রোহিঙ্গা পরিস্থিতি ফের উত্তপ্ত হচ্ছে

রাখাইনে নতুন করে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানে রোহিঙ্গাদের ওপর আবারো গণহত্যা ও নির্যাতন শুরু হয়েছে। ৪ জানুয়ারি দেশটির রাখাইনে পুলিশের ওপর জাতিগত সশস্ত্র বিদ্রোহী বাহিনী আরাকান আর্মির হামলার ঘটনায় ফের এই অভিযান চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী। ভারি অস্ত্রশস্ত্র ও ট্যাঙ্ক নিয়ে রোহিঙ্গাদের গ্রামে ঢুকে পড়েছে সেনারা। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে তল্লাশি ও মারধর করছে সেনারা। আতঙ্কে সেখানে বসবাসরত অবশিষ্ট রোহিঙ্গারাও এখন বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে শতাধিক রোহিঙ্গা পালিয়ে সীমান্তে আশ্রয় নিয়েছে। সুযোগ বুঝে তারাও বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার অপেক্ষায় আছে। এক বছর আগেও একই ধরনের সেনা অভিযানে নতুন করে ৮ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয় মিয়ানমার।

এ ছাড়া ভারত সরকারও রোহিঙ্গা বিতাড়নে অভিযান জোরদার করেছে। রাখাইন থেকে পালিয়ে যেসব রোহিঙ্গা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের ধরে এখন মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো শুরু করেছে ভারত। সম্প্রতি ৭ রোহিঙ্গাকে ধরে মিয়ানমার সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে ভারত। এ কারণে ভারতেও রোহিঙ্গারা আর নিরাপদ মনে করছে না। ফলে তারাও আতঙ্কে ভারত ছেড়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে পালিয়ে আসছে। কক্সবাজারে শরণার্থী, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের অভিযানে গত দশ দিনে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে ১১১টি রোহিঙ্গা পরিবারের ৪৬৮ জন। তারা উখিয়ার বিভিন্ন জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে।

এদিকে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থেমে যাওয়া এবং এক্ষেত্রে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলের ভ‚মিকায় ব্যাপক হতাশার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকেও এ বিষয়ে হতাশা জানানো হয়। বৈঠক সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সব প্রয়োজনীয় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা পুরোপুরি পালন করছে না তারা। প্রত্যাবাসন নিয়ে জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানামরের চুক্তি হলেও তাতে কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। তবে দায়সারা কাজটি করে যাচ্ছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহল।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার বিশেষ দূত ইয়াংহি লি নতুন করে রাখাইন পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ায় রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে আগামী ১৯ জানুয়ারি ৬ দিনের সফরে ঢাকায় আসছেন। তিনি বাংলাদেশে আসার আগে থাইল্যান্ড সফরে যাবেন। সেখানেও তিনি রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখবেন বলে শুক্রবার জেনেভার জাতিসংঘ অফিস এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। এতে বলা হয়, জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংহি লি আগামী ১৪ থেকে ২৪ জানুয়ারি থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ সফর করবেন। তিনি ১৪ থেকে ১৮ জানুয়ারি থাইল্যান্ড এবং ১৯ থেকে ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ সফর করবেন। বাংলাদেশ সফরকালে তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করবেন। এ ছাড়া রোহিঙ্গা নিয়ে কাজ করছেন এমন সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন ইয়াংহি লি। জাতিসংঘের এ বিশেষ দূত গত জুনেও কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। ওই সময়ও তিনি থাইল্যান্ড সফর করেন। বাংলাদেশ সফরের শেষদিন ২৪ জানুয়ারি ইয়াংহি লি সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখবেন। তবে জাতিসংঘ মহাসচিবের এ বিশেষ দূত রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে মিয়ানমার সফরে যেতে চাইলেও মিয়ানমার সরকার তাকে সেদেশে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না। জাতিসংঘ জানিয়েছে, মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন অঞ্চলে জাতিগত বিদ্রোাহী আরাকান আর্মি গোষ্ঠী ও দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ের সংঘর্ষে হাজার হাজার মানুষ বিতাড়িত হয়েছেন।

উল্লেখ্য, রাখাইনে বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসন চায় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বিচ্ছিন্নতাবাদী আরাকান আর্মি (এএ) গোষ্ঠী। গত ৪ জানুয়ারি মিয়ানমারের ৭১তম স্বাধীনতা দিবসকে লক্ষ্য করে রাজ্যটিতে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালায় আরাকান আর্মি গোষ্ঠী। আর এতে ৭ পুলিশ সদস্য নিহত হন। পরে এ হামলার দায়ও স্বীকার করে আরাকান আর্মি। এর মুখপাত্র খাইন তো খা জানান, আরাকান আর্মির সদস্যরা চারটি পুলিশ চৌকিতে হামলা চালান। এখানকার সংখ্যালঘু বৌদ্ধদের জন্য আরো অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সংগ্রাম করছে জাতিগত বিদ্রোহীরা। এ নিয়ে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের প্রথম দিকেও আরাকান আর্মি গোষ্ঠী ও দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়। যা থেকে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।

রাখাইন রাজ্যে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জাতিগত সশস্ত্র বিদ্রোহী বাহিনীকে কঠোরভাবে দমন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। সাম্প্রতিক হামলার পর গত সোমবার দেশটির রাজধানী নেপিদোতে নেত্রী অং সান সুচি, দেশটির প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট, সেনাপ্রধান মিন অং হ্লায়িং, তার উপপ্রধান এবং সেনা গোয়েন্দা প্রধানসহ সেনা নেতারা বৈঠক করেন। এ ছাড়া সেনাপ্রধানের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকেও বসেন সুচি। তখন সুচির প্রশাসন সেনাবাহিনীকে ওইসব জাতিগত বিদ্রোহীদের দমনের আহ্বান জানিয়ে অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব দেন।

মানবকণ্ঠ/এএম

Leave a Reply

Your email address will not be published.