রাত পোহালেই ভোট প্রস্তুত ইসি

রাত পোহালেই ভোট প্রস্তুত ইসিরাত পোহালেই শুরু হতে যাচ্ছে খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনের ভোট। এরই মধ্যে নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতি সেরে ফেলেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোটের মাঠের দায়িত্ব গতকাল রোববার সকাল থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। চার স্তরের নিরাপত্তায় থাকবে ১০ হাজারেরও বেশি ফোর্স। সঙ্গে থাকছেন ৪ হাজার ৯৭২ জন নির্বাচন কর্মকর্তা। সিটি এলাকার মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে নিরাপত্তা তল্লাশি। কমিশনের অনুমোদিত স্টিকার ছাড়া মোটরসাইকেল চলাচলেও আরোপ হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। ভোটার ব্যতীত সব ধরনের বহিরাগতদের এলাকা ছাড়তে আগেই পরিপত্র জারি করেছে কমিশন। নির্বাচন কমিশন থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছাড়া সাধারণ নিরীহ রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার না করতে।

এদিকে, আজ সোমবার থেকে নির্বাচনের সামগ্রী প্রিসাইডিং অফিসার এবং কেন্দ্র পাহারায় থাকা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে রিটার্নিং অফিসারের নির্বাচনের ফল প্রকাশ করা সমন্বয় কেন্দ্র থেকে। থাকছে, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) এবং ৩টি কেন্দ্রে গোপন ক্যামেরা। রাখা হয়েছে ইসির নিজস্ব পর্যবেক্ষক।

খুলনা সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে ৩৯ রাজনৈতিক দলের মধ্যে মাত্র ৫টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সব ছাপিয়ে আলোচনায় রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী। সেই দিক বিবেচনায় বলা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে নৌকা-ধানের শীষের লড়াই হবে। প্রধান দু’দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে শঙ্কাও কম নয়। নৌকার প্রার্থীর আস্থা ইসির প্রতি এবং বিএনপির প্রার্থীর ভরসা ভোটার। তবে, পুলিশের রহস্যজনক আচরণ শাস্তিপূর্ণ এই নির্বাচনে বাগড়া দিতে পারে এ শঙ্কা তাড়িয়ে বাড়াচ্ছে ভোটারদের। ইতিমধ্যে বিএনপির প্রার্থী ও দলীয় নেতাকর্মীদের পুলিশ হয়রানি করছে বলে অভিযোগ জানানো হয়েছে। তবে, কমিশন দলটির করা এসব অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করে আসছে। এখন দেখার বিষয় আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নিরপেক্ষ থেকে কিভাবে নির্বাচনের বৈতরণী পার করে সাংবিধানিক এই সংস্থাটি।

নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে কমিশন সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেন, খুলনা সিটি নির্বাচন নিয়ে কমিশনের তরফ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। সুষ্ঠু ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠানে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রোববার থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে নেমেছেন। আশা করছি, কুমিল্লা ও রংপুর সিটির মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন হবে। আর ভোটের দিন কমিশন ভোটের সার্বিক বিষয়ে খোঁজ-খবর এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিং করবে।

খুলনার রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনূচ আলী বলেন, নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। এখনো শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। আশা করছি, বাকি দু’দিন নির্বাচনের পরিবেশ একই থাকবে। তিনি বলেন, নিরাপত্তা, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা এবং ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাসহ প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা এই নির্বাচনে যুক্ত আছে। তার মধ্যে ভোট কেন্দ্র পাহারায় থাকবেন ৬ হাজার ৮১৬ জন কর্মকর্তা। চার স্তরের নিরাপত্তায় র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার সদস্য।

প্রচারণা: খুলনা সিটি নির্বাচনের প্রচারণা গতকাল রোববার মধ্যরাত থেকেই শেষ হয়েছে। সিটি নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী ভোট গ্রহণ শুরুর ৩২ ঘণ্টা আগে এ প্রচারণা শেষ হয়। তাই সিটির মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সির প্রার্থীরা রোববার মধ্যরাতের পর আর কোনো ধরনের প্রচারণা চালাতে পারবেন না। আগামী ১৫ মে ভোট, এর আগের দিন নিজস্ব বলয়ে নেতাকর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে সাক্ষাতে প্রার্থীদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকবে।

