুড় করে গিয়ে নৌকায় বসি। দূর থেকেই চোখে ধরা দেয় লাল শাপলা। ছোট নৌকা তরতর করে এগিয়ে যায়। যতই আগায় ততই যেন চোখে-মুখে মুগ্ধতা ভর করে। লাল শাপলার রাজ্যে নৌকা চলে, আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রই। হঠাৎ চোখ পড়ে তার দিকে।
ঘোর কেটে যাওয়ার পরে বুঝতে পারলাম, অন্য কারো কেউ আমার কাছে আসবে কেন। এর চাইতে ভালো প্রকৃতির অবারিত রূপ দেখি। আর গুনগুন করে গান গেয়ে যাই তোমার ওই দুটো চোখ যেন / সাতলা বিলে ফুটে থাকা/ এক জোড়া লাল শাপলা। হা- হা- হা। সুপ্রিয় পাঠক ভ্রু কুঁচকাবেন না। জাস্ট পড়ার মাঝে খানিকটা বানোয়াট ভাবনার রসে আপনাদের মন ভেজালাম।
পুরো সাতলা বিলটিই যেন মনে হয় ফরাসি লাল মখমলে ঢাকা। পুরো বিলের মাঝে একটা নিঝুম ভাব। মাঝে মধ্যে টুপটাপ মাছের লম্পঝম্প। সাতলা বিলের চার পাশ পুরোটাই নৈসর্গিক। এক কথায় অসাধারণ। যেমনটা হয় চঞ্চলা তরুণীর দল। লাল শাপলার ঔষধি গুণও বেশ। বিশাল আয়তনের এই সাতলা বিল থেকে অনেক পরিবার শাপলা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। থৈ থৈ পানির বুকে মাথা উঁচু করে থাকা, সবুজে ঘেরা বিচ্ছিন্ন বাড়িগুলোর সৌন্দর্য বেশ দৃষ্টি নন্দন। আর নারিকেল গাছে ঝুলে থাকা থোকায় থোকায় ডাব তৃষ্ণার্ত ভ্রমণপিয়াসীদের বেশ হাতছানি দেয়। মাঝি মতিলাল রায় জানালেন আগে এখানে সাদা ও বেগুনি শাপলাও ফুটত। এখন আর দেখা যায় না। তিনি পঞ্চাশ বছর ধরে এই বিলে এ রকম হাজার হাজার শাপলা ফুটতে দেখেন। আগে তেমন পর্যটক আসত না। এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রচুর দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের আর্থিক সচ্ছলতা এসেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আনাগোনাও বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে নৈঃশব্দ ভাবটা গিলে খেল হৈ-চৈ করা পর্যটকদের বিচরণে। সেই সঙ্গে লজ্জায় যেন লাল টুকটুকে ফুলগুলোও নিজেদের গোটাতে থাকে। তবে আমরা গোটানোর মতো পর্যটক নই। এসেছি প্রকৃতির সান্নিধ্যে সুতরাং সময় থাকতে আরো নতুন কিছু খুঁজে দেখবই। এবার গ্রামটা ঘুরে দেখি। বরিশাল থেকে গোপালগঞ্জ যাওয়ার জন্য কচা নদীর ওপর নবনির্মিত সেতুর ওপরে দাঁড়িয়ে এক অন্যরকম প্রকৃতি উপভোগ করি। কচা নদীর চারপাশে চোখজুড়ানো সব প্রাকৃতিক দৃশ্য। মনজুড়ানো গ্রাম্যপথে হাঁটার সময় চোখে পড়ল, বিলের এক পাশটায় সাদা সাদা কী যেন ভাসছে। স্থানীয়রা জানালো ডেপ ফুল। আবারো নৌকায় করে সেদিকটায় গেলাম। ওয়াও! সেই রকম দৃশ্য। সোশ্যাল মিডিয়া হেল্প পোস্টের কল্যাণে জানতে পারলাম এগুলো চাঁদমালা ফুল। ডেপ আঞ্চলিক নাম। সত্যি বলতে কী আমরা এই ফুল আগে কখনো দেখব তো দূরে থাক নামই শুনিনি কখনো। নাম যেমন চাঁদমালা- পানিতেও ভেসে আছে মালার মতোই। চাঁদমালা দেখতে পাওয়াটা ভ্রমণে আমাদের বাড়তি আনন্দ দেয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও ফেরার পথ ধরি।
কীভাবে যাবেন: বাসে ও জাহাজে দুইভাবেই যাওয়া যাবে। প্রতিদিন রাত ৮টা ৩০ মিনিট থেকে ৯টা পর্যন্ত বেশ কয়েকটা বিলাসবহুল লঞ্চ সদরঘাট থেকে বরিশালের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। লঞ্চ টার্মিনাল হতে রিজার্ভ মাহেন্দ্রে অথবা নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে বাসে উজিরপুর উপজেলার হারতার নয়াকান্দী। বাস ছাড়ে সায়েদাবাদ ও গাবতলী থেকে।
ভাড়া: জাহাজে ডেকে জনপ্রতি ১৫০ টাকা ও কেবিন ১,০০০ টাকা হতে ৫,০০০ হাজার টাকার ওপরে। মাহেন্দ্র সারাদিনের জন্য ২,০০০ টাকা। নৌকা ভাড়া দরদাম করে নেয়াই শ্রেয়।
ভ্রমণ তথ্য: লাল শাপলার সৌন্দর্য দেখার এখনি মৌসুম। ফুটন্ত শাপলা দেখতে হলে সকাল ৮টার মধ্যেই পৌঁছতে হবে। খাবার-দাবারের জন্য তেমন কোনো সু-ব্যবস্থা নেই। সুতরাং বরিশাল শহরেই সব সারতে হবে।
আরো কী কী দেখবেন: সাতলা বিলের পাশেই কচা নদীর ওপর নবনির্মিত ব্রিজের ওপর থেকে নয়নাভিরাম নৈসর্গিক দৃশ্য, দৃষ্টিনন্দন গুঠিয়া মসজিদ, ঐতিহাসিক দুর্গাসাগর দীঘিসহ কীর্তনখোলা নদীর তীরে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ। – ছবি:- দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