রেলপথেও মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে

মহাসড়কের পাশাপাশি রেলপথেও মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে রেলের পূর্বাঞ্চলে রেললাইনে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৩০৪ জনের। এরই মধ্যে শুধুমাত্র এবারের ঈদ যাত্রার ১১ দিনে ৩৩ জন মারা গেছেন। কিন্তু যাত্রী কল্যাণ পরিষদের দাবি, মৃত্যুর এ সংখ্যা আরো বেশি। আইন অমান্য করে রেললাইন ধরে হাঁটার কারণে মৃত্যুর হারও বাড়ছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৪ বছরে পূর্বাঞ্চলে রেল দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৮১৩ জনের। এর মধ্যে গত বছরই মারা গেছে ৮১২ জন।

বাহন হিসেবে রেল নিরাপদ হলেও সাধারণ মানুষের কাছে রেলপথ ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রেলকেন্দ্রিক মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে। জিআরপির সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১০ জুন থেকে শুরু হয় ঈদের যাত্রা। আর এ যাত্রার ১১ দিনে মারা গেছে ৩৩ জন। কমলাপুর স্টেশন থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ঢাকা অংশকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ অংশে ট্রেনের ধাক্কা এবং ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছে ১৬ জন। এর বাইরে ভৈরবে ৬ এবং চট্টগ্রাম অংশে ৪ জনের মৃত্যু হয়।

রেলওয়ে (পূর্বাঞ্চল) জিআরপির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ শরীফুল ইসলাম বলেন, ১২টি ঘটনার মধ্যে ১০টি ঘটনাই ট্রেনলাইন পারাপারে। রেলওয়ের লেভেল ক্রসিংয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। শুধু ঈদের সময় নয়, চলতি বছরের প্রথম ৫ মাসে ৩০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে । এর মধ্যে মে মাসে সবচেয়ে বেশি ৭৩ জনের মৃত্যু হয়। যাত্রী কল্যাণ পরিষদের দাবি, প্রতি বছর রেলওয়ে পূর্ব এবং পশ্চিম জোনে অন্তত ২ হাজারের বেশি লোক মারা যাচ্ছে রেল দুর্ঘটনায়।

এর আগে চলতি বছরে রমজানের ঈদে ট্রেনে কাটা পড়ে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা অংশে মারা যান ১৬ জন। যাত্রী সংখ্যায় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় স্টেশনে ট্রেন পৌঁছার আগেই হুড়োহুড়িতে ট্রেনে কাটা পড়ার ঘটনা বেশি ঘটছে বলে জানিয়েছেন ট্রেনের ইঞ্জিন চালকরা।
রেলওয়ে ইঞ্জিনচালক মোহাম্মদ হানিফ বলেন, মূলত দৌড়াদৌড়ির কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং ট্রেনের ফুট প্লেটে ও কোচের ফুট প্লেটসহ সব জায়গায় দাঁড়ানোর কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে।

যাত্রীদের তাড়াহুড়ার পাশাপাশি আইন না মানার প্রবণতায় রেল দুর্ঘটনার মূল কারণ বলে মনে করছেন চট্টগ্রাম জিআরপি থানার অফিসার ইনচার্জ মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, যখনই একটি ট্রেন আসে, আপনি দেখবেন সেই ট্রেনে ওঠার জন্য যাত্রীদের মধ্যে তীব্র হুড়োহুড়ি দেখা যায়। আর এ প্রতিযোগিতা থেকে আমাদের ফেরত আসতে হবে। রেল দুর্ঘটনায় বিচারের তেমন নজির নেই। শুধুমাত্র পুলিশের পক্ষ থেকে একটি অপমৃত্যু মামলা করা হয়। আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে পরবর্তী সময়ে এসব মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়।

২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে মহাখালী রেলগেট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, রেলপথ ধরে হাঁটছে কয়েকশ’ মানুষ। রেলগেটের নিরাপত্তা বার ফেলার পরও দৌড়ে পার হচ্ছে অনেকেই, কেউ কেউ মোটরসাইকেল চালিয়েও যাচ্ছেন এপাশ থেকে ওপাশে। রেলগেটের উত্তর পাশে এর কয়েক দিন আগেই মারা গেছেন এক যুবক।

