রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের গড়িমসি

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য ন্যূনতম সুবিধা নিশ্চিত না করেই বাংলাদেশকে প্রত্যাবাসনের প্রস্তাব দিয়েছে মিয়ানমার। বিশেষ করে, রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে গিয়ে কোথায় থাকবে, নিরাপত্তা কে দেবে, নাগরিকত্ব পাবে কি না, জীবিকা নির্বাহ কিভাবে করবে তার কোনোটিই এখনো নিশ্চিত করেনি মিয়ানমার সরকার। মিয়ানমারকে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বাংলাদেশের দেয়া ৮ হাজার ৩২ জন রোহিঙ্গার একটি তালিকা থেকে মাত্র ২ হাজার ১৫৪ জনের নাম চূড়ান্ত করেছে দেশটি। এই তালিকা দিয়েই প্রত্যাবাসনটা শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছে মিয়ানমার।

এদিকে মিয়ানমারের এই প্রত্যাবাসন প্রস্তাবের বাস্তবতা খতিয়ে দেখতে আগামী আগস্টে রাখাইন সফরে যেতে চান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী। এজন্য কূটনৈতিক পর্যায়ে এই সফরের দিনক্ষণও ঠিক করার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ চায় রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের বিষয়টি আগে নিশ্চিত করা হোক। তা না হলে কোনো রোহিঙ্গা বাংলাদেশ থেকে স্বেচ্ছায় ফেরত যেতে চাইবে না।

এর আগে রোহিঙ্গাদের ১৯৯২ সালে কোনো ধরনের নিশ্চয়তা ছাড়াই ফেরত পাঠিয়ে কোনো লাভ হয়নি। তারা আবারো মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। এ ছাড়া এবার জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহল বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের শরনার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে চুক্তিও করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ছাড়া রোহিঙ্গাদের এবার মিথ্যা আশ্বাস বা জোর করে ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হবে না। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও রাখাইনের বাস্তবতা নিয়ে আজ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফ করবেন। সেখানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের গড়িমসির বিষয়টি তুলে ধরা হবে।

কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানমারের মিত্র দেশ চীন সরকারও রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে মৌখিক প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু রাখাইনে ফেরার পর রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, বাড়িঘর নির্মাণ, জীবিকা কোনোটিই এখনো নিশ্চিত করেনি মিয়ানমার।

সূত্র জানায়, দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় চীনসহ রোহিঙ্গা সংকটের উৎসাহদাতা বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও দ্রুত ভেরিফাইড রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে প্রতিনিয়ত ঢাকাকে তাগিদ দিচ্ছে। অন্যদিকে মিয়ানমারও দাবি করছে তারা তাদের বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা যাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে তাদের যেকোনো সময় গ্রহণে তারা প্রস্তুত। বাংলাদেশের দেয়া ৮ হাজার ৩২ জন রোহিঙ্গার তালিকা থেকে ২ হাজার ১৫৪ জনের বিষয়ে অনাপত্তি দিলেও মিয়ানমার তাদের প্রত্যাবাসনে এখনো সত্যিকারভাবেও কোনো আগ্রহ দেখায়নি। দেশটি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মোটেও আন্তরিক নয়। যদি তাই হতো তবে, তারা রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সরাসরি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। কিন্তু সেখানে বাড়িঘর বা রোহিঙ্গাদের ধ্বংস করা গ্রামগুলোতে কিছুই করেনি।

সূত্র জানায়, রাখাইনে নিরাপত্তা, দোষী সেনাদের বিচার ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত না করলে রোহিঙ্গারা ফেরত যাবে না। সম্প্রতি জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্থনিও গুতেরেসের বাংলাদেশ সফরকালেও রোহিঙ্গারা এমন দাবি তুলেছে। রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মিথ্যা আশ্বাসে বিশ্বাস করে না। রাখাইনে ফিরে গেলে তাদের নিরাপত্তার জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনী নয়, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাকর্মী রাখতে হবে। রোহিঙ্গাদের দ্বিতীয় দাবি গণহত্যায় জড়িত মিয়ানমার সেনাদের বিচার করতে হবে এবং তৃতীয় দাবি হচ্ছে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার চাইছে রোহিঙ্গাদের যেনতেনভাবে ফিরিয়ে নিতে। অল্প সংখ্যক রোহিঙ্গাদের আপাতত ফিরিয়ে নিয়ে ফের গড়িমসি করা এবং বিশ্বকে জানানো যে, তারা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করেছে। আর বাংলাদেশ চাইছে রোহিঙ্গাদের সঠিক ব্যবস্থা করেই প্রত্যাবাসন শুরু হোক। কারণ, এখন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বিষয়টি এখন আর দ্বিপাক্ষিক নয়, এটি এখন আন্তর্জাতিক ইস্যু।

পররাষ্ট্র সচিব এম শহিদুল হক জানান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাখাইনের প্রস্তুতি দেখতে কাছাকাছি সময়ের মধ্যেই একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে দেশটিতে সফর করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। সেটা ঠিক কবে নাগাদ যাচ্ছেন এ বিষয়ে কোনো ধারণা দেননি তিনি।

মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, মিয়ানমারের সম্মতির অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। যদি সম্মতি মেলে তবে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলটির মিয়ানমার যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। দেশটির মনোভাব এবং প্রত্যাবাসনে গতির ধারণা পেতেই মূলত সফরটি হবে। এদিকে যে সব রোহিঙ্গাকে নিতে মিয়ানমার রাজি হয়েছে তাদের মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশটিকে বিচারের মুখোমুখি করতে শুরু থেকেই দাবি জানিয়ে আসছে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা সম্প্রদায়। এ বিষয়ে জাতিসংঘেরও সম্মতি আছে।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