লাইসেন্সবিহীন আইএসপি ব্যবসা

লাইসেন্সবিহীন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি) ব্যবসার মাধ্যমে ধোঁকা দেয়া হচ্ছে ইন্টারনেট গ্রাহক ও সরকারকে। লাইসেন্স না থাকায় মানছে না তারা কোনো নিয়ম। বর্তমানে পাড়া মহল্লায় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা বখাটে যুবকদের জন্যই যেন হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট ব্যবসা।

২০০৭ পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে জ্যামিতিক হারে বাড়ে বাংলাদেশের ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা। প্রাথমিক পর্যায়ে মোবাইল ও ওয়াইম্যাক্সের মাধ্যমে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার শুরু করলেও ২০১১ সালের পর থেকে আবারো আইএসপি ব্যবসায়ীদের কদর বেড়ে যায়। কম খরচে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করেন প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহক। এ সময় অধিকাংশ আইএসপি প্রোভাইডার ছিলেন লাইসেন্সধারী। কিন্তু ব্যবসাটি লাভজনক হওয়ায় ধীরে ধীরে মহল্লা পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বখাটে যুবকরা ব্যবসাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন নিজেদের হাতে।

২০১২ সাল থেকে ব্যবসা শুরু করা একটি লাইসেন্সধারী আইএসপি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানান, ইন্টারনেট বিস্তৃতি লাভের আগে থেকে লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা শুরু করি আমরা। ২০১০ সালের পর থেকে বলা যায় লাভের মুখ দেখতে শুরু করি। কিন্তু তখনই শুরু হয় ঝামেলা। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা বা এলাকার ‘বড় ভাইয়েরা’ নিজেরা এককভাবে ব্যবসা করবেন বলে আমাদের লাইনগুলো বিচ্ছিন্ন করে দিতে থাকেন। এত খরচ করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করে বৈধভাবে আয় করতে না পেরে বাধ্য হয়েই লাইসেন্সবিহীন এই ব্যবসায়ীদের ইন্টারনেট সরবরাহ করতে হচ্ছে আমাদের। ফলে যে পরিমাণ লাভ হওয়ার কথা ছিল তা আমরা পাচ্ছি না। অন্যদিকে গ্রাহকরাও পাচ্ছেন না তাদের কাক্সিক্ষত সেবা। অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করার পরও তারা নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা পাচ্ছেন না। সেই সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকেও ইন্টারনেট সংযোগ নিতে পারছেন না তারা। ফলে একচেটিয়াভাবে অবৈধভাবে ব্যবসা করে যাচ্ছেন এই প্রভাবশালীরা। তার এই কথার যৌক্তিকতা যাচাই করতে গিয়ে বিটিসিএলর দেয়া তথ্য অনুসারে মিরপুর, রামপুরা ও খিলগাঁও জোনে সরেজমিনে খোঁজ নেয়া হয়। সেখানে বের হয়ে আসে অবাক করা তথ্য!

বর্তমানে ঢাকায় লাইসেন্সধারী মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২২৮টি। এর মধ্যে রামপুরা-খিলগাঁও জোনে লাইসেন্স প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ১৭টি। অন্যদিকে মিরপুর অঞ্চলে লাইসেন্স প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ৩০টি। অথচ শুধুমাত্র রামপুরা বনশ্রী এলাকাতেই বিভিন্ন নামে প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২০টি। অন্যদিকে খিলগাঁও ও বাসাবো এলাকায় বিভিন্ন নামে ৪৫টি প্রতিষ্ঠানের ব্যানার পোস্টার ও সাইনবোর্ড পাওয়া যায়।

উত্তর বাড্ডা থেকে বারিধারা এলাকায় রয়েছে ১০টির বেশি সার্ভিস প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে লাইসেন্সধারী মাত্র ২টি। বাকিগুলো স্থানীয়ভাবে ব্যবসা করছে। এদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বেশ দুর্বল। এক ব্যবহারকারী চাইলে অন্য ব্যবহারকারীর কম্পিউটারে প্রবেশ করতে পারেন।

এ বিষয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে গ্রাহক হিসেবে ফোন দিলে তারা একটি নাম ব্যবহার করে। অন্যদিকে পুলিশ বা সাংবাদিক পরিচয় দিলে তারা লাইসেন্সধারী কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সাব অফিস হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেয়।

ইন্টারনেট ব্যবসায় জড়িত লাইসেন্সধারী একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা তাদের সাব অফিস হিসেবে দেখাতে বাধ্য। কারণ লাইসেন্স নিয়ে এত খরচ করে প্রতিষ্ঠান দেয়ার পর লাইন চালু না থাকলে আমরা পথে বসে যাব। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালীদের কারণে আমরা ব্যবসা করতে পারছি না। তারা লাইন কেটে দিচ্ছে অথবা যন্ত্র চুরি করে নিচ্ছে। এ বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশকে জানানো হলে তারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ের এই উঠতি নেতা ও তাদের সাঙ্গদের সঙ্গে পেরে ওঠা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রতিনিয়ত পাহারা বসিয়েও এর কোনো সমাধান হয়নি। ফলে তাদের এই অবৈধ লাইন চালাতে দিতে হচ্ছে।

সরজমিনে এ সব লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইন্টারনেট নিরাপত্তা বিষয়ক কোনো ধারণা তাদের নেই। অবৈধ ৪০টি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২টি প্রতিষ্ঠান ‘লগ সার্ভার’ সম্পর্কে ধারণা রাখে। সেই সঙ্গে একাধিক গ্রাহকের ইন্টারনেট লাইন একটি আইপি অ্যাড্রেস শেয়ার করায় নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে থাকছে। ইন্টারনেট সার্ভিস সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান নিয়ে একজন গ্রাহক চাইলে এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা অন্য কম্পিউটারগুলোর তথ্য চুরি করতে সক্ষম। এদিকে বিষয়টি নিয়ে সচেতন নন অধিকাংশ গ্রাহক।

অবৈধ এই ব্যবসায়ীরা বিটিসিএলর কোনো নিয়ম না মেনেই ব্যবসা করছে। ইন্টারনেট সার্ভিস চার্জের ক্ষেত্রেও তাদের রয়েছে স্বেচ্ছাচারিতা। কোনো এলাকায় ৫১২ কেবিপিএস ৪০০টাকা, কোথাও ৫০০ টাকা, আবার কোথাও ৭০০ টাকা। লাইসেন্স না থাকায় তারা বড় ধরনের কর ফাঁকি দিচ্ছে।

এ বিষয়ে বিটিসিএলর মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, মিরপুর ও খিলগাঁও এলাকায় কিছুদিন পরপর পুলিশের সহায়তায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু মূল প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে কোনো না কোনোভাবে তারা পুনরায় সার্ভিস নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। কিন্তু গ্রাহক পর্যায় থেকে আরো সচেতনতা সৃষ্টি করতে না পারলে এ সমস্যার শতভাগ সমাধান সম্ভব নয়। সব ইন্টারনেট গ্রাহক চাইলে তাদের এলাকার ভুয়া আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের কাছে অভিযোগ করতে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এদিকে লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলো লগ সার্ভার ব্যবহার না করায় অপরাধীরাও পার পেয়ে যাচ্ছেন সহজে। অনলাইনে বসে বিভিন্ন অবৈধ কাজ করার পরও তাদের খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ। সেই সঙ্গে বিটিসিএলের বেঁধে দেয়া নিয়ম না মেনে ১৮ বছরের কম বয়সীদের কাছেও ইন্টারনেট সরবরাহ করছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে অন্ধকার এক জগতে পা বাড়াচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

মানবকণ্ঠ/বিএএফ