রাজশাহীর নগর পিতা বুলবুল না লিটন

আজ ৩০ জুলাই। সোমবার। নগরবাসীর কাক্সিক্ষত দিন। ভোট দেয়ার দিন। নতুন নগর পিতা বেছে নেবার দিন। প্রায় এক মাস আগে যে নির্বাচনের যাত্রা শুরু হয়েছিল তার সমাপ্তির দিন। শনিবার মধ্যরাতে শেষ হয়েছে প্রচার-প্রচারণা। গতকাল বোরবার সকালে শহরে ফিরেছে স্বস্তির সকাল। দীর্ঘ ডামাডোলের পর বিপর্যস্ত শহর ফিরেছে শান্তি পাওয়া চেহারায়। দোকানগুলো ফাঁকা, পথে পথচারী কম, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো নিশ্চুপ, যানবাহনগুলো চলছে ফিসফিস করে।

আকাশজুড়ে ধূসর কালো মেঘের বসবাস। মাঝে মাঝে মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে বিবর্ণ সূর্য। বদলে গেছে রোদের রং। ঘুরছে সময়ের চাকা। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শহরে কয়েক দফা নেমেছে মুষল ধারে বৃষ্টি। বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দ্রুত নেমেছে সন্ধ্যা। নিস্তরঙ্গ অথচ প্রাণ প্রাচুর্যে ভরা রাজশাহীর জনজীবন ভোটকে সামনে রেখে রাতের অন্ধকার নামার আগেই ফিরতে শুরু করে ঘরে। আজ সকাল থেকেই তারা ছুটবেন ভোট কেন্দ্রের উদ্দেশে।

ভোটারদের পদচারণে দিনভর সরব থাকবে শহর, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে ভোট। তবু কারো মনে সংশয়, কারো মনে ভয়। কেননা রয়েছে নির্বাচনী সহিংসতার শঙ্কা, সেইসঙ্গে রয়েছে বেরসিক বৃষ্টি হানা দেয়ার সম্ভাবনা।

উত্তরের এই অবহেলিত মানুষের মধ্যে জীবন তৃষ্ণা প্রবল। তারা অর্থনৈতিক মুক্তি চায়, জীবনমানের উন্নতি চায়, নিজেদের ভাগ্য বদলাতে চায়। তাই নগর পিতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে শহরের উন্নয়নের কথাই বার বার সামনে এনেছেন তারা। নতুন নগর পিতা তাদের এ আশা পূরণ করবেন এ প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছেন সবাই।

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে ৫ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১৬০ জন এবং সংরক্ষিত আসনে কাউন্সিলর পদে ৫২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মেয়র প্রার্থীরা হলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত ও মহাজোট সমর্থিত এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন (নৌকা), বিএনপি মনোনীত মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল (ধানের শীষ), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির হাবিবুর রহমান (কাঁঠাল), ইসলামী আন্দোলন

বাংলাদেশের শফিকুল ইসলাম (হাতপাখা) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী গণসংহতি আন্দোলনের মুরাদ মোর্শেদ (হাতি)। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ১৩৮টি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হবে। এসব কেন্দ্রের মধ্যে ১১৪টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শহরে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৮ হাজার ১৩৮ জন। মেয়র পদে মূলত লড়াই হবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে।

গতকাল আওয়ামী লীগের প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন দিনের অধিকাংশ সময় নিজ বাড়িতেই অবস্থান করেন। এ সময় তিনি দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন।

এদিকে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন নির্বাচন কমিশন। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ২৮ তারিখ মধ্য রাত থেকে সব ধরনের যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু বিএনপির মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের অভিযোগ এখনো বন্ধ হয়নি বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট নেতাকর্মীদের গণগ্রেফতার। বাড়িতে পুরুষ মানুষকে না পেলে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাসহ অন্য সদস্যদের গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে অমানবিক নির্যাতন করছে পুলিশ।

এ ছাড়াও বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বাড়িতে যেয়ে ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য হুমকি অব্যাহত রেখেছে আওয়ামী ঘরানার পুলিশ ও আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে ৫০টির অধিক অভিযোগ দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে রাজশাহী রিটার্নিং অফিসার বরাবরে শেষ অভিযোগ প্রদান শেষে নির্বাচন কমিশন অফিসের নিচতলায় বিএনপি ও ২০ দলীয় প্রার্থী মোহাম্মাদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এই অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন প্রত্যক্ষভাবে সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করছে। এখন (গতকাল দুপুর) পর্যন্ত পোলিং ও প্রিজাইডিং অফিসারের গেজেট বিএনপিকে দেয়া হয়নি। এ ছাড়াও সরকার দলীয় প্রার্থী ও তার নেতাকর্মীদের আচরণবিধি ভঙ্গের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেননি নির্বাচন অফিসার। তিনি আরো বলেন, নির্বাচনকে বানচাল ও সরকার দলীয় মেয়র প্রার্থীকে বিজয়ী করতে রাজশাহীতে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি বহিরাগত সন্ত্রাসী অবস্থান করছে।

সেইসঙ্গে ১০টির অধিক কালো গ্লাসওয়ালা মাইক্রোবাস ঘোরাফেরা করলেও এ বিষয়ে পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তিনি বলেন, গ্রেফতার থেকে ধানের শীষের পোলিং এজেন্টরাও রেহাই পাচ্ছেন না। ২৩ জন পোলিং এজেন্টকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এসব গ্রেফতার নেতাকর্মীরা কোথায় আছে তার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন। বেগম খালেদা জিয়ার এই মুক্তির আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত পুলিশ যতই নির্যাতন ও গ্রেফতার করুক না কেন আজকের নির্বাচনে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মী ও সব সমর্থক ও সাধারণ ভোটারদের নির্ভয়ে খুব সকালে ভোট কেন্দ্রে যেয়ে ধানের শীষে ভোট প্রদান করার অনুরোধ জানান বুলবুল।

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন করতে সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শহরে শনিবার থেকে মোতায়ন করা বিজিবি ও র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা টহল দিতে শুরু করেছে। শনিবার রাত ১২টায় শেষ হয়েছে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা।

গতকাল সকাল ১১টায় ব্যালট পেপার, অমোচনীয় কালি ও সিলসহ নির্বাচনী সামগ্রী ৩০টি ওয়ার্ডের ১৩৮ কেন্দ্রে পাঠানোর কাজ শুরু করে কমিশন। এসব কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন করতে ১৫ প্লাটুন বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৪ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে একইসঙ্গে কাজ করবেন ৪০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত। বর্তমান পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ও অনুকূলে রয়েছে বলছেন কর্মকর্তারা।

আজ সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কোনো বিরতি ছাড়াই ৫ মেয়র ও কাউন্সিলরসহ ২১৭ জন পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার সুযোগ পাবেন নারী ও পুরুষ ভোটার। এবারের নির্বাচনে নতুন ভোটার আছেন প্রায় ৩১ হাজার। আর দুটি কেন্দ্রে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট দেয়ার সুযোগ পাবেন প্রায় ৩৪শ’ নারী-পুরুষ।

মানবকণ্ঠ/এএএম