রোহিঙ্গাদের একাল সেকাল

রোহিঙ্গাদের একাল সেকাল  ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু মুসলমানদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্বাধীন দেশের সরকার আজ পর্যন্ত তাদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার দেয়নি। অত্যাচার নির্যাতন ও বিতাড়নের মুখে বহু রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহুদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এরা বিশ্বের রাষ্ট্রহীন নাগরিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রোহিঙ্গাদের অবস্থান ছিল মিত্র বাহিনীর পক্ষে। ১৯৪২ সালের মধ্য জানুয়ারির দিকে জাপান বার্মা আক্রমণ করে।

১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে এই তিন বছরে শুধুমাত্র বার্মায় জাপানি সেনাদের হাতে অন্তত ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। যার ফলে ১৯৪৬ সালের মে মাসে রাখাইন প্রদেশের মুসলিম রোহিঙ্গা নেতৃবৃন্দ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে দেখা করেন। তাদের প্রস্তাব ছিল রাখাইন প্রদেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত করে বুথিডং ও মংদৌ নামে দুটি শহরের একত্রীকরণ। এর দুই মাস পর রোহিঙ্গা মুসলিম নেতৃত্ব আকিয়াবে নর্থ আরাকান মুসলিমলীগ গঠন করে। আর তারা পাকিস্তানের সঙ্গে আলাদা প্রদেশ হিসেবে বার্মা থেকে আলাদা হওয়ার চেষ্টা করে। আর তাদের এই আলাদা হওয়ার প্রচেষ্টা বার্মার সরকার বিশ্বাসঘাতকতার সাথে তুলনা করে রোহিঙ্গাদের উপর তখন থেকেই নির্যাতনের স্ট্রিমরোলার চালাতে শুরু করে যার রেশ এখনও শেষ হয়নি।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বার্মা ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে আর তখন থেকেই রোহিঙ্গাদের স্বাধীনতার দাবি ধীরে ধীরে সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে যায়। কিন্তু কোন বাস্তবিক ফলাফল তারা অর্জন করতে পারেনি। ১৯৬২ সালে বার্মায় সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে। ১৯৭৮ সালে জেনারেল নে উইন বার্মার রাখাইন প্রদেশে মুসলিম সশস্ত্র রোহিঙ্গাদের দমন করতে ‘অপারেশন কিং ড্রাগন’ পরিচালনা করে। সাড়ে তিন হাজার ফুট উঁচু ভিক্টোরিয়া পাহাড়ের কারণে মিয়ানমারের মূল কেন্দ্র থেকে উত্তর-পশ্চিমের রাখাইন প্রদেশ বা আরাকান অঞ্চল কিছুটা বিচ্ছিন্ন। আর এই সুযোগটি তখন থেকেই ব্যবহার করছে রোহিঙ্গা সংগঠনগুলো।

১৯৬৪ সালে রোহিঙ্গাদের সব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয় এবং ১৯৬৫ সালের অক্টোবর থেকে Burma Broad casting Service থেকে প্রচারিত রোহিঙ্গা ভাষার সব অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই বার্মা সরকার ১৯৭৩ সালে উত্তর আরাকানে Major Aung Than operation ও ১৯৭৪ সালে Sabe operation নামে রোহিঙ্গা উচ্ছেদ অভিযান চালায়। ফলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা জীবন রক্ষার্থে যুদ্ধবিধ্বস্ত দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশে এসে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করে। অর্থাৎ আজ পর্যন্ত কোন সরকারই রোহিঙ্গাদের নুন্যতম অধিকার স্বীকার করনি। সময় সুযোগ পেলেই তারা অত্যাচার , নির্যাতন, উচ্ছেদ, হত্যা , ধর্ষন সব কিছুই অব্যাহত রেখেছে।

