রাজনৈতিক উত্তাপ কাটিয়ে প্রাণ ফিরেছে গ্রন্থমেলায়

সাময়িক রাজনৈতিক উত্তাপ কাটিয়ে আবারো প্রাণ ফিরে পাচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করে বুধবার থেকেই কম ছিল লোক সমাগম। আর বৃহস্পতিবার প্রায় ক্রেতা-দর্শনার্থী শূন্য হয়ে পড়ে মেলা। প্রকাশকরাও প্রকাশ করেন উদ্বেগ। তবে গতকাল শুক্রবার কেটে গেছে ভীতির মেঘ। কুয়াশা ভেদ করে দেখা দেয়া সূর্যের হাসির মতোই স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে মেলায়। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মেলা কর্তৃপক্ষ শিশুপ্রহর ঘোষণা দিয়েছে আগেই। তাই বেলা ১১টা থেকেই বইপ্রেমীরা দলে দলে আসতে থাকেন বাংলা একাডেমির দিকে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, শিশুপ্রহর হওয়ায় বাচ্চাদের নিয়ে অনেকে এসেছেন পুরো পরিবারসহ। পরিবারের সবচেয়ে ছোটজনের আনন্দে নিজেরাও স্নিগ্ধতার আবেশ মাখিয়ে নিচ্ছেন গায়ে। রহমত আলী নামে পুরান ঢাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, ভয়েই ছিলাম রায়ের পর কিনা কী হয়। তবে পত্রিকায় তেমন কোনো সহিংসতার খবর না পাওয়ায় সাহস বেড়ে গেল। আর ছোট মেয়ে আঁখি বই মেলায় যাবে বলে কয়েকদিন ধরেই বায়না করছে। নিজেরও বই পড়ার অভ্যাস। তাই সবাই মিলেই এসেছি। রুপন্তি এসেছেন ছোট ভাইবোন আর বাবাকে নিয়ে। নিজেকে শিক্ষক দাবি করা এ পাঠক বলেন, বাবা বইমেলা বলতে অজ্ঞান। একা একা চলতে পারেন না এখন। তার জন্যই এই বন্ধের দিনে সবাইকে নিয়ে এসেছি। রাজনীতিতে অনেক কিছুই থাকবে। কিন্তু এ শতাব্দীতে এসে এখন আর সহিংসতায় কেউ জড়ায় না। এতে ব্যক্তি, তার পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবদিক থেকে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। পরিস্থিতি ভালো আছে, আশা করি ভালো থাকবে।

এদিকে ভীতির মেঘ কাটতে শুরু করায় প্রকাশকরাও বেশ আশাবাদী হয়ে উঠছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা রাষ্ট্রীয় জীবনে সব সময়ই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কোনো কিছুর জন্য অন্য কোনো কিছু থেমে গেলে চলবে না। বইমেলা শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়। দীর্ঘ এক মাসের একটা উৎসব। এটা জাতীয় ঐতিহ্যের অংশও। তাই এর ক্ষতি যাতে না হয়, সে বিষয়টা খেয়াল রাখতে হবে রাজনৈতিক অঙ্গনের মানুষদেরও।

বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশনা সমিতির নেতা ও নওরোজ কিতাবিস্তান প্রকাশনীর কর্ণধার মঞ্জুর খান চৌধুরী বলেন, আশা করছি আঁধার থাকবে না। রাজনৈতিক অস্থিরতা যেটা শুরু হয়েছিল, তার মেঘ কাটতে শুরু করেছে। লোক সমাগম বেড়ে অচিরেই উপচেপড়া ভিড়ের সৃষ্টি হবে।

