রোহিঙ্গারা কবে ফিরবে আদৌ ফিরবে তো?

রোহিঙ্গারা কবে ফিরবে আদৌ ফিরবে তো?

রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে আর কতদিন লাগবে? বা তারা আদৌ ফিরবে কি ফিরবে না সেটাই এখনো পরিষ্কার হয়নি। বিগত ঈদুল আজহায় আমাদের মিডিয়া তাদের শিশুদের নতুন পোশাকে ঈদ উদযাপনের খবর দেখালেও আমরা দেখেছি এদের আগমন থামেনি। বরং অতি সম্প তি আগত কাউকে কাউকে দেখলাম বেশ ভালো পোশাক আর চকচকে চেহারায়। এরা অবশ্য রাখঢাক না করেই বলছে তাদের আগমনের হেতু বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা খুব ভালো আছে। তাই তারা চলে এসেছে। এর ভেতর কিন্তু দুটো কথা লুকিয়ে। এক, ভালো থাকতে পারলেই কি তারা আসতে থাকবে আর আমরা তাদের জায়গা দেব? দুই, সমস্যার সমাধান না করে জিইয়ে রাখলে এই আগমনের সে াত কি আদৌ বন্ধ হবে? কিন্তু কারা এর উত্তর দেবেন? রাজনীতিবিদেরা তো একেকবার একেক কথা বলেন। তাদের না আছে জবাবদিহিতা না কোনো স্বচ্ছতা।

রাজনীতি নিয়ে মানুষের তেমন কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। সামাজিক মাধ্যমে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় মানুষ আসলে এখন রাজনীতিবিমুখ। ঘটনা বা অঘটন কিছু না হলে কেউ সেদিকে যায় না। মাথা ঘামায়না। এর চেয়ে ঢের ভালো নিজেদের জীবন ও জীবনের শান্তি বজায় রাখা। তবে এমন কিছু কিছু সমস্যা আছে যা না চাইলেও আমাদের জাতীয় জীবন বা সমাজ থেকে দূরে সরে না। তেমনি এক সমস্যার নাম রোহিঙ্গা সমস্যা। শুরুতে যে আবেগ, যে প্রচার আর যে বোধ তা কি এখন আছে? শুরুতে যখন এমন কথা বলেছিলাম অনেকে বাঁকা চোখে তাকিয়েছিলেন। ভাবখানা এই, আমাদের জন্ম পরিচয় যেহেতু অন্য ধর্মের, আমরা মুসলিম রোহিঙ্গাদের বেলায় উদাসীন। যারা তখন ঘরবাড়ি জমিজমা ছেড়ে দেয়া এমনকি বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ফাটিয়ে দিয়েছিলেন তারা এখন কোথায়? লেজ গুটিয়ে সুড়সুড় করে ঘরে চলে গেছেন? এই অতি আবেগ আমাদের কাল।

এমনকি সরকারি পর্যায়েও আমরা কেবল আবেগের খেলা দেখলাম। শীর্ষ থেকে মাঠ পর্যায়ে ভাত ভাগ করে খাওয়া বা তাদেরকে আপন করে নেয়ার যেসব কথাবার্তা সেগুলোতে সমাধান প্রক্রিয়া ছিল না। বালকবেলায় আমরা যখন নিজেরা শরণার্থী হয়ে ওপার বাংলায় গিয়েছিলাম, দেখেছি কেমন করে তারা আমাদের দিকে তাকাত। এটা ঠিক, তারা আমাদের খাবার-থাকার জায়গা এমনকি আপন করেও নিয়েছিল কিন্তু তাদের নেতারা অঙ্ক কষছিলেন কখন কিভাবে আমাদের দেশে ফেরত দেয়া যায়। সংখ্যাটা রোহিঙ্গাদের তুলনায় অনেক বেশি ছিল বটে, তেমনি ভারতও আকার আয়তন শক্তিতে বড় দেশ । থাক সে প্রসঙ্গ। বলছিলাম আজকে রোহিঙ্গা সমস্যা যেন আমাদের নিয়তি। এখন তা ঘাড়ের ওপর চেপে বসছে। আমরা যত উন্নত আর ডিজিটাল হই না কেন, অত বাড়তি মানুষের চাপ নেয়ার শক্তি নেই আমাদের। চাপের মুখে রাখলে দেশের শান্তি আর উন্নয়ন যে বিঘিœত হবে সেটা জেনেও কারো কারো মত, এতে নাকি চাকরির সুযোগ বেড়েছে। বেড়েছে ব্যবসার পরিধি। এরা বুঝেও বলছেন না এখন যে আন্তর্জাতিক সাহায্য বা সহায়তা সেটাও একসময় থিতিয়ে আসবে। তখন এই মানুষগুলো কোথায় যাবে? কোথায় পাবে তাদের নিরাপত্তা বা স্বাভাবিক জীবন?

