রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের দিনযাপন

আমিনা খাতুন :
মিয়ানমারের জুম্বই ভুঁইচরের বাসিন্দা আমিনা খাতুন এখন কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালির অস্থায়ী বাসিন্দা। তার স্বামীর নাম সৈয়দ আলম। পাহাড়ের ওপরে ছোট্ট একটি আশ্রয় শিবিরে স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে মাথা গুঁজেছেন তিনি। সহায় সম্বল বলতে কিছুই নেই। কেবল ত্রাণে পাওয়া কিছু খাদ্য ও পণ্য ছাড়া। সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় তিন সপ্তাহ আগে টেকনাফ দিয়ে বাংলাদেশে পরিবারসহ প্রবেশ করেছেন তিনি।
অচেনা একটি দেশে অচেনা পরিবেশে কেমন আছেন আমিনা খাতুন?
জানালেন, এখানে অন্তত মৃত্যু ভয় নেই অথচ নিজ দেশের সেনাবাহিনীর কাছেই এই ভয়টি সবচেয়ে বেশি ছিল। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ আর স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মগদের অত্যাচারে অনেকদিন ধরেই জর্জরিত ছিলেন তারা। কিন্তু এবার সে অত্যাচার তাদের একেবারে দেশ থেকেই বিতাড়িত করেছে। যারা পালিয়ে আসতে পেরেছেন তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে গেছেন। আর যারা আসতে পারেননি, তাদের অধিকাংশই হয় মারা গেছে অথবা প্রতিনিয়ত মৃত্যু ভয়ে আছেন।
আমিনা খাতুনের এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। মেয়েদের সবাইকে বিয়ে দিতে পারেননি। দিন আনি দিন খাই পরিবার ছিল তার। খুব বেশি সচ্ছলতা না থাকলেও অন্তত দু’বেলা খেয়ে-পরে বাঁচতে পারতেন। তবে এবার তো সেটিও আর নেই। বাংলাদেশে এসে সম্পূর্ণ ত্রাণের ওপরই তারা বেঁচে আছেন। এ জন্য এদেশের সরকার, প্রশাসন ও জাতিসংঘের কাছে তিনি কৃতজ্ঞ।

রেজাউর রহমান রিজভী
মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচারে হত্যা ও অত্যাচারে সেদেশ ত্যাগ করে ইতোমধ্যে এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা পুরুষ ও নারী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালিতে রয়েছে বিরাট রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির। এসব আশ্রয় শিবিরে থাকা তিন রোহিঙ্গা নারীর কথা এখানে তুলে ধরা হলো-

আনোয়ার বেগম
আমিনা খাতুনের ভুঁইচর গ্রামেরই আরেক অধিবাসী আনোয়ার বেগম। স্বামীর নাম সৈয়দ আহমদ। মিয়ানমারে তার স্বামী কৃষিকাজ করতেন। সেই আয়েই ১ ছেলে ও ৩ মেয়ে নিয়ে আনোয়ার বেগমের সংসার চলে যেত। তবে অর্থাভাবে কোনো মেয়েরই বিয়ে দিতে পারেননি তিনি। জানালেন, ছেলে বা মেয়ে দিতে হলে মিয়ানমার সরকারকে নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ দিতে হয়। তারা গরিব মানুষ। এই অর্থ জমানো তাদের পক্ষে এখনো সম্ভব হয়নি বলেই তার কোনো ছেলে মেয়ের বিয়ে দিতে এখনো তিনি পারেননি। সরকারকে কী পরিমাণ অর্থ দিতে হয় জানতে চাইলে আনোয়ার বেগম জানালেন এই টাকার অঙ্কের পরিমাণ ২ লাখ থেকে ৬ লাখ মিয়ানমার মুদ্রা হতে পারে। মিয়ানমারে ফিরতে চান কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে দ্ব্যর্থহীনভাবে আনোয়ার খাতুন জানালেন, অবশ্যই তিনি নিজ দেশে ফিরতে চান। হাজার সুবিধা পেলেও এটি তো অন্য দেশ। নিজ দেশেই জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাতে চান পঞ্চাশোর্ধ্ব আনোয়ার খাতুন।

দিলজাহার বেগম
দিলজাহার বেগমের স্বামী ছিলেন জীবনহালি গ্রামের চেয়ারম্যান। তার স্বামীকেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী মেরে ফেলেছে। ৬ ছেলের মধ্যে এক ছেলেকে ধরেও নিয়ে গেছে। সেই ছেলে এখনো বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে সেটা তিনি বা তার পরিবারের কেউই নিশ্চিত নয়। দিলজাহার বেগম জানালেন, এ রকম স্বামী-সন্তান হারানোর শোক রাখাইনের প্রায় পরিবারেই রয়েছে। রোহিঙ্গারা সে দেশে পূর্ণাঙ্গ নাগরিকের মর্যাদা পায় না। নিজ দেশে থেকেও তারা কেমন যেন পরবাসী। এখন অন্য দেশে আছেন ঠিকই, কিন্তু এখানকার মানুষদের আন্তরিকতায় এই দেশটিকেই এখন তিনি আপন করে নিয়েছেন। তবে বাইরের রাষ্ট্র তাদের শান্তিপূর্ণভাবে মিয়ানমার ফেরত পাঠালে তারা অবশ্যই ফিরে যাবেন। কারণ সবার আগে তার নিজের দেশ। তারপর অন্য দেশ।
নিজের দেশে কেমন ছিলেন দিলজাহার বেগম। জবাবে জানালেন, বাৎসরিক ৫০ লাখ কিয়াট (মিয়ানমারের মুদ্রা) আয় ছিল তার। নিজস্ব দোতলা বাড়ি আর বিরাট চিংড়ি ঘের ছিল তার অথচ রাতের আঁধারে চোখের নিমিষে সব হারিয়ে রীতিমতো পথের ফকির এখন তিনি।
তবে এত বঞ্চনার মধ্যেও এদেশে এসে আশার আলো দেখছেন তিনি। এদেশের সরকার ও সেনাবাহিনী অনেক আন্তরিক। প্রয়োজনমতো ত্রাণ পাচ্ছেন তিনিসহ অন্যরা। তবে এসবের বাইরেও কর্মসংস্থানের সুযোগ চান তিনি। কারণ মিয়ানমারে প্রতি মুহূর্তেই তারা কাজে ব্যস্ত থাকতেন অথচ এখন কেবল ত্রাণের আশায় পথ চেয়ে থাকতে হয়।