লালমনিরহাটে বন্যার পরিস্থিতির চরম অবনতি

লালমনিরহাট

লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৩ লক্ষাধিক মানুষ। দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ হুমকির মুখে পড়েছে। পানির চাপে ব্যারাজের পাশে ফ্লাড বাইপাশ ভেঙে যাওয়ায় লালমনিরহাট জেলার ৫ উপজেলার অধিকাংশ এলাকার লোকজন পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে বুড়িমারী-ঢাকা মহাসড়ক ও রেলপথ। পানিবন্দি এলাকা গুলোতে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে বুড়িমারী স্থলবন্দর। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে রেল যোগাযোগ। বন্যা কবলিত এলাকা গুলোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে গেছে।

গত ৫ দিন ধরে ভারী বর্ষন ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা, ধরলা, বুড়ি তিস্তা ও সানিয়াজান নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটে শুক্রবার সকাল থেকে ফের বন্যা দেখা দিয়েছে। তিস্তার পানিতে ৩ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে ফের নদীগুলোর পানি বাড়তে শুরু করে। দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের দোয়ানী পয়েন্টে রোববার সকালে বিপদসীমার ৬৫ সিন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে থাকে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড দোয়ানী’র নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে পানি আসায় তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে কারণে তিস্তার তীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। আমরা প্রতি মুহুর্তে বন্যা পরিস্থিতি মনিটরিং করছি। তিস্তার পানি আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে কি পরিমাণ পানি আসবে তা ধারণা করা যাচ্ছে না। তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় রেড এলাট জারি করা হয়েছে। তিস্তা ব্যারাজের সব গেট খুলে দিয়েও পানির গতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তিস্তা ব্যারাজের ফ্লাড বাইপাশ পানি চাপে ভেঙে গেছে।

তিস্তা পাড়ের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিন আগের বন্যায় চর এলাকা গুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে গেছে। জেলার হাতীবান্ধা উপজেলায় বন্যায় সব চেয়ে বেশি ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে। যে কারণে ওই এলাকায় লক্ষ লক্ষ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি লোকজনের মাঝে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ভারত গজল ডোবা ব্যারেজের অধিকাংশ গেট খুলে দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই ঘর বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছেন। প্রচণ্ড গতিতে ময়লা ও ঘোলা পানি বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে। পানি গতি নিয়ন্ত্রণ করতে তিস্তা ব্যারাজের বেশি ভাগ গেট খুলে দেয়া হয়েছে। ফলে তিস্তার পানিতে পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার ৬০ গ্রামের ৩ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার একর আমন ধানের ক্ষেতসহ অনেক ফসলী ক্ষেত তিস্তার পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বুড়িমারী-ঢাকা রেলপথ ও মহাসড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

হাতীবান্ধা উপজেলার দক্ষিণ ধুবনী গ্রামের মমতাজ উদ্দিন, তছির উদ্দিন, মকবুল হোসেনসহ অনেক পানিবন্দি পরিবার অভিযোগ করেন, আমরা ৪ দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় আছি। এখন পর্যন্ত আমাদের মাঝে কোনো ত্রাণ বিতরণ করা হয়নি। কেউ আমাদের খোঁজ পর্যন্ত করেনি।

লালমনিরহাট

হাতীবান্ধা উপজেলার সিঙ্গিমারী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন দুলু জানান, তার ইউনিয়েনের অধিকাংশ এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার গুলোর তালিকা তৈরি করছেন। ইতোমধ্যে ত্রাণের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট আবেদন করেছেন। গোটা ইউনিয়নের সকল রাস্তা ঘাট ভেঙে গেছে।

হাতীবান্ধা উপজেলার সির্ন্দুনা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নুরল আমিন জানান, তার ইউনিয়নের সব মানুষই পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তিনি ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার গুলোর তালিকা তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

হাতীবান্ধা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফেরদৌস আহম্মেদ জানান, ইতোমধ্যে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে পানিবন্দি পরিবার গুলোর খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে উচ্চ পর্যায়ে প্রেরণ করা হবে। ত্রাণের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়েছে। পানিবন্দি লোকজনের মাঝে শুকনা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে পানিবন্দি পরিবার গুলো খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। ত্রাণের জন্য উচ্চ পার্যায়ে আবেদন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ত্রাণ বিতরণ শুরু হয়ে গেছে।

লালমনিরহাট-১ (হাতীবান্ধা-পাটগ্রাম)’র এমপি মোতাহার হোসেন জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে বন্যা পরিস্থিতির খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। পানিবন্দি পারিবার গুলোর সহযোগিতার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.