রাষ্ট্রপতির ‘অগৌরবের’ ভাষণ

শনিবার ৪ মার্চ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তন। সে অনুষ্ঠানে ভাষণ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে এ অনুষ্ঠানটি খুবই সমারোহে অনুষ্ঠিত হয়েছে। পদাধিকার বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এখন মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। চ্যান্সেলর সাধারণত খুবই জ্ঞানগর্ভ লিখিত ভাষণ প্রদান করে থাকেন। যেখানে সাধারণত নিজের ব্যক্তিগত কথা বলার অবকাশ কম থাকে। যারা ছাত্রজীবনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি হয়ে পদাধিকার বলে চ্যান্সেলর হয়েছেন তারা অনেকে এখানে অতিথি হয়ে এসেছেন অতীতে। নিজেদের গৌরবের কথা শুনিয়েছেন কিছুটা। কিন্তু শনিবারের ঘটনা ছিল ব্যতিক্রম। আবদুল হামিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন না। তিনি শুনিয়েছেন তার অগৌরবের কথা।
আমাদের রাষ্ট্রপতি ব্যক্তিগত জীবনে উকিল ছিলেন। তার লেখাপড়া সবই হয়েছে তার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জে। রাষ্ট্রপতি তার লিখিত ভাষণ শেষ করার আগে অলিখিত কিছু বক্তব্য দিয়েছেন। এর সবই ছিল তার ব্যক্তিগত জীবনের কথা এবং সবই ছিল তার নিজের অগৌরবের কথা। মাঝখানে শুধু ছাত্ররাজনীতিতে নিয়মিত ছাত্রদের অংশগ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন। ডাকসু নির্বাচন আবশ্যক হয়ে পড়েছে বলেছেন।
রাষ্ট্রপতির ওই বক্তৃতা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তবে যথারীতি সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু পণ্ডিতজন তার সমালোচনাও করেছেন এই বলে যে, ছাত্রদের পড়াশোনা না করেও যে বড় কিছু হওয়া যায়- এমন কু-প্ররোচনা দিতে পারে রাষ্ট্রপতির এই বক্তৃতা। কিন্তু আমি উপলব্ধি করলাম- অগৌরবের কথা বলেও মানুষ যে গৌরবান্বিত হতে পারেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বক্তৃতা তারই উদাহরণ। তিনি তার অলিখিত বক্তব্যে বলেছেন তিনি ১৯৬১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, তাও তৃতীয় বিভাগে। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন লজিকে রেফার্ড পেয়ে। বিএ পাস করেছেন তাও অনেক সময় ক্ষেপণ করে। অবশ্য তিনি এ-ও বলেছেন, তখন তিনি রাজনীতির কারণে দু’বার পরীক্ষার সময়ে কারাবন্দি ছিলেন। তবে মুখ রক্ষার জন্য বড় এক ছলনা করেছেন- ভরা জনসভায় ঘোষণা দিয়েছিলেন আইয়ুব খানের পতন না হলে তিনি বিএ পাস করবেন না।
আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর একজন কলামিস্ট লিখেছিলেন, কিশোরগঞ্জের একজন বটতলার উকিল রাষ্ট্রপতি হলেন। বটতলার উকিল কি-না জানি না তবে ১৯৮৮/৮৯ সালে একটি জপিরের কাজে আমি মিঠামইন গিয়েছিলাম। তার বাড়িতেও গিয়েছিলাম। উপজেলা সদরেই তার বাড়ি, হেঁটেই গিয়েছিলাম। উনি ছিলেন না। ঘরের ড্রয়িং রুমে ধান এনে জমা করা। অতি নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের ঘরের চিত্র। সম্ভবত লাল চা খাইয়েছিলেন ঘরের লোকেরা।
এই সাদা মানুষটি যাকে কিছু বুদ্ধিজীবী আর কিছু রাজনীতিবিদ ‘বটতলারই উকিল’ হিসেবে জানে, রিপোর্টিং সূত্রে আমি সংসদে অনেকবার দেখেছি কিন্তু কথা বলার সুযোগ হয়নি বা নেইনি। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরেও দেখা হয়নি।