মেলার সময়সূচিতে সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত শিশুপ্রহরের জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু বেলা গড়ালেও শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। তাদের কলকাকলিতে মুখরিত ছিল মেলা প্রাঙ্গণ। সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণে ছিল খুদে বইপ্রেমীদের উপচেপড়া ভিড়। তারা স্টলে স্টলে ঘুরে বেড়িয়েছে পছন্দের বইটি কেনার জন্য। কেউ কেউ বইয়ের পাতা উল্টেপাল্টে দেখেছে। যে বইটির প্রচ্ছদ, ভেতরের অলঙ্করণ ভালো লেগেছে সেটি কিনেছে।

অন্যদিকে শিশুপ্রহর উপলক্ষে সিসিমপুরের মঞ্চে ছিল হালুম, ইকড়ি, টুকটুকির উপস্থিতি। তাদের উপস্থিতি শিশুদের বাড়তি আনন্দ দিয়েছে। এ সময় শিশুরা তাদের সঙ্গে নেচে-গেয়ে মেলা উপভোগ করেছে।

গতকাল শিশুদের সঙ্গে অভিভাবকদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেক অভিভাবক তাদের শিশু সন্তানদের খ্যাতিমান লেখকদের বই কিনে দিয়েছেন। আর কিশোর-কিশোরীদের সেবা প্রকাশনী, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রকাশিত বই ও রোমাঞ্চোপন্যাস কিনতে দেখা যায়। প্রথম শিশুপ্রহর হিসেবে শিশুদের উচ্ছ্বাস বেশি দেখা যায়।

ছুটির দিন বলে সন্ধ্যার পর বই বিক্রিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রকাশকরা। শিশুতোষ বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন বিখ্যাত লেখকের অনুবাদ বইয়ের কাটতি ভালো বলে তারা জানান। অবসর প্রকাশনীর ম্যানেজার মাসুদ রানা বলেন, শিশুপ্রহর হওয়ায় সকাল থেকেই ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। শিশুরা তো এসেছিলই, বয়স্কদের পদচারণও কম ছিল না।

গতকাল মেলায় এসেছিলেন তিনজন খ্যাতিমান লেখক। মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আনিসুল হক ও ইমদাদুল হক মিলন। এ তিনজনকে কাছে পেয়ে অটোগ্রাফ শিকারিদের যেন তড় সইছিল না। তাম্রলিপি প্রকাশনীর সামনে মুহম্মদ জাফর ইকবালের অটোগ্রাফের সঙ্গে সেলফি নিয়েছেন গ্রন্থমেলায় আগত কয়েকশ’ পাঠক-দর্শনার্থী। প্রথমা প্রকাশনীর প্যাভিলিয়নে বসে নিজের বইয়ে অটোগ্রাফ দিয়েছেন আনিসুল হক। আর অনন্যার প্যাভিলিয়নে বসে অটোগ্রাফ দিয়েছেন ইমদাদুল হক মিলন।

এ সময় মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, এবারের মেলাটা বেশ ছিমছাম, প্যাভিলিয়ন-স্টলগুলো সুন্দর করে সাজানো। আর মেলায় আসতে আমার সব সময়ই ভালো লাগে। তবে একটা জিনিস দেখলাম, মেলায় আগতদের হাতে বইয়ের চেয়ে স্মার্টফোন বেশি। স্মার্টফোন থাকা ভালো, কিন্তু এর সঙ্গে যদি বই থাকে তাহলে দেখতে ভালো লাগে।

ইমদাদুল হক মিলন বলেন, যেহেতু ৮ ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে একটি অজানা শঙ্কা সবার মাঝে ছিল, সেজন্য প্রথম থেকেই মনে হচ্ছিল ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা জমে উঠবে। তেমনটিই হয়েছে। মানুষ যে আসছে, বই কিনছে, আড্ডা দিচ্ছে- এর চেয়ে ভালো দৃশ্য আর কী হতে পারে।

আনিসুল হক বলেন, এ পর্যন্ত আমার দেখা এটি শ্রেষ্ঠ মেলা। দারুণ বিন্যাস আর সুসজ্জিত স্টলের মাঝে বইপ্রেমীদের ভিড় মেলার পরিবেশকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