মহাখালী রেলগেটের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রায়ই এই এলাকায় ট্রেনের নিচে পড়ে মানুষ মারা যায়। দুর্ঘটনার মূল কারণ মুঠোফোন উল্লেখ করে তিনি বলেন, কথা বলতে বলতে মানুষ পার হয়, ডাকলেও শোনে না। অনেক সময় নিষেধ করলে খারাপ ব্যবহার করে।

নির্ধারিত রেলক্রসিং ছাড়া রেললাইন ধরে হাঁটা ও বসা নিষিদ্ধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, রেললাইনের দু’পাশে ১০ ফুট করে ২০ ফুটের মধ্যে সব সময় ১৪৪ ধারা জারি থাকে। এই সীমানার ভেতর কোনো ব্যক্তিকে পাওয়া গেলে তাকে গ্রেফতার করা যাবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ট্রেনের ইঞ্জিনের শব্দ কম, দ্রুতগতিতে চলে এবং অল্প দূরত্বে থামতে পারে না। এজন্য দুর্ঘটনা ঘটে। আর মুঠোফোনে ব্যস্ত থাকলে এ দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরো বেড়ে যায়। অধ্যাপক মোয়াজ্জেম ট্রেনে কাটা পড়ার জন্য বিনোদন মাধ্যমকেও দায়ী করেন। অনেক নাটক, সিনেমায় দেখা যায় রেললাইনে মানুষ হাঁটে, গান গায়, বসে থাকে। এমন শুটিং থেকে বিরত থাকতে হবে। রেললাইন শুটিংয়ের জায়গা নয়। আর শুটিং করলেও প্রচারের সময় পর্দায় সতর্কতামূলক বাণী লিখে দিতে হবে। এ ধরনের দুর্ঘটনা কমাতে তার সুপারিশ, জনবহুল জায়গায় লোহার বেড়া দিতে হবে। সম্ভব না হলে রেললাইনজুড়ে সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান তিনি।

রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি শামসুদ্দীন জানিয়েছেন, রেললাইন বা রেলক্রসিংয়ে যে কোনো মৃত্যু রোধ করতে রেলওয়ে পুলিশ তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রতিনিয়ত সচেতনতামূলক প্রচারণা, পোস্টারিং, লিফলেট বিতরণ, মাইকিং সবই করা হচ্ছে। কিছু কিছু ফলও আমরা পাচ্ছি। কিন্তু মানুষ সচেতন না হলে এ ধরনের মৃত্যু তো বন্ধ করা যাবে না।

তিনি বলেন, রেললাইনের আশপাশে অবৈধ স্থাপনা, বসতি, বস্তি উচ্ছেদ করা হয় বার বার। কিন্তু ছিন্নমূল মানুষ ফের আশ্রয় নেয় রেললাইনের পাশেই। ফলে এসব ঝুঁকিপূর্ণ বসতি রেললাইনে মৃত্যুর হার বাড়াচ্ছে। এ ছাড়া সিগন্যাল না মেনে ক্রসিং পার হওয়ার মতো নাগরিক অসদাচরণও দুর্ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে। এটা একদমই কাম্য নয়।

রেলওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, ট্রেনে কাটা পড়ে বা অন্য দুর্ঘটনায় মৃত্যুর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হচ্ছে মানুষের অসচেতনতাকে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, শুধু অসচেতনতার কারণে ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ হারাচ্ছেন আর পঙ্গু হচ্ছেন লোকজন। মনে রাখতে হবে, ট্রেন তার নিজস্ব পথে চলে। তার পথ কোনো অবস্থাতেই মানুষের হাঁটাচলার পথ হতে পারে না। কিন্তু মানুষ তার পথ ধরে হাঁটে, গল্পগুজব করে, তার পথের পাশেই বসতি গড়ে, বাজার বসায়। এমনকি রেললাইন ঘিরে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে। ফলে রেললাইন ধরে অসতর্কভাবে হাঁটছে মানুষ। এজন্য শুধু আইন দিয়ে নয় সচেতনতা দিয়েই রেললাইনে মর্মান্তিক মৃত্যু কমাতে হবে এবং এটা সম্ভব।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