কোচিং বাণিজ্য অবৈধ

রায়কে স্বাগত জানিয়েছে অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা

কোচিং বাণিজ্য বন্ধে ২০১২ সালে সরকারের নীতিমালা বৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা। তারা বলছে, দেরিতে হলেও সরকার এটি বন্ধের জন্য যে নীতিমালা করেছিল, তার বৈধতা দিল উচ্চ আদালত। এতে বিদ্যালয়গুলোতে এবার শিক্ষকরা পাঠদানে মনোযোগী হবেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও পরীক্ষায় আরো ভালো করতে পারবে।

উল্লেখ্য, স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে ২০১২ সালে প্রণীত সরকারের নীতিমালা বৈধ ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। গত বৃহস্পতিবার দেয়া এ রায়ের ফলে সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা-২০১২’ কার্যকর হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে শিক্ষকদের ছাত্র পড়িয়ে অর্থ আয়ের পথ সীমিত হচ্ছে। সরকারি-বেসকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের জন্যই এই নিয়ম হচ্ছে।

২০১২ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা ওই নীতিমালায় বলা হয়, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ছাত্রছাত্রীর তালিকা, রোল, নাম ও শ্রেণি উল্লেখ করে জানাতে হবে।

নীতিমালায় বলা হয়, অভিভাবকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠান প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করতে পারবেন। এক্ষেত্রে মহানগরী এলাকার প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসে তিনশ’ টাকা, জেলা পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দুইশ’ টাকা এবং উপজেলা ও অন্য এলাকার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দেড়শ’ টাকা নেয়া যাবে। তবে প্রতিষ্ঠান প্রধান ইচ্ছা করলে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের এই অতিরিক্ত কোচিংয়ের টাকা কমাতে বা মওকুফ করতে পারবেন বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী অতিরিক্ত ক্লাসের ক্ষেত্রে একটি বিষয়ে মাসে কমপক্ষে ১২টি ক্লাস নিতে হবে, প্রতি ক্লাসে সর্বোচ্চ ৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারবে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, কোচিং বাণিজ্য অনুসন্ধান এবং তদন্ত করার এখতিয়ার দুদকের আছে। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি অগ্রাধিকার তালিকা থাকতে হবে, কোন বিষয়ে কমিশন তদন্ত বা অনুসন্ধান করবে। কেননা দুদকের পর্যাপ্ত জনবল সংকট রয়েছে। কাস্টমস হাউস, ব্যাংক, বন্দর, ভ‚মি অফিসের দুর্নীতির বিষয়ে ছোট পরিসরে তদন্ত বা অনুসন্ধানে সুযোগ নেই দুদকের। এসব খাতে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অগ্রাধিকারভিত্তিতে এ ধরনের অভিযোগে নজর দিতে হবে।

এ ব্যাপারে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. হারুন উর রশীদ বলেন, ‘পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রের কোথাও কোচিং সেন্টার নেই। এমন দেশ আছে তাদের শিক্ষার্থীরা স্কুলেই দিনের পড়াশুনা শেষ করে বাড়ি যায়। বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নেয়। বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে মগ্ন থাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানকে আরো আধুনিক করতে হবে। শিক্ষকদেরও মানোন্নয়নে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মনিজা রহমান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী শায়লা কাকলী বলেন, ‘সারাদিন স্কুল পড়ে আবার কোচিং সব মিলিয়ে আমরা প্রচণ্ডচাপে থাকতাম। এখন আমাদের শিক্ষকরা যদি শ্রেণিকক্ষেই ভালো করে অঙ্ক, ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিষয় বুঝিয়ে দেন তাহলে বাসায় গিয়ে একটু রিভাইস দিলেই হয়ে যাবে।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা যখন স্কুলে পড়তাম তখন কোচিং কী জিনিস আমাদের অভিভাবকরা জানতেনই না। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলব শ্রেণিকক্ষেই নিজের পড়াটা বুঝে নিবে। এখনকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা প্রবণতা আছে শিক্ষকের লেকচার না বুঝলে তারা পুনরায় শিক্ষকদের কাছে বুঝতে চান না। শিক্ষার্থীদের এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদের সন্তানের পড়াশোনার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুদ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আদালতের রায় দিয়ে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করার মাধ্যমে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নানামুখী। ছোট ছোট বাচ্চাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে পাঠ্যপুস্তকে বোঝাইকৃত ব্যাগ। দেশে বিভিন্নমুখী শিক্ষাব্যবস্থা দূর করার জন্যও সরকারের আরো একটি নীতিমালা প্রয়োজন। এখন শিক্ষদেরও পাঠদানে আরো মনযোগী হওয়া প্রয়োজন।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আনোয়ারা মাহমুদ জানান, সরকারের সদিচ্ছা ছিল বলে আজকে এই রায় পেয়েছি আমরা। এই রায়ের বাস্তবায়নে সরকার অভিভাবক শিক্ষার্থী সবার জোরালো ভ‚মিকার প্রয়োজন হবে। হাইকোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মাসুদুজ্জামান বলেন, ‘এই রায়ের ফলে শিক্ষার মানের সমতা আসবে। ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠা কোচিং বাণিজ্যের ফলে দরিদ্র শিক্ষার্থী আর অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ যোগাতে হিমশিম যোগাত। এখন অভিভাবকরাও কিছুটা ভারসাম্য পাবেন। দেশের বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক ও অভিভাকদের দেখা গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

ভিকারুনন্নেসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক শিক্ষিকা শামসুন আরা বেগম বলেন, ‘কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করলেই হবে না। এর সঙ্গে শিক্ষার মানোন্নয়নে সবাইকে আন্তরিক হতে হবে।’

পুরান ঢাকার ল²ীবাজারে ইসলামিয়া উচ্চ বিদালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আফসানা নূর বলেন, ‘এই রায়কে স্বাগত জানাচ্ছি। এর ফলে অভিভাবকরা কোচিং দৌরাত্ম্য থেকে স্বস্তি পাবে। শিক্ষার্থীরাও নিজেদের পড়াশোনার প্রতি আরো মনযোগী হবে।’ মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীর অভিভাবক আবদুস সালাম বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এটি ভালো কাজ হয়েছে। তবে শঙ্কাও আছে এর সঠিক বাস্তবায়ন হবে কিনা। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। সব প্রতিষ্ঠানে ভালো মানের শিক্ষক নেই। এ দিকটিও সরকারের নজর দিতে হবে।’
৪১ তম বিসিএস পরীক্ষার্থী আরিফুর রহমান বলেন, ‘দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কোচিং থেকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে মনোযোগী থাকাটা বেশি জরুরি। কিন্তু আমরা যারা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার জন্য কোচিং করে থাকি এটা বন্ধ হলে পড়াশোনায় মনোযোগে কিছুটা ঘাটতি আসবে।’

দেশের শীর্ষস্থানীয় কোচিং সেন্টার সাইফুরস এর পুরান ঢাকা ব্রাঞ্চের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসম্পন্ন পাঠদানের অভাবে কোচিং সেন্টারগুলো গড়ে উঠেছে। আদালত এর বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। আদালতের রায়ের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা থাকবে নিশ্চয়ই। কোচিং প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরা এ সম্পর্কে ভালো বলতে পারবেন।

মানবকণ্ঠ/এমম