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিয়ে আপনি যদি আবেগের বাইরে এসে দাঁড়ান দেখবেন তাদের ইতিহাস সুখকর কিছু নয়। তাদের সঙ্গে মিয়ানমারের বৈরিতার কারণ একাধিক। মিয়ানমার একটি সামরিক প্রভাবের দেশ। এককালে সোনা দানা আর বাণিজ্যের জন্য প্রসিদ্ধ হলেও এখন সেখানে আন্তর্জাতিক চক্র সক্রিয়। চীনের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক ও নিবিড়তা মিয়ানমারের শক্তি। নিন্দুকেরা বলে, এই বিতাড়নের পেছনেও আছে কুটিল রাজনীতি। সেখানে রফতানি বাণিজ্যের বিশাল জোন করার কথা চলছে। তাদের চাই বিশাল এলাকা। হয়তো এই অভিযোগ বানোয়াট। কিন্তু এটা তো মানতে হবে, আজকের দুনিয়ার রাজনীতির মা-বাপ হলো অর্থনীতি। আদর্শ বা নীতিবাক্য এখন অচল। যে যার বাণিজ্য বা লাভালাভের দিকটা দেখে তারপর পা ফেলে। ভারতও আছে জড়িয়ে। তারা তাদের স্বার্থের কারণে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করবে না। ফলে আমাদের দেশের নেতাদের এটা বুঝতে হবে, জাতীয় ঐক্য আর সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান মিলবে না।

আজকাল জাতিসংঘের কথা কেউ মানে না। তারা তাদের মতো করে বলতে থাকে আর যারা শোনার তাদের কান খোলা হলেও হাত বাঁধা। ফলে সমস্যা সমস্যাই থেকে যায়। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের তো ভাগ্য ভালো যে আমরা পাশের দেশ। সিরিয়া বা ইরাকের মানুষেরা কতটা অসহায় একবার ভাবুন। তাদের নেতাদের ঝগড়া বিবাদ আর যুদ্ধংদেহীতায় পাশের দেশগুলো এক ধর্মের বা মানুষগুলো এক ধর্মের হওয়ার পরও তাদের যাবার জায়গা নেই। তারচেয়েও বড় কথা সেসব দেশের রাস্তাঘাট হাসপাতাল শিশুদের জীবন বিপদে থাকার পরও কেউ সমাধান দেয় না। এককালে আমরা ভাবতাম আমেরিকা বিরুদ্ধে থাকলে রাশিয়া আছে। রাশিয়া আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তেমন ভূমিকা পালনও করেছিল। রাশিয়া বিরুদ্ধে থাকলে আমেরিকা টাকা আর অস্ত্র দিত। যেমন পাকিস্তান। কিন্তু আজ সেদিন গত। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশে আমেরিকা আর রাশিয়ার ভূমিকা অদ্ভুত। এরা যে মিয়ানমারের বেলায় কঠিন হবে বা সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসবে এমনটা ভাবা অযৌক্তিক। কাজেই নিজের শক্তি আর কূটনৈতিক কৌশলেই পথ খুঁজে নিতে হবে আমাদের।

আবেগের বাইরে সমাধানের রাস্তা না খুঁজলে এই সমস্যা বিষফোঁড়া হবেই। মানুষ দুনিয়ার সেরা জীব মুখে বললেও মানুষ তা মানে না। মানলে নিরীহ শিশু বা নারীদের ওপর এমন অনাচার করতে পারত না মিয়ানমার। যেসব শিশু বাংলাদেশে আসার আগে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া পিতাকে আর দেখেনি, এসে মাকে হারিয়ে এখন ক্যাম্পে অনিশ্চিত জীবনযাপন করছে তারা যদি ফেরত না যায় তাদের মানসিক স্বাস্থ্য বা বড় হওয়াটা কেমন হতে পারে? সেটা যারা জানেন বা বোঝেন তাদের আতঙ্ক যেন সত্য না হয়। আমাদের সমাজ ও রাজনীতি উদ্দেশ্যপ্রবণ। কোনোকিছুই উদ্দেশ্য ছাড়া হয় না। রোহিঙ্গা নিয়ে যে ধর্মীয় ও সামাজিক আবেগ তাকে নিয়েও খেলছে রাজনীতি। আমাদের দেশ ও সমাজের মঙ্গলের জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের প্রত্যাবর্তন জরুরি। সেটা না হলে কূটনীতি যেমন ব্যর্থ হবে তেমনি দেশের মঙ্গলও পড়বে তোপের মুখে।

শেখ হাসিনার সরকারের নানাবিধ সফলতা আর অর্জনের কারণে বহির্বিশ্বে আমাদের ইমেজ এখন ভালো। এই ভালোদিকটা কাজে লাগিয়েই কিন্তু লবিং করা যায়। মুশকিল হলো আর সব বিষয়ের মতো এখানেও যোগ্য মানুষ আসল জায়গায় নেই। স্তাবকতা আর রাজনৈতিক অনাচারের কারণে রোহিঙ্গা সমস্যায় আমাদের কোনো ঐক্য নেই। একেক দলের একেক মত। জাতীয় ঐকমত্যের কোনো সুযোগও নেই। সরকারি দল বলছে সব ঠিক আর বিরোধীরা বলছে কিছুই ঠিকঠাক নেই। মাঝখানে জনগণের টাকা বা দান-অনুদানে রোহিঙ্গা সমস্যা ক্রমেই আমাদের ঘাড়ের ওপর সিন্দবাদের ভূতের মতো চেপে বসছে। আবেগের বাইরে এসে সমস্যার সঠিক সমাধান কি দিতে পারবে আমাদের দেশের নেতৃত্ব? রোহিঙ্গারা বাংলাদেশকে সেফ হেভেন মনে করলেও আখেরে তাদের দেশই তাদের ঠিকানা। এটাই বুঝতে হবে সবাইকে।
– লেখক: সিডনি প্রবাসী

মানবকণ্ঠ/এসএস