১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৯০, ২০১২, ২০১৬ এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালে তাদের হিংস্রতার থাবা চূড়ান্ত রুপ লাভ করেছে। তারা নিজ গ্রামে উন্মুক্ত কারাগারে বসবাস করে। তাদের নেই কোন শিক্ষার অধিকার, নেই ব্যাবসা বাণিজ্যের অধিকার, নেই চিকিৎসার অধিকার। তারা বিশাল এই পৃথিবীতে আশ্রয়হীন, রাষ্ট্রহীন নিগৃহীত এক জনগোষ্টী। তাদের শিক্ষা ব্যাবস্থা বন্ধ করে দেওয়ায় কোন শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারেনি। ফলে তারা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য কোন সংগঠিত প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে ব্যার্থ হয়েছে।

এখন বাংলাদেশ এবং রোহিঙ্গা উভয়কেই কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে হবে। যর মাধ্যমে এই তীব্র সংকট মোকাবিলা করে একটি স্থায়ী সমাধান করে রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হতে পারে। রোহিঙ্গাদের যে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া দরকার তা হলো একটি শক্তিশালী কার্যকরী পরিষদ গঠন করে আর্ন্তজাতিক মঞ্চে তাদের শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। তাদের ডাটাবেজ তৈরী করে মৌলিক অধিকার আদায়ে জাতিসংঘের সাথে যৌথভাবে কাজ করা। সাধারন নাগরিক যেন ধ্বংসাত্বক কার্যক্রমে লিপ্ত না হয় তার মনিটরিং করা। মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে সকল অপরাধ মূলক কর্মকান্ডের সচিত্র প্রমাণ হাজির করে আর্ন্তজাতিক আদালতে মামলা করার ব্যবস্থা করা। বিশ্ব জনমত গঠন করার জন্য একটি বাস্তব ভিত্তিক উদ্দোগ গ্রহণ করে মায়ানমার সরকার যাতে এই সমস্যা সমাধানে বাধ্য হয় তার জন্য প্রচলিত বৈধ আইনে সামরিক এবং বেসামরিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া। নিজেদের মধ্যে সকল অর্ন্তকলহ দুর করা। আর বাংলাদেশ সরকার যা করতে পারে তা হলো জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর মাধ্যমে তাদের আগমন বন্ধ করা, রোহিঙ্গাদের কে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে মায়ানমার সরকার কে প্রবলবেগে চাপ দেওয়া, নির্যাতন বন্ধে। আর্ন্তজাতিক ব্যবস্থা নেওয়া , আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়কে সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভাবে সক্রিয় করা , অন্য সকল সমাধানের পথ অকার্যকর হলে শেষ ব্যাবস্থা হিসেবে আমাদের স্বধীনতা স্বার্বভৌমত্ব কে রক্ষার জন্য রোহিঙ্গা যুবকদের কে তাদের অধিকার আদায়ে সামরিক সহায়তা প্রদানের যাবতীয় ব্যাবস্থা করা।

যেভাবে ১৯৭১ সালে ভারত আমাদের কে সহযোগিতা করেছিলো। কারন আজ আমরা মানবিক কারনে তাদের সহযোগিতা করলেও কুচক্রী সাম্রাজ্যবাদী মহল এটাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করবে না এর নিশ্চয়তা কে দিবে ! সুতারাং এই সমস্য সমাধানে আমাদেরকেই সকল পন্হা অবলম্বন করতে হবে। আমদের মনে রাখতে হবে আমরা মুসলিম আমাদের সাহায্যে বিনাস্বর্থে কেউ এগিয়ে আসবে না। পূর্ব তিমুরের কথা মনে রাখতে হবে, ভুললে চলবে না দক্ষিণ সুদানের কথা আমরা ফেলে দিতে পারবো না ১৯৪৮ সালের পূর্বে স্বাধীন ফিলিস্তিনের কথা। নিকট অতীতে সিকিম, হায়দারাবাদ এর পরিণতি আমাদের জানা আছে। সুতারাং আমাদের সমস্যার সমাধান আগে আমাদেরকেই করতে হবে। তারপর অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারবো।

লেখক- অ্যাড. হাবিবুর রহমান হাবিব
এ্যাডিশনাল ডাইরেক্টর সোসাইটি ফর হিউম্যান রাইটস, ঢাকা
[email protected]