নতুন বই: বড় বড় লেখকদের এই ভিড়ের মাঝে গতকাল মেলার তথ্যকেন্দ্রে জমা পড়ে রেকর্ড সংখ্যক বই। বাংলা একাডেমির জনসংযোগ ও সমন্বয় উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলায় এসেছে ৩৪৪টি নতুন বই। এর মধ্যে রয়েছে- ফিরোজ এহতেশামের ‘সাধুকথা : ১৩ বাউল-ফকিরের সাথে কথাবার্তা’ (মেঘ), সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘অগ্রগতির শর্তপূরণ’ (বিদ্যাপ্রকাশ), মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘অনলাইন জীবন ও অন্যান্য’ (বিদ্যাপ্রকাশ), ওমর ফারুকের ‘বাবার চোখ’ (অ্যার্ডন), সেলিনা হোসেনের ‘পদশব্দ’ (এশিয়া পাবলিকেশন্স), শামসুজ্জামান খানের ‘বুদ্ধিজীবী ও রাষ্ট্র: পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ’ (রয়্যাল পাবলিশার্স), অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরীর ‘ক্যান্সার’ (মুক্তধারা), কায়কোবাদ মিলনের ‘মোসাদ ২’ (আবিষ্কার), জাহিদ নেওয়াজ খানের ‘মূর্তি কারিগর’ (আবিষ্কার), আনিসুজ্জামানের ‘দুইটি নাটক’ (আবিষ্কার), আহমদ রফিকের ‘জীবনানন্দ কবি, প্রেমিক ও গৃহী’ (অন্যপ্রকাশ), সুমন্ত আসলামের ‘মুখোশধারী ভয়ংকর’ (কাকলী), আনিসুল হকের ‘দেশ সেরা দশ গোয়েন্দা’ (কাকলী), সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার ‘গণমাধ্যমের লড়াই’ (অন্যপ্রকাশ), ইমদাদুল হক মিলনের ‘আধিভৌতিক’ (কথাপ্রকাশ), হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘একা এবং একসঙ্গে নির্বাচিত আশি’ (পাঠক সমাবেশ)।

মেলামঞ্চের আয়োজন: অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে গতকাল সকালে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। যাতে ক শাখায় ৩০০ জন, খ শাখায় ২৭৫ জন এবং গ শাখায় ১১২ জন শিশু-কিশোর অংশ নেয়। এ চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন চিত্রশিল্পী অধ্যাপক নিসার হোসেন। বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘রশীদ উদ্দিন: উকিল মুন্সী: বারী সিদ্দিকী’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুমনকুমার দাশ। আলোচনায় অংশ নেন কামালউদ্দিন কবির এবং সাইমন জাকারিয়া। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নূরুল হক। সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ফারহানা চৌধুরী বেবীর পরিচালনায় নৃত্য পরিবেশন করেন বাফার নৃত্যশিল্পীরা। সংগীত পরিবেশন করেন মীনা বড়–য়া, আবুবকর সিদ্দিক ও মুরাদ হোসেন।

আজকের আয়োজন: আজ শনিবার দ্বার খুলবে সকাল ১১টায়, চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। এর মধ্যে সকাল ১১টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশুপ্রহর। সকালে থাকছে একুশে উদযাপন হিসেবে শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতা। বিকেলে অনুষ্ঠিত হবে ‘রবি গুহ: মুনীর চৌধুরী: সরদার ফজলুল করিম’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। যাতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করবেন মফিদুল হক ও এমএম আকাশ। আলোচনায় অংশ নেবেন বেগম আকতার কামাল, অজয় দাশগুপ্ত, পিয়াজ মজিদ ও অলকানন্দা গুহ। সভাপতিত্ব করবেন সন্্জীদা খাতুন। সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

মানবকণ্ঠ/আরএ

Leave a Reply

Your email address will not be published.