আমি সুযোগের তালাশে ছিলাম মহামান্য রাষ্ট্রপতির ওপর কোনো সুযোগে কিছু লেখা যায় কি-না। আজ এমনভাবে সুযোগ এলো যে, তিনি নিজেই তার ‘অগৌরবের কথা’ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বললেন। তিনি এও বললেন যে, যে বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ভর্তির ফরম দেয়নি, আজ তিনি সে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর।
তার ভাষায়, ‘নিজের কাছেই অবাক লাগে, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর। আমি ম্যাট্রিক থার্ড ডিভিশন। আইএ পাস করছি, এক সাবজেক্ট লজিকে রেফার্ড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আসলাম ভর্তি হওয়ার জন্য তখন ভর্তি তো দূরের কথা, ভর্তির ফরমটাও আমাকে দেয় নাই। বন্ধু-বান্ধব অনেকে ভর্তি হইলো, ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে তখন আমি যুক্ত। ভর্তি যখন হইতে পারলাম না, তখন দয়ালগুরুর কৃপায় গুরুদয়াল কলেজে (কিশোরগঞ্জে) ভর্তির সুযোগ পেয়ে গেলাম।’
বিল গেটস বিশ্বের সবচেয়ে বড় সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট কর্পোরেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। ৮৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আজ তার সম্পদের পরিমাণ। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিয়েছিলেন পুঁথিগত বিদ্যায় উৎসাহ না পেয়ে। হার্ভার্ড ছেড়ে যাওয়ার ৩৩ বছর পর ২০০৭ সালের ৭ জুন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ফিরে আসেন ডিগ্রি অর্জনকারীদের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দেয়া এবং একটি সম্মানসূচক ডিগ্রি গ্রহণের জন্য। সেই সমাবর্তনে অকপটে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের মতো সব কথা ছাত্রদের সামনে খুলে বলেছিলেন। অনেক মজা করেছিলেন।
জার্মানি আগে ৫৬ ভাগে বিভক্ত ছিল। তার মাঝে একভাগের নাম ছিল প্রুশিয়া। প্রুশিয়ার রাজা ছিলেন উইলিয়াম। আর তার চ্যান্সেলর ছিলেন প্রিন্স অটোফন বিসমার্ক। বিসমার্ক স্কুলজীবনে ব্যাক বেঞ্চার ছিলেন। কিন্তু তিনিই ৫৬ খণ্ডে বিভক্ত জার্মানিকে এক ও অভিন্ন সত্তায় একত্রিত করে সংযুক্ত জার্মানির জন্ম দিয়েছিলেন এবং প্রুশিয়ার রাজা উইলিয়ামকেই সংযুক্ত জার্মানির রাজাও করে ছিলেন। ঐতিহাসিকরা বলেছেন বিসমার্কের মতো সফল রাষ্ট্রনায়ক ইতিহাসে বিরল। জওহর লাল নেহরুর লেখায় দেখেছি বিসমার্ক নাকি ৮-১০ ঘণ্টা পরিশ্রম করে সংযুক্ত জার্মানির জন্য একটা শাসনতন্ত্র রচনা করেছিলেন। আর কোনো সংশোধনী ছাড়া সে শাসনতন্ত্র নাকি জার্মানিতে ত্রিশ বছর কার্যকর ছিল। অথচ আগেই বলেছি স্কুলজীবনে তিনি ছিলেন ব্যাক বেঞ্চার। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ ম্যাট্রিক পাস করা ব্যারিস্টার, মহাত্মা গান্ধীও ছিলেন তাই। অথচ তাদের দু’জনের ভয়ে ভারতের গভর্নর জেনারেলরা কম্পমান থাকতেন। ব্রিটিশের শ্রেষ্ঠ সন্তানরাই ভারতের বড়লাট হতেন।
বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ দীর্ঘ দিনব্যাপী পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন। তিনি ৭ বার পার্লামেন্টে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি তার এলাকায় মুকুটহীন সম্রাট। কখনো পরাজিত হননি। ডেপুটি স্পিকার, স্পিকার হিসেবে তিনি শতভাগ সফল ছিলেন। একবার বিরোধী দলের ডেপুটি লিডারও ছিলেন। জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবেও তিনি সফল। নেহরু বলেছেন সফল রাষ্ট্র নায়করা মিডিওকার হন। মহামান্য রাষ্ট্রপতির দীর্ঘায়ু কামনা করি।

মানবকণ্ঠ/এসএস