রোগীর বিদেশ যাওয়ার যত কারণ

বিশ্বাস, ব্যবহার আর আচরণ- এ তিন গুণ বাংলাদেশি রোগীদের টেনে নেয় বিদেশে। এছাড়া ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার প্রতি অনাস্থাও বড় একটি কারণ। প্রতিবছর ঠিক কত মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান এর সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বিভিন্ন সংস্থার দাবি, প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে বিদেশে যান। অর্থাৎ বছরে এ সংখ্যা এক লাখ ৮০ হাজার থেকে দুই লাখ ৪০ হাজার প্রায়।
বিদেশে গিয়ে চিকিৎসাসেবা নেয়ার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে তিন শতাধিক এজেন্ট ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এজেন্টদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে অনেক দেশীয় চিকিৎসক রোগীদের বিদেশে (নিজেদের চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে) যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বিদেশগামী রোগীদের ৭০ শতাংশই যান ভারতে। অন্যরা যান থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে। তাদের মধ্যে অনেকেই ভ্রমণ ভিসা নিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। বিদেশে চিকিৎসা নিতে ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে যাওয়াদের তালিকায় আছেন- মন্ত্রী, এমপি, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
জানা গেছে, এজেন্ট ভূমিকায় কাজ করা রাজধানীর ধানমণ্ডির এমন একটি প্রতিষ্ঠান ইনটেক্স কেয়ার (গ্লোবাল ট্রেড লিংক)। জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ভারতের বিখ্যাত হাসপাতালগুলো হার্ট, ক্যান্সার, কিডনি চিকিৎসা, লিভার চিকিৎসা, বাইপাস সার্জারি, হাঁটুর অপারেশন, বোনম্যারো প্রতিস্থাপনসহ সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করানোর কাজ করে থাকেন। এছাড়া তারা মেডিকেল ভিসা সহায়তা ও এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করান। এজন্য তারা মাঝে মধ্যে এ সংক্রান্ত সহায়তার কথা তুলে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেন। এছাড়া মহাখালীতে অবস্থিত জিডি অ্যাসিস্ট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটি বিদেশে রোগী পাঠায়। মূলত তারা মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাসেবার জন্য বাংলাদেশ থেকে রোগী পাঠায়। জানা যায় প্রতিষ্ঠানটি ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, ভিসা প্রসেসিং এবং রোগী কোন হাসপাতালে যাবেন- এসব বিষয়ে কাউন্সিলিং করে থাকেন। এ বাবদ তারা কোনো ফি নেন না। তবে ভিসা প্রসেসিং বাবদ আড়াই হাজার টাকা দিতে হয় রোগী বা তার অভিভাবককে।
প্রতি বছর এত মানুষের বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার কারণ খুঁজতে গেলে বিদেশগামী রোগী ও তাদের স্বজনরা দেশের অনুন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা, চিকিৎসার নামে বাণিজ্য, সঠিক রোগ নির্ণয়ে ব্যর্থতা, চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টদের অবহেলা, রোগীদের সঙ্গে চিকিৎসকদের আশানুরূপ ব্যবহার না করা, ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে চিকিৎসকের কমিশন নেয়া, ওষুধ কোম্পানি থেকে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ব্যবস্থাপত্রে মানহীন ওষুধ লেখা, চিকিৎসকরা ব্যবস্থাপত্রে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখা, অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেও ভালো চিকিৎসা না পাওয়া, অযথা রোগ নির্ণয় পরীক্ষার পরামর্শ ও রোগ নির্ণয় পরীক্ষার উচ্চমূল্যসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন। তাদের মতে দেশে একেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একই রোগীর পরীক্ষার একেক ধরনের ফল মিলে। থাকে টাকার ব্যবধানও। ভুল চিকিৎসা হয় অনেক ক্ষেত্রে। এছাড়া রোগীকে সময় কম দেয়া, বাড়তি আয়ের জন্য রোগীকে অতিরিক্ত সময় কেবিন বা বিছানায় রাখার প্রবণতা তো রয়েছেই। তারা জানান, এসব কারণেই দেশে চিকিৎসা নেন না তারা।
বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা কম-বেশি সবারই জানা। অভিযোগের অন্ত নেই এ খাত নিয়ে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ সরকারি হাসপাতালগুলো নিয়ে। সরেজমিন দেখা গেছে, অনেক সরকারি হাসপাতালেই ঢোকা যায় না দুর্গন্ধের কারণে। হাসপাতালের বাথরুমে ছিটকিনি থাকে না। সর্বত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব। সূত্র জানায়, এসব হাসপাতালে গরিবের জন্য বরাদ্দকৃত ওষুধ নিয়মিত বেঁচে দেয়া হয় খোলাবাজারে। এছাড়া সরকারি হাসপাতালে বেড পাওয়া ভাগ্যের বিষয়। আবার বেড পেতে দিতে হয় উৎকোচ। অস্ত্রোপচারের পর রোগীর পেটে অস্ত্রোপচারের ধারালোসহ অন্যান্য সরঞ্জাম রেখে সেলাইয়ের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। রোগীদের দেহে কোনো যন্ত্র স্থাপনের ক্ষেত্রে আসল যন্ত্রের টাকা নেয়া হলেও লাগানো হয় নকল ও কমদামি যন্ত্র। অনেক সময়ই ভুল অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার কারণে বিপন্ন হয়ে ওঠে রোগীর জীবন। হাসপাতালগুলোয় রয়েছে দালালের দৌরাত্ম্য। তুচ্ছ ঘটনায় ধর্মঘট-কর্মবিরতি ডাকেন চিকিৎসক ও কর্মচারীরা। এই যখন সরকারি হাসপাতালের চিত্র, তখন বেসরকারি পর্যায়ে গড়ে ওঠা হাসপাতালগুলোর মূল লক্ষ্য ব্যবসা। সময়মতো চিকিৎসক না পাওয়া ও ভুল চিকিৎসাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে এসব হাসপাতালের বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশে চিকিৎসায় বিদ্যমান অনিয়ম, মানহীন চিকিৎসা সেবা, চিকিৎসায় বাড়তি ব্যয়সহ নানাবিধ কারণে বাংলাদেশি রোগীরা ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা অন্যান্য দেশে যাচ্ছেন। সাধারণের অনেকেরই ধারণা তারা দেশে সুচিকিৎসা পাচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে অনেক সময় চিকিৎসকরা হয়তো সুচিকিৎসা দিচ্ছেন না। তাছাড়া চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর একটা সম্পর্কের ব্যাপার আছে। চিকিৎসকের লক্ষ্য সবসময় হওয়া উচিত রোগীর সন্তুষ্টি অর্জন। সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে শুধু রোগমুক্তি নয়, চিকিৎসকের আচার-ব্যবহার-নৈতিকতা সব বিষয়ই যুক্ত। চিকিৎসক একটু ভালো কথা বললে, সহমর্মী হলে, তারা অনেক ভালো অনুভব করেন।