নিয়োজিত থাকছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১০ হাজার সদস্য: সিটি নির্বাচনে ১০ হাজারের মতো নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কেন্দ্র এবং কেন্দ্রের বাইরে এসব সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে কেন্দ্র পাহারায় থাকবেন পুলিশ, আনসার ও আর্মস পুলিশ ব্যাটালিয়ানের সমন্বয়ে ৬ হাজার ৮১৬ জন এবং কেন্দ্রের বাইরে স্ট্রাইকিং র্ফোস হিসেবে থাকবে ১৬ প্লাটুন বিজিবি, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব) ৩২ পেট্রল, পুলিশ ১১ টিম এবং আনসার ৩ ব্যাটালিয়ানের সমন্বয়ে ১২টিম।

নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট ৭৩ জন: প্রার্থী এবং তাদের কর্মী-সমর্থকরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তাৎক্ষণিক জরিমানা ও শাস্তির পাশাপাশি সামারি ট্রায়াল করে দণ্ড দেবেন এসব ম্যাজিস্ট্রেটরা। এর মধ্যে ৩১ ওয়ার্ডে ৬০ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ১৩ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট এ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন।

ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা প্রায় ৫ হাজার: এ নির্বাচনে প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং এবং পোলিং অফিসার (ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ৪ হাজার ৯৭২ জন। এর মধ্যে প্রতি কেন্দ্রে ১ জন প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে ২৮৯ জন, প্রতিটি কক্ষে ১ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে ১৫৬১ জন এবং প্রতিটি কক্ষে দু’জন পোলিং অফিসার হিসেবে ৩১২২ জন। ভোটার শনাক্ত এবং ব্যালট দিয়ে ভোট কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে এসব কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

ইসির ৩১ নিজস্ব পর্যবেক্ষক: ভোটের দিন প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট কার্যক্রমের গতি-প্রকৃতি, ভোটার, প্রার্থী-কর্মী সমর্থকদের গতিবিধি এবং সর্বোপরি নির্বাচনী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন সব কিছু সাধারণ পোশাকে শুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করবেন ইসির এই নীরব পর্যবেক্ষকরা। ভোটে কোনো ধরনের অনিয়ম দেখলে তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ, রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অবহিত এবং প্রয়োজনে কমিশনকে ঘটনার তথ্য সম্পর্কে জানাবেন তারা। এসব নিজস্ব পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে ৩১ জন, যার মধ্যে ইসির যুগ্ম-সচিব আবদুল বাতেনকে সমন্বয়ক, উপসমন্বয়ক মো. শাহাদাত হোসেন এবং ২৯ জন মাঠে ঘুরে ঘুরে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন।

৫ কেন্দ্র ও ওয়ার্ডে ইভিএম ও সিসি ক্যামেরা: ভোটার সচেতন এবং শিক্ষিত ও শহরকেন্দ্রিক ২৪ ও ২৭নং ওয়ার্ডে ইভিএমে ভোট নেয়া হবে। যান্ত্রিক জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ যাতে বুঝে-শুনে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সেজন্য নগরীর ওই দুটি ওয়ার্ডকে বেছে নেয়া হয়েছে। আর ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিবেচনায় সিটির ৩টি ভোট কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরার সহায়তায় নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন, যার মধ্যে বিএল কলেজ কেন্দ্র, পিটিআই কেন্দ্র এবং পাইওনিয়র কলেজ কেন্দ্র। ভোটারদের গতিবিধি ও ভোট গ্রহণ কার্যক্রম ওই ক্যামেরার সাহায্যে অবলোকন করবেন কমিশন। এসব প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে নির্বাচনে ব্যবহারের জন্য আইটি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হয়েছে।

৩ পদে ১৯১ প্রার্থী: খুলনা সিটি নির্বাচনের ৩ পদে ১৯১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে মেয়র পদে ৫ জনের মধ্যে আওয়ামী লীগের তালুকদার আবদুল খালেক, বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জাতীয় পার্টির এস এম শফিকুর রহমান, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মিজানুর রহমান এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. মুজ্জাম্মিল হক। আর সাধারণ কাউন্সিলর ৩৮ জন এবং সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর ১৪৮ জন।

ভোট কেন্দ্র ও ভোটার: এই সিটিতে ৩১টি সাধারণ ওয়ার্ড, ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড, ভোট কেন্দ্র ২৮৯টি এবং ভোটকক্ষ ১৫৬১টি। মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯৩ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৮৬ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৪৪ হাজার ১০৭ জন। ভোটার সংখ্যানুপাতে নারীর চেয়ে পুরুষ ভোটার ৪ হাজার ৭৭৯ জন বেশি।

মানবকণ্ঠ/এসএস