রোহিঙ্গা না, প্রমাণ করেই হতে হবে ভোটার

ভোটার হতে হলে ১৮ বছর কিংবা তার তদূর্ধ্ব বাংলাদেশি নাগরিকদের ‘রোহিঙ্গা যাচাই পরীক্ষায়’ অংশ নিয়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। আগের মতো শুধু নাগরিক সনদপত্র কিংবা বাবা-মায়ের পরিচয় দিয়েই নতুন কেউ ভোটার হতে পারবেন না। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ায় এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চল কিংবা জেলা-উপজেলা নয়, আগামী বছর থেকে ভোটারযোগ্য দেশের সব নাগরিককেই এই পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে।

ইসি সংশ্লিষ্টরা জানান, মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি নিবন্ধিত মিয়ানমার নাগরিকদের পরিচয়পত্রও দেয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা ও সেবা বিভাগের অধীনে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট এবং মেশিন রিডেবল ভিসা (এমআরপি অ্যান্ড এমআরভি) প্রকল্পের তদারকিতে চলছে এই কার্যক্রম। কিন্তু দেশের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান ও সেবা দিয়ে থাকে নির্বাচন কমিশন। তাই পাসপোর্ট অফিসের তত্ত্বাবধানে নিবন্ধন হওয়া রোহিঙ্গাদের ডাটা এবং ইসির অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন ফিঙ্গার সিস্টেমের (এএফআইএস) ডাটা পাশাপাশি রেখে নাগরিকের তথ্য নিশ্চিত হয়ে তারপর সব নাগরিকের ভবিষ্যতে ভোটার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এদিকে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সঠিক নিয়মে করা হচ্ছে কি-না তা সরেজমিন পরিদর্শনে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি উইং) ৪ সদস্যের একটি টিম পাঠাতে আগ্রহী কমিশন। এ লক্ষ্যে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাসুদ রেজওয়ানকে (পিএসসি) এনআইডির সহকারী পরিচালক সিরাজুম মনিরা চৌধুরী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ও ত্রাণ বিতরণের কার্যক্রমের সমন্বয় সংক্রান্ত ১২ সেপ্টেম্বর বিশেষ সভায় প্রধানমন্ত্রী অংশ নেন। সেখানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শনের সময় কিছু দিক-নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। নির্দেশনার মধ্যে রোহিঙ্গা নিবন্ধন করে পরিচয়পত্র প্রদান অন্যতম। চিঠিতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমের প্রক্রিয়াটি নির্বাচন কমিশনের এনআইডির কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা অথবা গৃহীত বায়োমেট্রিক ভবিষ্যতে কাজে লাগানোর ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাই বা সহযোগিতার জন্য একটি প্রতিনিধি দল গঠন করা হয়েছে। গঠিত টিমকে রোহিঙ্গা নিবন্ধন এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনের জন্য অনুমতি প্রয়োজন। চার সদস্যের টিমে রয়েছেন- এনআইডির সিস্টেম অ্যানালিস্ট বেগম ফারজানা আখতার, সহকারী পরিচালক বেগম ফৌজিয়া সিদ্দিক, টেকনিক্যাল এক্সপার্ট এবিএম সালাউদ্দিন সরকার ও টেকনিক্যাল এক্সপার্ট ফয়সাল মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ।

সূত্রমতে, বাংলাদেশে নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের অন্তত ৯২ হাজার ক্যাম্পের বাইরে আছে। তা ছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে ক্যাম্প ছাড়তে চাইছে অনেক রোহিঙ্গা। ক্যাম্প এড়াতে অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে আসছে সাগরপথে। টেকনাফ-কক্সবাজার মহাসড়কে টহল বসানো হলেও রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প ত্যাগ প্রতিহত করা যাচ্ছে না। ক্যাম্প ত্যাগ প্রতিহত করতে বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের উদ্যোগ নেয়া হলেও এ কাজে প্রত্যাশিত গতি আসছে না। যে কারণে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে কমিশন উদ্বিগ্ন। কারণ আশ্রিত সব রোহিঙ্গাকে নিবন্ধন করার পর যদি পদ্ধতিগত ত্রুটি থাকে তাহলে সরকারের নেয়া পুরো প্রক্রিয়াটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। নাগরিকদের ১০ আঙ্গুলের ছাপ নেয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা নিয়ম ও পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়; যাতে তথ্য-পরিচয় গোপন করে অন্যত্র গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেয়ার সুযোগ কম থাকে। এর জন্য পাসপোর্ট অফিসের নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি ইসির সরেজমিন পরিদর্শন ও দেখাটা জরুরি।

পরিচয় গোপন রেখে এনআইডির এক কর্মকর্তা জানান, রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন হওয়া ডাটাসহ সার্ভারের সব তথ্য আমরা পেতে চাই। আগামী বছর থেকে যারা ভোটার হতে চাইবেন তাদের প্রথমে রোহিঙ্গাদের সার্ভারে তথ্য যাচাই করা হবে। পরে এএফআইএস পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট নাগরিকের ইসির ডাটাবেজে তথ্য যাচাই করা হবে। পাসপোর্ট অফিসের নিবন্ধিত এবং এনআইডির সার্ভার দুটি পাশাপাশি রাখা হবে। তথ্যের অসঙ্গতি না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নাগরিককে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর আগে তাকে রোহিঙ্গা নাগরিক নয়, সেটির পরীক্ষা ইসির নিবন্ধন কর্মকর্তাদের কাছে দিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, আমরা রোহিঙ্গা নিবন্ধন কেন্দ্র পরিদর্শনে যেতে চাইছি এ জন্য যে, তারা যে সফটওয়্যার ব্যবহার করছে, ইসির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজটি সম্পন্ন করা হচ্ছে কি-না সেটাই মূল লক্ষ্য। কারণ রোহিঙ্গারা শুধু চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, সারাদেশেই তারা ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে আগামীতে ভোটার তালিকা করা কমিশনের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে। তাই আগাম সতর্কতার অংশ হিসেবে এসব নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের তথ্যভাণ্ডারে ১৬ কোটি নাগরিকের মধ্যে ১০ কোটি ১৭ লাখ নাগরিক ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। চলতি বছরের হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ হলে এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।

মানবকণ্ঠ/এসএস

Leave a Reply

Your email address will not be published.